আমরা লাইভে English সোমবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১

বিলাসিতা ও অনাহার: বৈষম্যে ভরা মহামারির দুই দিক

কোভিডের অভিঘাতে আকাশ ছুঁয়েছে ভারতের অর্থনৈতিক বৈষম্য। কেউ যখন ৪ লাখ ডলারের এসইউভি কিনছেন, অন্যরা তখন দেউলিয়া হয়ে বিক্রি করছেন বসতবাড়ি

1000x-1-10

করোনা সংক্রমণের তীব্র ঢেউয়ের মাঝেই মার্সিডিজ বেঞ্জ কোম্পানি সম্প্রতি ভারতের বাজারে তাদের মেবাখ এসইউভি নিয়ে আসে। ২০২১ সাল জুড়ে ৫০টি এই মডেলের গাড়ি বিক্রির পরিকল্পনা করেছিল জার্মান কোম্পানিটি। কিন্তু, চার লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের বিলাসবহুল গাড়িগুলো মাত্র এক মাসেই বিক্রি হয়ে যায়। মহামারির অভিঘাতে ভারতে মাথাপিছু আয় ২,০০০ মার্কিন ডলারের নিচে নেমে প্রতিবেশী বাংলাদেশের চাইতেও পেছনে পড়লেও; ভারতীয় ধনীদের দামি গাড়িটি সংগ্রহে রাখতে হুমড়ি খেয়ে পড়তেই দেখা যায়। 

১৯৫০ ও ৬০- এর দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অসম বিকাশ নিয়ে তার 'কুজনেৎস কার্ভ' শীর্ষক তত্ত্বটি উপস্থাপন করেছিলেন মার্কিন অর্থনীতিবিদ সাইমন কুজনেৎস। সে অনুসারে একটি দেশের বিকাশের কালে বৈষম্য তীব্রতর হয় এবং এরপর একটি পর্যায়ে বাজারশক্তির প্রভাবে সম্পদের অসম ব্যবধানটি কমতে থাকে।

ঐতিহাসিকভাবে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো বরাবর উচ্চমাত্রায় বৈষম্যকে মেনে চলেছে। তারা আশা করেছিল, একসময় কুজনেৎস কার্ভের মোড়ে পৌঁছানোর পর আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যও কমতে থাকবে। বিতর্কিত এই তত্ত্বের বাস্তব প্রতিফলন যাই হোক না কেন, কোভিড-১৯ মহামারি যে বৈষম্য জন্ম দিয়েছে তা কোনোভাবেই উন্নয়নের মূল্য হতে পারে না।

আজ ভারত যে অবস্থায় পড়েছে, সেখানে একদিকে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে বিলাসবহুল গাড়ি, বাড়ছে মোট বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা; আরেকদিকে ব্যাপক বেকারত্ব ও মধ্যবিত্তের ফুরিয়ে আসা সঞ্চয়- বাজেট প্রণয়নের সময় প্রজ্ঞার অভাবকে তুলে ধরছে। গেল বছর দরিদ্র পরিবারগুলো আগের তুলনায় কম খাদ্যগ্রহণ করেছে, অর্থনীতিবিদেরাও চরম খাদ্য বঞ্চণার আরেক ঢেউয়ের ব্যাপারে সতর্ক করছেন। এ বাস্তবতায় সমাজের সহায়সম্বলহীন মানুষের জন্য আরও খরচ করতে রাষ্ট্রীয় অনীহার কারণে চরমমূল্য দিতে হতে পারে।

ব্লুমবার্গ নিউজে কিছুদিন আগে প্রকাশিত এক সংবাদে উঠে আসে পাদুকা প্রস্তুতকারক শ্যামবাবু নিগমের দুর্দশার কথা। স্ত্রীর কোভিড-১৯ জনিত অসুস্থতার চিকিৎসা করাতে গিয়ে তাকে পরিশোধ করতে হয় ৮,২৩০ মার্কিন ডলার সমমূল্যের বিল। অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি নিজের ছোটখাট বাড়িটিও বিক্রি করেছেন, আরও বেঁচেছেন ব্যবসার পুঁজি চামড়া সেলাইয়ের তিনটি যন্ত্রের একটি।

ঋণভারে জর্জরিত এই দম্পতি এখন পাশের একটি গ্রামে এক ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন। আজ ভারতে এমন অজস্র মানুষের দুর্দশা ও আর্থিক দৈন্যতার চিত্র প্রতিনিয়ত সংবাদের অংশ হচ্ছে। অথচ গত মে মাস থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ে জরুরি ঋণ সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু, শ্যামবাবুর মতো অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তা পর্যন্ত সেই সহায়তা পৌঁছায়নি।

আগামী নভেম্বর পর্যন্ত নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য শস্য সহায়তার বিদ্যমান একটি কর্মসূচির মেয়াদ বৃদ্ধি করেছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রায় ৮০ কোটি নাগরিককে এ সহায়তা দেওয়া হবে। গত বছর সরকারের দেওয়া ধান ও গম সত্যিকার অর্থেই দরিদ্রদের সাহায্য করেছে, তবে আয়হীন দশায় আর্থ-সামাজিক অবস্থানে নিচের দিকে থাকা এক-চতুর্থাংশ জনগণ মাংস, ডিম ও ফলের পেছনে ব্যয় অনেকগুণ কমাতে বাধ্য হন।

মহামারির মধ্যে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো পুষ্টি সঙ্কট এড়াতে দরিদ্র গৃহস্থালি পর্যায়ে জরুরি আয় সহায়তা দেওয়া উচিৎ। মহামারির আগে এসব পরিবারের দৈনিক আয় ছিল দৈনিক ২ ডলারের কিছু বেশি। এই পরিমাণেই তাদের অন্তত তিন মাস আয় সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। ব্যাঙ্গালোর ভিত্তিক আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদদের একটি দল এ সুপারিশ করেছেন।

তবে গবেষক দলটি বলেছে, যদিওবা এতে দরিদ্ররা কিছুটা উপকৃত হবেন, তবুও এটি যথেষ্ট নয়। "গেল বছর আয় হারানো সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ গৃহস্থালিতে আমরা নগদ সহায়তার সুপারিশ করেছি। কিন্তু, দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রভাবিতদের এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।"     

আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে সরকার এখনও অর্থ সহায়তার কোনো পরিকল্পনা করেনি। বরং সরকারি ঋণের সুদ খরচ সীমিত রাখার চেষ্টায় সাধারণ মানুষের ওপর পশ্চাদমুখী ভোক্তা শুল্কের চাপ বাড়ানো হয়েছে। ভ্যাটের অত্যাচার থেকে বাদ পড়েনি জ্বালানি তেল ও কোভিড-১৯ চিকিৎসার প্রাণরক্ষাকারী ওষুধ। একইসময়ে, বেড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক (আরবিআই) থেকে পাওয়া সস্তা অর্থের ওপর নির্ভরশীলতা। অতিরিক্ত তারল্যের এই নীতিতে সম্পদমূল্য বেড়েছে যা কাগজেকলমে হতাশার মরুতে প্রাচুর্যের মরূদ্যানের মতোই দেখাচ্ছে।

তবে বাস্তব ঘটনা হলো; মহামারির অভিঘাতে ছোট প্রতিষ্ঠান ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নমনীয় আর্থিক নীতির সুবিধাও পাচ্ছে তারা। দুইয়ে মিলে ফুলেফেঁপে উঠেছে তাদের বাজার মূল্যায়ন। দরিদ্রের কর্মসংস্থান কেড়ে নিয়ে এভাবে যে সম্পদ তৈরি হচ্ছে সেটাই মেবাখ এসইউভিসহ অন্যান্য বিলাসবহুল পণ্য বিক্রিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

যেমন বলা যাক, মোদির নিজ রাজ্যের ধনকুবের গৌতম আদানির কথাই। চলতি বছর সম্পদমূল্যের স্ফীতি নিয়ে তিনি এশিয়ার দ্বিতীয় সেরা ধনীতে পরিণত হন। অন্য ধনীরাও বাদ যাননি। আরেক বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী রাধাকৃষ্ণানন দামানি গত এপ্রিলে ১৩৭ মিলিয়ন ডলারে মুম্বাইয়ে এক ম্যানসন কেনেন, যা কিনা ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি আবাসিক সম্পত্তি ক্রয়।

দুরাবস্থা শুধু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ে নয়, এমনকি দেশের মাঝারি ও ছোট আকারের ইস্পাত উৎপাদকেরা তাদের সক্ষমতার মাত্র ৬২ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। অন্যদিকে, মাত্র এক বছরে শীর্ষ পাঁচ ইস্পাত উৎপাদক শিল্প প্রতিষ্ঠানের শেয়ারমূল্য সমন্বিতভাবে ৫ শতাংশ পয়েন্ট থেকে ৫৮ বেড়েছে। রেকর্ড মুনাফায় ভর করে তারা নিজেদের ঋণের পরিমাণও কমাতে পারছে, বলে জানায় এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ইঙ্কের সহযোগী বাজার বিশ্লেষক সংস্থা ক্রিসিল। 

আগামী মার্চে সরকার যখন তার বার্ষিক খরচের ইতি টানবে তখন বাজেট ঘাটতি ২০৬ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার অনুমান করা হচ্ছে। মহামারি পূর্ব স্বাভাবিক অবস্থায় এই ঘাটতি হতো সামগ্রিক জিডিপির ৬.৮ শতাংশ, কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস এপ্রিল ও মে'র ভয়াবহ সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে তা আরও বেশি হবে। উৎপাদন প্রবৃদ্ধিও ধীরগতির হবে, প্রত্যাশার তুলনায় হ্রাস পাবে প্রকৃত রাজস্ব আদায়। কিন্তু, সরকার যখন আদায় করা অর্থের চাইতে নিজেই বেশি ব্যয় করে, তখন বেসরকারি খাতের হাতে অর্থ থাকে বেশি। কিন্তু, প্রশ্ন হলো অর্থ কি সঠিক হাতে আছে? উত্তরটিও জানা, সম্ভবত একেবারেই নয়।

ইতোমধ্যেই,শিথিল করা হচ্ছে স্থানীয় পর্যায়ের লকডাউন। তাই জানুয়ারি থেকে কাজ হারানো দুই কোটি ৩০ লাখ দিনমজুরকে আবার নতুন করে জীবন সংগ্রামে নামতে হবে। মাসিক বেতনের ওপর নির্ভরশীল নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরাও আছেন সংকটে। তাদের অন্তত ৮৫ লাখ চলতি বছর চাকরি হারিয়েছেন। টুকটাক ফরমায়েশের কাজ করেই জীবিকা অর্জন করছেন অনেকে।

ডিজিটালাইজেশনের এই যুগে নয়া পরিষেবার স্টার্টআপ উদ্যোগ স্বভাবতই সাফল্যের মুখ দেখবে। আরে সেখানে বিনিয়োগকারী হচ্ছেন ধনী উদ্যোক্তারা। যার বিপরীতে, জুতা প্রস্তুতকারক শ্যামবাবু নিগমের মতো লাখ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হারিয়ে যাবেন অর্থনীতি থেকে। স্বাবলম্বী কর্মদাতা থেকে তারা নিঃস্বে পরিণত হচ্ছেন।  

শ্যামবাবু উত্তর ভারতের আগ্রা শহরের বাসিন্দা। তার সাবেক বাড়ি থেকেই দেখা যায়, স্ত্রীর মৃত্যুতে শোক বিহ্বল মুঘল সম্রাট শাজাহানের অমর কীর্তি তাজমহল। প্রাসাদ না গড়লেও, স্ত্রীকে বাঁচাতে দুই শয়নকক্ষের বাড়ি বিক্রি করে শ্যামবাবুও কম আত্মত্যাগ করেননি। তাজমহল গড়ার মতোই বহু বছরের সাধনায় কিনেছিলেন বাড়িটি, শাহজাহানের তাজের মতোই আজ যার মালিক অন্য কেউ।