আমরা লাইভে English সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

সীমান্ত জেলার করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

117907297_307544527186732_5895825620178091386_n_0
অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ ও অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক।

সীমান্তবর্তী এলাকায় চলা লকডাউন কার্যকর করতে হবে।

* নিম্ন আয়ের মানুষকে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করতে হবে।

* সীমান্ত এলাকায় চোরাপথে যাওয়া-আসা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।

* অক্সিজেন ও শয্যা সংকট দ্রুত কাটাতে হবে।

* যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করে সীমান্ত সম্পূর্ণভাবে সিল করে দিতে হবে।

* সীমান্ত এলাকার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে এখনই র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

* সিলিন্ডারে অক্সিজেন, অক্সিজেন মাস্ক ও হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা নিশ্চিত করতে হবে।

* সন্দেহভাজনদেরকে বাড়িতে নয়, সরকারিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখতে হবে।

* স্বাস্থ্যবিধি মানায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

দেশের সীমান্তবর্তী জেলা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট এবং নাটোর জেলায় করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার সাতক্ষীরায় ৫৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ, নাটোরে ৫২ দশমিক ২৭ শতাংশ, যশোরে ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ, বাগেরহাটে ৪৪ দশমিক ৮১ শতাংশ, রাজশাহীতে ৪০ দশমিক ৬১ শতাংশ, কুষ্টিয়ায় ৩০ দশমিক ১৮ শতাংশ, খুলনায় ২৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ ও চাঁপাইনবাবঞ্জে ১৬ দশমিক ১৬ শতাংশ।

পরীক্ষা বিবেচনায় এসব এলাকায় সংক্রমণ হারের ঊর্ধ্বগতি দেখা গেলেও প্রয়োজনের তুলনায় সেখানে পরীক্ষার সক্ষমতাও কম। আবার চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই। সীমান্তগুলো বন্ধ থাকলেও এখনো অবৈধভাবে অবাধে আসা-যাওয়া চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব সমস্যা বিবেচনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয় কী? দ্য ডেইলি স্টার কথা বলেছে প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হকের সঙ্গে।

অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ‘সীমান্তবর্তী বেশকিছু এলাকায় লকডাউন চলছে। প্রথমেই সেই লকডাউনটা কার্যকর করতে হবে। কারণ, যেভাবেই হোক আমাদের সংক্রমণ ঠেকাতে হবে। হাসপাতালে শয্যা-আইসিইউর সংখ্যা বাড়ালেও রোগী যদি কমানো না যায়, তাহলে তো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। এজন্য প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সবচেয়ে জরুরি। এরজন্যে স্থানীয় জনগণকে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। যেখানে যেখানে লকডাউন চলছে, সেটা কঠোরভাবে মানানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে জনগণকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করতে হবে। কেউই একা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। প্রশাসনসহ সবাইকে এর জন্যে কাজ করতে হবে।’

‘সেসব এলাকার যানবাহন যাতে বাইরে না যায় এবং বাইরে থেকেও কোনো যানবাহন যাতে সেসব এলাকায় না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সংক্রমণ ছড়িয়ে যাবে।’

লকডাউন নিশ্চিতে নিম্ন আয়ের মানুষকে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সরবরাহ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। ‘নিম্ন আয়ের লোকজনের ক্ষেত্রে শুধু লকডাউন দিলেই হবে না। লকডাউনকালে তাদের জন্যে চাল, ডাল, আটা, পেঁয়াজ, রসুনসহ ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নিশ্চিত করতে হবে। এতে লকডাউন কার্যকর হবে।’

