আমরা লাইভে English বুধবার, মার্চ ০৩, ২০২১

সীমান্তে সেনা সমাবেশ: বাংলাদেশের উপর ‘চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে মিয়ানমার’

INTERVIEW-ENG-02-10-2020 (1)
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন

সম্প্রতি মিয়ানমার বাংলাদেশ সীমান্তে সৈন্য মোতায়েন করেছে। নিরাপত্তা পরিষদে চিঠি লিখে বাংলাদেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেছে, মিয়ানমারের সরকার-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমকে এমন প্রচারণা চালাতে দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা মূলত রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে। যার পুরোটাই মিয়ানমারের সৃষ্টি। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির তাৎপর্য কী? মিয়ানমার কী বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থা তৈরি করতে চায়? বাংলাদেশের প্রস্তুতি বা শক্তি-সামর্থ্যের অবস্থা কেমন?

বিষয়টি নিয়ে সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ফেলো এসআইপিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের মুখোমুখি হয়েছিল দ্য ডেইলি স্টার। ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত দীর্ঘ বছর ধরে মিয়ানমার সামরিক সরকারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন, গবেষণা করছেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের বহুবিধ দিক নিয়ে।

বাংলাদেশ সীমান্তে সৈন্য মোতায়েন করছে মিয়ানমার। বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদে চিঠি লিখে ইতোমধ্যে তা জানিয়েছে। আপনার দীর্ঘ বছরের পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কী বলে? কী করতে চাইছে মিয়ানমার?

প্রথমেই বলে রাখি, আমি কথা বলছি আমার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে। আমি ওই অঞ্চলে থেকেছি, কাজ করেছি। সামগ্রিকভাবে মিয়ানমার সম্পর্কে আমাদের জানার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তা জানা-বোঝার চেষ্টা করেছি। বলতে পারেন, এটা আমার একান্ত অভিজ্ঞতালব্ধ বিশ্লেষণ।

মিয়ানমারে আগামী নভেম্বরে নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান দল দুটি। একটি এনএলডি আর অপরটি সেনাবাহিনী। যদিও সেনাবাহিনী সরাসরি নির্বাচনে থাকবে না। তবে, নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী আছে। মিয়ানমারের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর যে একটা বড় ভূমিকা রয়েছে, তা নিয়ে তো আর নতুন করে বলার কিছু নেই। তারা দেশটির সংসদেও আছে।

রাখাইন অঞ্চলে যে সংঘাত, তার কয়েকটি স্তর রয়েছে। প্রথম স্তর হচ্ছে, আরাকান আর্মি বনাম সরকারি বাহিনী। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে, রাখাইন বৌদ্ধ বনাম বামার বৌদ্ধ। তৃতীয়টি হচ্ছে, রাখাইন বৌদ্ধ বনাম সরকারি বাহিনী।  মিয়ানমার সেনাবাহিনী বনাম রোহিঙ্গা এবং রোহিঙ্গা বনাম রাখাইন বৌদ্ধ।

এশিয়ার দুটি বড় ও শক্তিশালী দেশ রাখাইনে এক ধরনের প্রতিযোগিতার মধ্যে আছে। উত্তর রাখাইনে ভারতের প্রভাব এবং দক্ষিণ রাখাইনে চীনের প্রভাব রয়েছে। এই দুই শক্তির মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে। সেই প্রতিযোগিতার মধ্যে নতুন করে যোগ দিয়েছে আরাকান আর্মি। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ তো আছেই। আমরা যারা নিয়মিত এ বিষয়টি লক্ষ্য রাখছি, তারা দেখতে পাচ্ছি যে আরাকান আর্মির শক্তি হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আরাকান আর্মির অস্তিত্বটা মূলত কোথায়? মিয়ানমারের ভেতরে না বাইরে?

উত্তর রাখাইনে, যেখানে ভারতের বন্দর নির্মাণ করার কথা, সেই এলাকাতে তাদের অবস্থান। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও দুটি গ্রুপ। তাদের মধ্যে একটি কারেন জনগোষ্ঠীর এবং অপরটি শান প্রদেশের ওয়া স্টেট আর্মি। তারা মিয়ানমারের ভেতরে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে।

মিয়ানমার সীমানার বাইরে আরাকান আর্মি বা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান আছে বলে কোনো তথ্য নেই। তারা ওই দেশের মধ্যেই আছে। তাদের অবস্থান সেসব এলাকাতে সেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী পৌঁছাতে পারে না। শান প্রদেশ, কারেনদের প্রদেশসহ মিয়ানমারে বহু জায়গা আছে যেগুলো অলিখিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। কারেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি তো পুরোপুরি অস্ত্রে সুসজ্জিত। তারা মোটামুটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রই তৈরি করে ফেলেছে। মিয়ানমারের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর পশ্চিমে ছোট-বড় বেশ কয়েকটি সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপ সক্রিয়। তারা নর্দান অ্যালায়েন্স গড়ে তুলেছে। এই অ্যালায়েন্সের সবচেয়ে বড় শক্তি কারেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি। সম্মিলিতভাবে নর্দান অ্যালায়েন্স মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে। আরাকানের সঙ্গে সংযুক্ত কিছু অঞ্চলে সবচেয়ে সক্রিয় তিনটি সশস্ত্র সংগঠন যারা ‘থ্রি ব্রাদার্স’ নামে পরিচিত। মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স, কাচিন প্রদেশে টাঙ্ক ন্যাশনাল আর্মি ও আরাকান আর্মি। তারা যৌথভাবে অভিযান চালায় মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে।

এদের শক্তির উৎস কী? বলা হয়ে থাকে চীনের অস্ত্র-সহায়তাই তাদের শক্তির উৎস?

এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী যেসব অস্ত্রে সজ্জিত, তার প্রায় সবই চীনের তৈরি। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন চীনই তাদের শক্তির উৎস।

তাহলে চীন যেমন মিয়ানমারের শক্তির উৎস, আবার মিয়ানমার-বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীরও শক্তির উৎস?

বিশ্লেষকরা তেমনই ধারণা করেন। চীনের অস্ত্র-সহায়তা সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর মূল শক্তির উৎস।

আগে মিয়ানমারের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ছিল। এক পর্যায়ে চীন তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনে যে, পার্টির সঙ্গে পার্টির সহযোগিতা আর করা হবে না। সহযোগিতা হবে, সরকারের সঙ্গে সরকারের। তবে, অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চীন এখনো পার্টির সঙ্গে পার্টির সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। কারণ, কারেনদের যে অস্ত্র আছে, তার বেশিরভাগই চীনের তৈরি।

গত চার মাস আগে মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে যে, আরাকান আর্মির জন্য চীনের তৈরি প্রচুর অস্ত্র উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরের দিক থেকে মিয়ানমারের ভেতরে ঢুকেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে একটি নতুন সংগঠন তৈরি হয়েছে। এর নাম আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি। তাদের দাবি, তারা খুবই শক্তিশালী। যদিও এখন পর্যন্ত তাদের তেমন কোনো কর্মকাণ্ড কারও চোখে পড়েনি। মজার ব্যাপার হলো, প্রথম দিকে আরাকান আর্মি বলেছিল, আমাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে, সম্প্রতি আরাকান আর্মির ভাষ্য, আরাকানবাসীদের জন্য আরাকান আর্মি। এই বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, পরিষ্কার করে না বললেও তারা রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ত করার নীতি নিয়েছে।

কিছুদিন আগে যে মিয়ানমারের দুই জন সৈন্য অপরাধ মেনে নিয়ে স্বীকারোক্তি দিলো, তারা আরাকান আর্মির হাতে বন্দি ছিল। তবে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী বলছে যে তারা পলাতক সৈন্য। তারা পলাতক হলেও কোথা থেকে পালিয়েছে?

তারা যদি আরাকান আর্মির হাতেই থাকে এবং সেখান থেকেই যদি এই কথা বলে থাকে, তার মানে আরাকানে বা রাখাইনে মিয়ানমার যে অত্যাচারটা করছে, সেটাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরছে আরাকান আর্মি। শুধু রোহিঙ্গা নয়, তারা বলেছে, কারেনদের সঙ্গে এমন হয়েছে, শানদের সঙ্গেও হয়েছে। এর সবই এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরছে। এক সময় যারা বলত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, তারা এখন রোহিঙ্গাদের পক্ষে কাজ করছে।

মিয়ানমার এখন বাংলাদেশ সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি করছে কেন?

এর জন্য আন্তর্জাতিক অবস্থা দেখতে হবে। চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত নিয়ে একটা উত্তেজনা চলছে। এই উত্তেজনা ভারতের দিক থেকে বেশি। চীনের দিক থেকে তেমন কিছু জানা যায় না। মিয়ানমারের দিক থেকে দেখলে, এই উত্তেজনা এবং চীনের বিপক্ষে ভারতের পেছনে থেকে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপানের যে মেরুকরণ তার বাইরে মিয়ানমারকে রাখা যাবে না। এই মেরুকরণে মনে হতে পারে বাংলাদেশ এদিকেও নেই, ওদিকেও নেই।

কিন্তু, খুবই লক্ষণীয় একটা জিনিস হচ্ছে, হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স সেক্রেটারি ড. মার্ক টি এসপার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এটা ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় বিষয়। বাংলাদেশকে টানা হচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যোগ দেওয়ার জন্য। যেটি আমেরিকার স্পন্সরে চলছে এবং এখানে সবচেয়ে সক্রিয় ভারত। সঙ্গে আছে জাপান, অস্ট্রেলিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স সেক্রেটারি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেছেন। কতগুলো অসমর্থিত সূত্র, বিশেষ করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এসেছে, এই আলোচনায় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যে তারা অত্যাধুনিক কিছু যুদ্ধ সরঞ্জাম বাংলাদেশের কাছে দৃশ্যত বিক্রি করতে চায়।

এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় আসা অ্যাপাচি হেলিকপ্টারও আছে। সেই সঙ্গে এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণেও সহায়তা করতে চায় তারা। ভারত ও জাপান বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিকে যোগ দেওয়ার জন্য। এ পরিস্থিতিতে দেখতে হবে বাংলাদেশের ওপরে কোন ধরনের চাপ আসতে পারে। মিয়ানমার সীমান্তে এক ধরনের চাপ তৈরি করছে এই চিন্তা থেকে যে, হয়তো মিয়ানমারের ওপর কোনো ধরনের চাপ আসতে পারে। ওয়েস্টার্ন দেশগুলো এক জোট হচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে। মিয়ানমারের ওপর চাপ হতে পারে সেফ জোন বা নো ফ্লাইং জোন কিংবা অন্য কোনোভাবে।

আপনি যে প্রেক্ষাপটটি তুলে ধরলেন সেটা আমরা যেমন জানি, তেমনি মিয়ানমারও জানে। এটা জানার কারণে মিয়ানমার অনেক কিছু আশঙ্কা করছে। সে কারণেই কী সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ বা উত্তেজনা তৈরি করছে?

মিয়ানমার বাংলাদেশের ওপরে এক ধরনের চাপ তৈরি করছে। আমরা তো আছিই সীমান্তের ওপরে। রামুতে আমাদের যে ক্যান্টনমেন্ট আছে, সেটা মিয়ানমার সীমান্তের খুব কাছে। দেশের পুরো সীমান্ত জুড়ে বিজিবি কাজ করছে, সেনাবাহিনী আছে পার্বত্য চট্টগ্রামে, ক্যান্টনমেন্ট আছে, যেটা একেবারে রাখাইন রাজ্যের কাছে। আমাদের সেনাবাহিনী অভ্যন্তরীণ কারণে হোক বা অবস্থানের কারণে হোক, ইতোমধ্যেই সেখানে আছে। এসব কারণে মিয়ানমার চাপ সৃষ্টি করার জন্য সীমান্তে সৈন্য মোতায়েন করে থাকতে পারে।

এর পেছনে আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। আরেকটা কারণ হতে পারে, হয়তো যেসব সৈন্য আগে দায়িত্বে ছিল তাদের পরিবর্তন করা হচ্ছে। এই পরিবর্তন যখন হয়, তখন তারা কৌশলগত কারণে কিছু ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

আমার মনে হয় এমন একাধিক কারণেই মিয়ানমার এই তৎপরতা চালাচ্ছে।

এ বিষয়ে অনেকগুলো প্রসঙ্গ আসে। একটি হচ্ছে, সেন্টমার্টিন দ্বীপ। বাংলাদেশ থেকে বেশ দূরে এবং ছোট দ্বীপ হওয়ায় বলা হয় তুলনামূলকভাবে সেখানে মিয়ানমার বাংলাদেশের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। কৌশলগত জায়গাতে সেন্টমার্টিন দ্বীপ কি সবসময়ই আমাদের জন্য একটা ভয়ের কারণ?

