আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২০

কাশ্মীর প্রশ্নে ভারতের পক্ষ নেবেন কোন মার্কিন প্রেসিডেন্ট

ISSUE-1-ENG-17-10-2020-Kashmir

বিশ্বের প্রত্যন্ত একটি এলাকা হলো কাশ্মীর। তুষারাবৃত পর্বত আর চোখ জুড়ানো আপেল বাগান শোভিত এই এলাকাটির অবস্থান ভারত, পাকিস্তান আর চীনের মাঝখানে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলের পরিচয় সীমান্ত উত্তেজনা, ভারি সামরিকায়ন, জনগণের বিক্ষোভ আর সন্ত্রাসী হামলার মধ্য দিয়ে। ছোট্ট এই ভূখণ্ডটি ভূস্বর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও ১৯৪৭ সালে ভারত আর পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চল নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সঙ্ঘাত চলে আসছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই প্রার্থীও এটা নিয়ে কথা বলেছেন। 

ভারত এককালের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভাগ করে দুটো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠন করেছে, যেটা এখন আন্তর্জাতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের আগস্টে, ভারত সরকার দেশের সংবিধান থেকে ৩৭০ ও ৩৫এ অনুচ্ছেদ বাতিল করে, যেখানে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা দেয়া ছিল, এবং তাদের নিজস্ব সংবিধান গ্রহণের অধিকার দেয়া ছিল। ওই সিদ্ধান্তের পর সরকার কাশ্মীরে ইন্টারনেট সংযোগ পুরোপুরি বন্ধ রাখে, গত মার্চে কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে যদিও ইন্টারনেট সীমিত আকারে পুনর্বহাল করা হয়েছে। তবে এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা সেখানকার দুর্বল অর্থনীতির উপর মারাত্মক আঘাত হেনেছে। 

পাকিস্তান অর্ধেক কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ করে এবং পুরো কাশ্মীরকেই নিজেদের বলে দাবি করে। ভারত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর থেকেই বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে উত্থাপন করেছে পাকিস্তান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েকবার কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেও প্রত্যেকবারই ভারত সেটা নাকচ করে দিয়েছে। 

ট্রাম্পের পদক্ষেপকে ভারত ও পাকিস্তানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগের নীতি থেকে সরে আসার লক্ষণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। নয়াদিল্লী-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশানের রিসার্চ ফেলো কাশিশ পারপিয়ানি বলেন, শীতল যুদ্ধের পর থেকেই পাশাপাশি দুই দেশ ভারত আর পাকিস্তানকে মূলত সমান দৃষ্টিতেই দেখে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, “কিন্তু ঘটনাক্রমে ট্রাম্প প্রশাসন এগিয়ে এসে ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং ‘কাশ্মীর পুরোপুরি ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে ভারত যে দাবি করে থাকে, তাকে সমর্থন দিয়েছে”।

ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলে অবশ্য এই অবস্থান বদলে যেতে পারে। 

কাশ্মীর নিয়ে আরও সরব অবস্থান

বাইডেনের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রচারণায় কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে জোরালো বক্তব্য রাখা হয়েছে। ‘মুসলিম আমেরিকানদের জন্য জো বাইডেনের এজেন্ডার’র মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় মুসলিম কমিউনিটির উপর নির্যাতনের বিষয়টি রাখা হয়েছে। সেখানে কাশ্মীরের চলমান ঘটনাপ্রবাহ, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অবস্থা এবং পশ্চিম চীনে উইঘুরদের পরিস্থিতিকে একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, “কাশ্মীরে, ভারত সরকারের উচিত কাশ্মীরের সকল মানুষের অধিকার পুনর্বহালের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। ভিন্নমতের উপর বিধিনিষেধ আরোপ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে বাধা দান বা ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়”।

ভারতের জন্য আরও খারাপ খবর হলো, বাইডেনের প্রচারণায় বিতর্কিত ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স এবং সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে। এই আইনগুলোকে কেন্দ্র করে ভারতে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাপক বিক্ষোভ ও সহিংসতা হয়েছে। 