চোরাপথে পার্শ্ববর্তী দেশে যাওয়া ও সেখান থেকে আসা কঠোরভাবে বন্ধ করার কথা উল্লেখ করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে যাওয়া-আসার বিষয়টি সরকার কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু, চোরাপথে অনেক লোকজন যাওয়া-আসা করে বলে শোনা যায়। এটা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। যাতে কেউ ঢুকতেও না পারে, বের হতেও না পারে। পরিবহন শ্রমিকরা অবাধে আসা-যাওয়া করছে বলেও শোনা যায়। তাদের অনেকের করোনা সনদও থাকে না। কঠোরতা অবলম্বন করে অনতিবিলম্বে এটা বন্ধ করতে হবে। মোদ্দা কথা, সংক্রমণটাই আমাদের ঠেকাতে হবে। সেটা না পারলে কিন্তু মৃত্যুও বাড়বে।’

স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন ও শয্যা সংকট দ্রুত যতটা সম্ভব কাটানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সীমান্ত এলাকার হাসপাতালগুলোতে চাপ অনেক বেড়েছে। অক্সিজেন সংকট, শয্যা সংকট— দ্রুত যতটুকু সম্ভব এ সমস্যাগুলো কাটাতে হবে। বিশেষ করে অক্সিজেন সংকটটা দ্রুত কাটাতে হবে। দ্রুত সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেমের ব্যবস্থা করা দরকার। সেটা না পারলে অন্তত সিলিন্ডার দিয়ে তা করতে হবে। আর গুরুতর রোগীদেরকে জরুরি ভিত্তিতে অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে আশপাশের বড় হাসপাতাল বা ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি করোনা শনাক্তে সেসব এলাকায় পরীক্ষার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।’

বর্তমানে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথমেই সীমান্ত সম্পূর্ণভাবে সিল করে দিতে হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধকালীন সময়ের মতো পরিস্থিতি বিবেচনা করে সীমান্ত সম্পূর্ণভাবে সিল করে দিতে হবে। যাতে কেউ যেতেও না পারে, আসতেও না পারে। অবৈধভাবেও আসা-যাওয়া ঠেকাতে পোরাস সীমান্তকে নন-পোরাস করতে হবে।’

সীমান্তবর্তী এলাকায় করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় যতগুলো উপজেলা কমপ্লেক্স আছে, সেগুলোতে এখনই র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে সেখানকার আইসোলেশন ইউনিটটাকে শক্তিশালী করতে হবে। যাতে অ্যান্টিজেন পরীক্ষায় পজিটিভ আসা ব্যক্তিদের সেখানে রেখে চিকিৎসা দেওয়া যায়। তাদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্যে তিনটা জিনিস নিশ্চিত করতে হবে। সেগুলো হলো— সিলিন্ডারে অক্সিজেন, অক্সিজেন মাস্ক ও হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা। কারণ, ভারতীয় ডেলটা ভ্যারিয়েন্টটা খুব দ্রুত ফুসফুসে ছড়ায়। সুতরাং যত দ্রুত রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাবে, তত দ্রুত জীবন বাঁচানো যাবে। সর্বোপরি স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর সক্ষমতা দ্রুতই বাড়াতে হবে।’

সীমান্ত এলাকার জেলা হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছিল প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ শয্যা নিশ্চিত করা। এখন জরুরি ভিত্তিতে সীমান্ত এলাকার জেলা হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে সেখানে ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ ইউনিট সংযোজিত করতে হবে। যাতে মৃত্যুহার কমানো যায়।’

সরকারিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন নিশ্চিতের বিষয়ে জোর দিয়ে অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, ‘প্রতিটি উপজেলায় সরকারিভাবে কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে কন্টাক্ট ট্রেসিং জোরদার করতে হবে। ট্রেসিং করে যাদের বের করা হবে, তাদেরকে সরকারিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনেই রাখতে হবে, বাড়িতে নয়।’

সবশেষে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মানায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। আমরা এখন জনগণকে সচেতন করছি। কিন্তু, তা যথেষ্ট নয়। ডব্লিউএইচও একই বাক্যে জনসচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততার কথা বলেছে। স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। পরবর্তীতে টিকা পাওয়া গেলে তাদেরকে টিকা দিতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় এসব করার কোনো বিকল্প নেই।’