১৯৯২ সালের পর থেকে সেখানে আমাদের নৌবাহিনীর উপস্থিতি আছে। মিয়ানমার এসে এই দ্বীপ দখল করবে, তেমন কিছু ভাবার কারণ আছে বলে মনে করি না। তা করলে এটা হয়ে যাবে সম্পূর্ণভাবে যুদ্ধ ঘোষণা। তেমন কিছু হলে বাংলাদেশও পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। সে সময় বাংলাদেশ হয়তো ওয়েস্টার্ন দেশগুলোর সাহায্য নেবে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর এলাকায় তারাই বেশি তৎপর।

সেখানে তো চীনও তৎপর। এমনকি রাশিয়ান গেমেও যুক্ত আছে মিয়ানমার।

চীন এটা মিয়ানমারকে করতে দেবে না। কারণ, সেটা হলে পুরো ব্যাপারটা চীনের বিপক্ষে চলে যাবে। চীন দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে তাদের কাজ এখনো শেষ করতে পারেনি। যেটাকে বলা হয় সিমেক, চায়না মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর। সাত  বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের কাজ চলছে।

মিয়ানমার যদি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে সেই প্রকল্পগুলোতে সমস্যা হতে পারে?

সমস্যা তৈরি হবে। আর চীন এই মুহূর্তে বঙ্গোপসাগর বা ভারত মহাসাগরে বড় কোনো ধরনের সমস্যায় জড়াতে চাইবে না। কারণ, সেই অবস্থানে চীন এখনো পৌঁছায়নি। সমুদ্রে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো চীনের সেই নৌ-শক্তি নেই। তাদের যতটুকু নৌ-শক্তি আছে, তা দক্ষিণ চীন সাগরে এবং তাদের মূল ফোকাস সেখানেই। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য আছে সিমেক। সেটা নিয়েই আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে মিলে কিছু একটা করবে। তবে, চীন এই মুহূর্তে নৌ চ্যালেঞ্জে আসতে পারবে না।

সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্তের যে অবস্থা বা রোহিঙ্গাদের এদেশে আসা সব মিলিয়ে নৌ, বিমান এবং স্থলে বাংলাদেশের অবস্থানটা কেমন? সামরিক শক্তির ভারসাম্যটা কেমন? ধারণা বা বিশ্লেষণ করা যায়?

বাংলাদেশ কতটা শক্তিশালী সেটা নিয়ে আমি কোয়ালিফাইড স্টেটমেন্ট দেবো না। আর সংখ্যাতত্ত্বের দিক থেকে কে কতটা শক্তিশালী তা কখনো বোঝা যায় না। সংখ্যাতত্ত্বে যদি যান, তাহলে একটা উদাহরণ দিতে পারি। মিশর হচ্ছে উত্তর আফ্রিকার মধ্যে সামরিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। মিশরের যে সামরিক বাহিনী আছে, তাদের চার ঘণ্টায় ইসরায়েলকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু, তারা তা পারছে না। সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে মাঝে মধ্যে বিশ্লেষণ করা হয়, কার কত সৈন্য। হিসাব করা হয়, চীনের ২০ লাখ সৈন্য আর ভারতের ১৯ লাখ। আজকে যদি ভারতের সঙ্গে চীনের যুদ্ধ হয়, তাহলে কি সব সৈন্য নিয়ে আসতে পারবে কেউ? ভারত কি পাকিস্তান পয়েন্টে সৈন্য রাখবে না?