কিন্তু এ ধরনের সক্রিয় নিন্দা জানালে মার্কিন কোন প্রশাসনের জন্য সেটা হয়তো ভালো হবে না। আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক উইলসন সেন্টারের ডেপুটি ডিরেক্টর ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র সহযোগী মিশেল কুগেলম্যান বলেন, “বাইডেন যদি হোয়াইট হাউজে যান, এবং পররাষ্ট্র নীতির শীর্ষ পর্যায়ে তিনি যদি লিবারেল ডেমোক্র্যাটকে নিয়ে আসেন, তাহলে কাশ্মীরে ভারতের নীতি এবং তাদের অভ্যন্তরীণ নীতির ব্যাপারে আমরা হয়তো ভবিষ্যতে আরও সমালোচনা শুনতে পাবো। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে আমি অত বেশি বাড়াতে চাই না। ভারতের সাথে অংশীদারিত্বের সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্র যে গুরুত্ব দেয়, সে কারণে আমরা চাইবো না যে, বাইডেন প্রশাসন নয়াদিল্লীকে ক্ষুব্ধ করুক”। 

ভারসাম্য দরকার

ভারতীয় আমেরিকানরা সাধারণত ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়ে থাকেন, এবং এবারও তার খুব একটা ব্যতিক্রম হবে না। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে যে, ৭০ শতাংশের বেশি ভারতীয় আমেরিকান বাইডেনকে ভোট দিতে পারেন। এই সম্পদশালী এবং সুশিক্ষিত কমিউনিটি ডেমোক্র্যাট প্রাইমারির জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থও সংগ্রহ করে দিয়েছে। 

পারমিয়ানি বলেন, বাইডেনের প্রচারণার ক্ষেত্রে এটা অবশ্য সতর্ক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়, কারণ তার রানিং মেট কামালা হ্যারিসের মা ছিলেন ভারতীয়, আবার বাইডেন সেখানে মোদি সরকারের কাশ্মীর নীতি নিয়ে সরব বিরোধিতা করছেন। কৌতুহলের বিষয় হলো, আরেক ডেমোক্র্যাটিক হাউজ প্রতিনিধি প্রমীলা জয়পাল, যিনি কাশ্মীরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা বন্ধের প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন, তাকেও “প্রচারণার ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখা হয়েছে”।

এটা আবার বাইডেনের আরেকটি সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ উল্টো অবস্থান, যেখানে তিনি তার মুসলিমদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার সমন্বয়ক অমিত জানিকে প্রচারণা থেকে বাদ দিয়েছেন। পারপিয়ানি লিখেছেন, “দীর্ঘমেয়াদি ভারতীয় আমেরিকান এই ডেমোক্র্যাটকে বাদ দেয়ার কারণ হলো তার পরিবারের সদস্যদের সাথে মোদি এবং ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এবং সেই সূত্রে তার বিরুদ্ধে ইসলামবিদ্বেষের অভিযোগ এনে একাধিক অনলাইন পিটিশান করা হয়। 

কিন্তু এগুলোর কোনটাতেই নয়াদিল্লীর খুব একটা উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত নয়। আর সে জন্য তাদেরকে চায়না ইফেক্টকে ধন্যবাদ দিতে হবে। 

ওয়াশিংটন-ভিত্তিক বৈশ্বিক কৌশলগত উপদেষ্টা কোম্পানি মার্টিন+ক্রাম্পটন-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর রেভা গুজন বলেন, “যেহেতু পাকিস্তানের সাথে চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে, সে কারণে ভারত এই স্বাচ্ছন্দ্যটুকু পেতে পারে যে, চীনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আঞ্চলিক পাল্টা-ভারসাম্য তৈরির জন্য ইসলামাবাদের উপরে নয়াদিল্লীর সাথে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেবে যুক্তরাষ্ট্র”।