English বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০

পাকিস্তানের উপর প্রস্তাবিত চীন-ইরান চুক্তির প্রভাব বিপুল

ISSUE-4-ENG-29-07-2020-Iran

ইরান ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদারিত্ববিষয়ক ১৪ পৃষ্ঠার একটি খসড়া চুক্তি চলতি মাসে ফাঁস হয়েছে। এর পর থেকেই চুক্তিটি নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়। এই অঞ্চলে এর প্রভাব কী হবে, তা নিয়েও চলছে গুঞ্জন। তবে একটি দেশের ওপর এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। সেই দেশটি হচ্ছে পাকিস্তান।

চুক্তিটি নিয়ে প্রকাশিত নানা ধরনের মিডিয়া কথনে ইরানে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। 

চুক্তিটি এভাবে ফাঁস কেন করা হলো, তা অস্পষ্ট। সম্ভবত ইরান এই বার্তা দিতে চায় যে তার হাতে অন্যান্য বিকল্পও আছে। অবশ্য এটাও ঠিক যে পাকিস্তানসহ অন্য ১৫টি দেশের সাথেও চীনের এ ধরনের চুক্তি আছে।

ইরান ও পাকিস্তান প্রতিবেশী হওয়ায় তেহরান ও বেইজিংয়ের মধ্যে যেকোনো চুক্তি হওয়া মানে ইসলামাবাদের ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়া। তাছাড়া কোনো কোনো প্রকল্প ত্রিপক্ষীয় ভিত্তিতেও হতে পারে। আবার ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, ইরান-চীন চুক্তিটি পাকিস্তানের জন্য খুবই কল্যাণকর।

প্রথমত, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী, ইরানে চীন ৪০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে। ফলে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরে (সিপিইসি) বিনিয়োগ করা ৪৬ বিলিয়ন ডলার খুবই কম মনে হবে। এমনকি যদিও ওই অর্থ ২৫ বছর মেয়াদে ব্যয় করা হবে, তবুও বোঝা যাচ্ছে, পাকিস্তানের চেয়ে ইরান হবে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য পাকিস্তানের সিপিইসি বাস্তবায়নে মন্থরতার আলোকে বলা যায়, ইরানের কার্যক্রম বাস্তবায়নও পরিকল্পনার চেয়ে বেশি সময় নেবে।

আরও পড়ুনঃ ইরান-চীন চুক্তি ভারতের জন্য নতুন হুমকি

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জোনাথন হিলম্যান ও ম্যাসি ম্যাকক্যালপিনের মতে, এখন পর্যন্ত সিপিইসি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ৫ বছরের মধ্যে প্রকল্পটির এক চতুর্থাংশ কাজ হয়েছে। জ্বালানি প্রকল্পগুলো প্রাধান্য পেয়েছে, শিল্পায়নের চেষ্টা পিছিয়ে আছে।

গত দুই বছরে মন্থর গতি সত্ত্বেও সিপিইসি চলতি মাসে কিছু গতি পেয়েছে, কয়েকটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এগিয়ে চলেছে, ৭.২ বিলিয়ন ডলারের রেলওয়ে প্রকল্প চাঙ্গা হয়েছে।

তবে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা এখনো বেশ অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। ইরান সম্ভবত আরো সুবিধাজনক শর্ত নিয়ে আলোচনা করবে। তবে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ২৫ বছরের জন্য ইরানি তেল ও গ্যাস চীনে সরবরাহ করার জন্য প্রতিশ্রুতিও থাকবে।

দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দর থেকে ৭২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইরানের চাবাহার বন্দর উন্নয়ন করছে চীন। চাবাহার বন্দর উভয় দেশের জন্য কল্যাণকর হবে। ২০১৭ সালে চাবাহার উদ্বোধনের পর দুই ‘সিস্টার’ বন্দরে মধ্যে কার্যক্রমে সমন্বয় সাধনের জন্য পাকিস্তানের সাথে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে চীন। গোয়াদারে বিদ্যুৎ রফতানির পরিকল্পনাও করছে ইরান।

বেইজিং অবশ্য ইরানে আরো কয়েকটি বন্দর উন্নয়নের পরিকল্পনা করছে। চাহাবার থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দূরে বন্দর-ই-জাস্ক হরমুজ উপসাগরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত। আবার হরমুজ দিয়েই সবচেয়ে বেশি তেল পরিবহন করা হয়।

এর ফলে বিআরআই ফ্লাগশিপ করিডোর হিসেবে গোয়াদার দীর্ঘ মেয়াদে তার বিশেষ মর্যাদা হারাতে পারে।

আরও পড়ুনঃ চীন-ইরান জোট নিয়ে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত

তৃতীয়ত, নিরাপত্তার দৃষ্টকোণ অনুযায়ী, ইরান বিআরআইয়ে সম্পৃক্ত থাকার ফলে বালুচিস্তানে সিপিইসি নিরাপদ থাকবে। কয়েক মাস ধরে এখানে সন্ত্রাসীরা হামলা চালাচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

চতুর্থত, ইরানের মরুভূমিতে স্বচ্ছ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে চীন। এটি পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের কাছাকাছি হওয়ায় তা পাকিস্তানের জন্য কল্যাণকর হতে পারে।

তাছাড়া পাকিস্তান-ইরান-চীন তেল ও গ্যাস পাইপলাইন পাকিস্তানের জন্য নিরাপদ জ্বালানি রাজস্ব নিশ্চিত করতে পারে।

বেইজিংয়ের নীরবতা অনেক কথা বলে

ইরানের সাথে চীনের চুক্তিতে ক্ষুব্ধ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অবরোধের কারণে গত বছর ইরান থেকে তেল আমদানি অনেক কমিয়ে দিয়েছিল চীন। চীন-ইরান চুক্তি প্রসঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র জানায়, ইরানকে সহায়তাদানকারী চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র।

এদিকে চীনের সাথে চুক্তির কথা প্রকাশ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ রাশিয়া সফরে গেছেন। ছয় মাসের মধ্যে রাশিয়ায় এটি তার তৃতীয় সফর। ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে ২০ বছর মেয়াদি পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি নিয়েও তিনি আলোচনা করছেন বলে খবরে প্রকাশ।

ফলে ইরান বেশ বড় পরিকল্পনা নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে।