আমরা লাইভে English বুধবার, মার্চ ০৩, ২০২১

ইরাকি প্রেসিডেন্টের সাক্ষাতকার: কী হবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার পরিণতি?

কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার প্রতিবাদে তেহরানে বিক্ষোভ

তেহরানের বৈদেশিক সামরিক অপারেশনের মাস্টারমাইন্ড কাসেম সোলাইমানিকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করায় ইরাক হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার ফ্রন্ট লাইনে চলে এসেছে। ওয়াশিংটনে অনেক বছর নিজেদের দল পরিচালনাকারী ব্রিটিশ শিক্ষিত কুর্দি বারহাম সালিহ ২০১৮ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবে ডজনখানেক তেল স্থাপনায় হামলা চালানোর জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে দায়ী করার পর থেকেই ইরাকের নাজুকতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান হারে উদ্বিগ্ন ছিলেন সালিহ। আমি সালিহকে চিনি সিকি শতক ধরে, যখন তিনি প্রথমে ওয়াশিংটনে ছিলেন ও পরে ইরাকের উপপ্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। আমরা সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় সংলাপ শুরু করি। তখন তা ছিল কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নিয়ে। আমাদের সংলাপ হালনাগাদ করার জন্য রোববার আবারো তার সাথে সংলাপে যোগ দেই।

যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সালে হামলা চালানোর পর থেকেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে আসছে ইরাক। সালিহ আমাকে বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের মিত্র। ইরান আমাদের প্রতিবেশী।’ বাগদাদ সরকারকে না জানিয়েই সোলাইমানির ওপর মার্কিন হামলা ইরাকের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এতে দেশের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নজিরবিহীন রাজনৈতিক ক্রোধের সঞ্চার হয়েছে। গত রোববার ইরাকের পার্লামেন্ট ‘ইরাকি মাটিতে যেকোনো বিদেশী উপস্থিতির অবস্থান এবং বিদেশী সৈন্যদের কোনো কারণেই ইরাকি আকাশসীমা, মাটি ও পানি ব্যবহার বন্ধ’ করার প্রস্তাব পাস করেছে। ৩২৮ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্টে প্রস্তাবটি ১৭০-০ ভোটে পাস হয়েছে। প্র্রধানত শিয়া আইনপ্রণেতারা এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। অনেক সুন্নি ও কুর্দি ভোট দেননি। তবে প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহদি সই না করা পর্যন্ত তা কার্যকর হবে না। আর তিনি হলেন কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান। কারণ বিক্ষোভের মুখে নভেম্বরে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন।

এদিকে সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর বড় ধরনের প্রতিশোধ গ্রহণের সংকল্প ব্যক্ত করেছে ইরান। এতে করে ইরাকে কূটনৈতিক ও সামরিক অপারেশন স্থগিত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। রোববার মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন ঘোষণা করে যে আইএসআইএসের বিরুদ্ধে সাময়িকভাবে হলেও অপারেশেন বন্ধ রাখা হয়েছে। মার্কিন দূতাবাসও কনস্যুলার অপারেশন স্থগিত রেখেছে। পররাষ্ট্র দফতর সব আমেরিকানকে ইরাক ত্যাগ করতে বলেছে। বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সালিহর সাক্ষাতকারটি প্রকাশ করা হলো।

প্রশ্ন: কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গোপন বা প্রকাশ্য সঙ্ঘাত নিয়ে আপনি কতটা উদ্বিগ্ন?

সালিহ: পরিস্থিতি বিপজ্জনক। ইরাক আরেকটি সঙ্ঘাতের চক্রে পড়ে যেতে পারে বলে আমার গভীর শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধের পর ইরাক ও এর অনেক মূল্যে পাওয়া স্থিতিশীলতা আবার নস্যাৎ হতে পারে আইএসআইএসের উত্থানে। সেটি যদি হয় তবে তা হবে ইরাক ও এই অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ পরিণতি। যুদ্ধ থেকে বিরত থাকতে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করার জন্য আমরা সবাইকে বলব।

প্রশ্ন: ইরানের বিরুদ্ধে ইরাকের আট বছরের যুদ্ধ থেকে বাগদাদ কী শিখেছে?

সালিহ: যুদ্ধ মানেই ধ্বংস। যুদ্ধে কেউ জয়ী হয় না। ইরাকের মানব ক্ষতি হয়েছে বিপুল। ইরানের ক্ষতিও হয়েছে। তবে যুদ্ধের শুরুতে ক্ষতি কতটা হবে জানা যায় না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো: ইরাকের উচিত হবে না অন্যদের দরজা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া। অন্যদের জন্য ইরাকের উচিত হবে না যুদ্ধ করা, ইরাকি সম্পদ ব্যবহার করা, ইরাকিদের জীবন দেয়া।

প্রশ্ন: আট বছরের যুদ্ধ খুব কাছ থেকে দেখেছেন। আপনি জানেন, ইরানিরা কিভাবে যুদ্ধ করে। তারা সহজে ছেড়ে দেয় না।

সালিহ: মধ্যপ্রাচ্য সহিংসতার বৃত্তের মধ্য দিয়ে গেছে। অনেক দিন ধরে আক্ষরিক অর্থেই শান্তি ও নিরাপত্তা কী তা জানে না। ইরাক-ইরান যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ব্যবস্থা নষ্ট করে ফেলেছে। গত ৪০ বছর ধরে ইরাক হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত অঞ্চলের প্রধান ক্ষেত্র। ইরাকের মাটিতে যুদ্ধ করছে সবাই। আর তারা তা করছে ইরাকি সম্পদ আর ইরাকি জীবন ব্যবহার করেই। আমি চাই না, আমার দেশ আরেকটি সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পড়ুক। আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে ইরাক টিকতে পারবে না।

জাতিসংঘে বক্তব রাখছেন ইরাকের প্রেসিডেন্ট বারহাম সালিহ

প্রশ্ন: অর্থনৈতিকভাবে এর প্রভাব কী হবে?

সালিহ: আমরা এখন অবকাঠামো পুনর্গঠন ও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছি। যুদ্ধ লাগলে মধ্যপ্রাচ্যে বিদেশী বিনিয়োগ আসবে না। এখানে বিপুলসংখ্যক তরুণ বেকার রয়েছে। আমাদের অর্থনীতিকে সম্প্রসারণ করতে হবে, চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে যদি নেতারা চাকরি, চাকরি, চাকরি করেন, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য আরো বেশি সত্য। বেকার তরুণেরা চরমপন্থায় ঝুঁকতে পারে, কেবল আমাদের সমাজই নয়, বিশ্বকেই অস্থিতিশীল করতে পারে।

পরের প্রসঙ্গে আসি। আমি মনে করি, মধ্য প্রাচ্য সম্ভবত বিশ্বের শেষ বড় অঞ্চল হিসেবে রয়ে গেছে যা ভাঙ্গেনি। বিশ শতকের প্রথম দিকে ইউরোপ পুরোপুরি ভেঙে যায়। দুটি বিশ্বযুদ্ধ একে গড়ে দিয়েছে। ৬০ ও ৭০-এ দশকে পূর্ব এশিয়া ছিল প্রধান সঙ্ঘাত ক্ষেত্র। ভিয়েতনাম, কোরিয়ায় যুদ্ধ হয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে ল্যাতিন আমেরিকা ও মধ্য আমেরিকা ছিল সঙ্ঘাত ক্ষেত্র। এটা যেভাবেই হোক না কেন, নির্ধারিত হয়ে গেছে। ১৯৯০-এর দশকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও দক্ষিণ আফ্রিকা নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু বিশ্ব শতকের পুরো সময় ও একুশ শতকে এটি হচ্ছে বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীলতার প্রধান উৎস।

এই অঞ্চলটির ফয়সালা হওয়া উচিত। এখানে সমাধান আসতে হবে প্রতিবেশীদের মধ্য থেকে। অর্থনৈতিক একীভূতকরণ ছাড়া আর কোনো বিকল্প আমি দেখি না। ইরাক-ইরান যুদ্ধে ফেরা যাক। এতে ইরাক বা ইরানের কী লাভ হয়েছে? আমরা কি কোনো নিরাপত্তা পেয়েছি? এতে কি আমরা স্থিতিশীলতা পেয়েছি? অনেক লোক নিহত হয়েছে, অনেক লোক পঙ্গু হয়েছে। অনেক সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধ কখনোই সমাধান হতে পারে না।

প্রশ্ন: ইরান-ইরাক যুদ্ধ থেকে ইরান সম্পর্কে কী শিক্ষা গ্রহণ করেছেন?

সালিহ: ইরান একটি প্রধান ভূরাজনৈতিক খেলোয়াড়র। ইরান হলো হাজার বছরের সভ্যতার সংস্কৃতি। আবার ইরাক হলো এই অঞ্চলের কেন্দ্রবিন্দু। ইরাকের স্থিতিশীলতায় প্রতিবেশী সবার স্বার্থ রয়েছে। ইরাককে অস্থিতিশীল রাখাটা তারা হজম করতে পারবে না।

প্রশ্ন: সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবে হামলার জন্য কি ইরান দায়ী? ইরানের উদ্দেশ্য কী ছিল?

সালিহ: সবার কাছেই ইরানের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। আপনি যদি আমার তেল বিক্রিতে বাধা দেন, আমাকে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করেন, তবে আমি অন্যদেরও তা করতে দেব না। অবরোধ দ্ব্যর্থপূর্ণ হাতিয়ার। তারা আমার প্রতিবেশী। তাদের কল্যাণের চিন্তাই আমাদের করতে হবে।

দিন শেষে আমাদের টেবিলে বসেই আলোচনা করতে হবে। আগ্রাসন ও আক্রমণের নিন্দা আমি করি। যেই ব্যবহার করুক না কেন, সামরিক শক্তি ব্যবহারের নিন্দা করি আমি। আবারো বলছি, অনেক যুদ্ধ দেখেছি। আর যুদ্ধ চাই না আমরা।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের মিত্র, আর ইরান হলো আমাদের প্রতিবেশী।