সামরিক সংখ্যাতত্ত্বের দিক থেকে মিয়ানমার বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে গেছে। দুটো সাবমেরিন যুক্ত হওয়াতে নেভাল সাইডে সংখ্যাতত্ত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে। বিমান বাহিনী নিয়ে আমার সন্দেহ আছে, তবে মিয়ানমার হয়তো অগ্রগামী। তদের সংখ্যা অনেক বেশি। আরেকটি জিনিস এখানে হিসাবে রাখতে হবে, তা হলো, সৈন্যদের জঙ্গল যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। প্রায় ৭০ বছর ধরে মিয়ানমারের চারদিকে এই জঙ্গল যুদ্ধ করছে দেশটির সেনাবাহিনী। জঙ্গল যুদ্ধের কৌশল, পাহাড়ে যুদ্ধের কৌশল, পাহাড়ি জঙ্গলে যুদ্ধের কৌশলের দিক থেকে তারা বেশ ভালো।

আরেকটি বড় জিনিস হচ্ছে, বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান। ধরেন মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ শুরু হলো। আমাদের বিমান বাহিনীকে যদি মিয়ানমারের ভেতরে যেতে হয়, তাহলে তাকে অনেক দূর যেতে হবে। কিন্তু, আমাদের রিফাইনারি, ইন্ডাস্ট্রি, সবচেয়ে বড় বন্দর চট্টগ্রামে। সেটা মিয়ানমার থেকে খুব কাছে। ফলে ভৌগলিক সুবিধা-অসুবিধার দিকগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।

আমি মনে করি আমাদের সেনাবাহিনী যে সংখ্যা ও শক্তি, তা দিয়ে তারা আক্রমণ মোকাবিলা করতে সক্ষম। আর যুদ্ধ এখন তো থ্রি ডায়মেনশনে হয় না, হয় ফোর ডায়মেনশনে। যার কারণে সব কিছু বাদ দিয়ে ভারত এখন র‌্যাফালের পেছনে পড়ে গেছে। ইদানীং তারা আমেরিকার থেকে এফ-৩৫ কিনতে চাইছে।

বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের দিক থেকে চিন্তা করলে, আমাদের যেমন কিছু সুবিধা আছে, কিছু অসুবিধার দিকও আছে। সেদিকে নজর দিয়ে ভূরাজনৈতিক এবং কৌশলগত দিকের ঘাটতিগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পূরণ করতে হবে আমাদের।

আর এমন কিছু হলে, আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে কারা আমাদের সাহায্য করবে আর কারা করবে না, সেটা নির্ভর করবে আমাদের কূটনৈতিক ও পররাষ্ট্র নীতির ওপর।

শেষ প্রশ্ন, সীমান্তে মিয়ানমারের সৈন্য সমাবেশ কি শুধুই বাংলাদেশের ওপরে চাপ সৃষ্টি করা? নাকি সত্যি সত্যি মিয়ানমার এই সৈন্য সমাবেশের উসকানিটা আরও একটু এগিয়ে নিতে পারে, সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে? একজন বিশ্লেষক হিসেবে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

এই মুহূর্তে মিয়ানমার সেটা করবে না। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে অর্থনৈতিক। শুধু চীন নয়, তারা এখন ওয়েস্টার্ন দেশগুলোকেও বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার পর মিয়ানমারের রেঙ্গুন শহর নতুন করে তৈরি হচ্ছে। সেখানে চীনা প্রতিষ্ঠানও বিড করেছিল। তবে, কাজ পেয়েছে সম্ভবত সুইডেনের একটি প্রতিষ্ঠান। মিয়ানমারে বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে জাপান অনেক এগিয়ে আছে। দক্ষিণ কোরিয়াও মিয়ানমারে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে মিয়ানমার এমন কিছু করার অবস্থানে নেই, যাতে তার বিনিয়োগে বিরূপ প্রভাব পড়ে।

জাতিসংঘে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য সেফ জোন তৈরি করতে হবে। সেটা করতে গেলে মিয়ানমার বিশাল একটা সমস্যায় পড়বে রাখাইন অঞ্চলে। আমার মনে হয় না মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধের দিকে এগোবে। আর সেই সঙ্গে চীন তাদের এগোতে দেবে না।