আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

‘দক্ষিণ এশিয়ার উচিৎ তার উজ্জ্বল নক্ষত্র বাংলাদেশকে গুরুত্ব দেওয়া’

এক সময়ের দরিদ্রতম বাংলাদেশ থেকে আজ ভারত ও পাকিস্তানের অনেক কিছুই শেখার আছে

rmg_garments_factory_worker

প্রায় অর্ধ-শতক আগে ১৯৭১ সালের মার্চে তুলনামূলক ধনী ও শক্তিশালী পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বাংলাদেশের স্থপতি। এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে দেশটির জন্ম হয়। প্রাণ বাঁচাতে প্রতিবেশী ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেয় লাখ লাখ মানুষ, আরও অনেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হত্যার শিকার হয়।

পাক বাহিনীর মার্কিন সমর্থকরা মনে করেছিলেন; নতুন দেশটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে 'তলাবিহীন ঝুড়ি' বলে সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেন। মার্কিন সরকার বাংলাদেশের জনগণের দুর্দশা নিয়ে উদাসীন হলেও, শিল্পীরা এগিয়ে আসেন। জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবি শঙ্কর প্রথমবারের মতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ চাঁদা ও অনুদান সংগ্রহ করে ইউনিসেফকে দেন, যাতে সংস্থাটি যুদ্ধ-বিধস্ত দেশটিতে ত্রাণ কার্যক্রম চালাতে পারে।   

চলতি মাসে বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের জানান, গেল বছরের মাথাপিছু জিডিপি'র পরিমাণ ৯ শতাংশ বেড়ে ২,২২৭ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। সে তুলনায় পাকিস্তানে জিডিপি'র মাথাপিছু বিন্যাস ১,৫৪৩ ডলার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি ধনী ছিল পাকিস্তান। আর আজ বাংলাদেশ- পাকিস্তানের চেয়ে ৪৫ গুণ বেশি ধনী। এমনকি পাকিস্তানের একজন অর্থনীতিবিদ বিষণ্ণভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন, "২০৩০ সাল নাগাদ আমাদের হয়তো বাংলাদেশের কাছে সাহায্যের হাত পাততে হবে।"

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি হিসেবে নিজ অবস্থান নিয়ে অনন্ত আস্থা ছিল ভারতের। কিন্তু, এখন সেদেশের নীতি-নির্ধারকেরাও বিস্মিত চোখে দেখেছেন, বাংলাদেশ মাথাপিছু জিডিপি'তে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে। গেল ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১,৯৪৭ ডলার। 

কিন্তু, তাই বলে বাংলাদেশের সফলতায় ভারত অভিনন্দন জানাবে এমন অলীক প্রত্যাশা রাখবেন না। বরং ভারতের কট্টর ডানপন্থীদের অভিযোগ, বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসীরা নাকি সীমান্ত দিয়ে দলে দলে অনুপ্রবেশ করছে। ভারতের যেসব রাজ্যে অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর, যাদের তুলনায় বাংলাদেশ অনেকগুণ বেশি ধনী, সেখানকার হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা 'উইপোকা' বলছে বাংলাদেশিদের। এ যেন যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি রাজ্য হঠাৎ করে কানাডা থেকে অবৈধ অভিবাসন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে ওঠার মতো অবাস্তব ও অলীক ঘটনা। তবুও, সেই ঘৃণা ও ভয়ের চর্চা সযত্নে স্থান পাচ্ছে মূলধারার রাজনীতিতে।  

আন্তর্জাতিক একটি দাতা গোষ্ঠী যখন উভয় দেশের জিডিপির পূর্বাভাস দেয়, তখন ভারতীয় গণমাধ্যমে নেটিজেনরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন, আভাসটি বানোয়াট বলেও উড়িয়ে দেন অনেকেই। এই ক্রোধ ও অস্বীকার খুব সম্ভবত বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণার ফসল। সে তুলনায় বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমেও এনিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে দিয়ে দেশটি যে আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে, হয়তো সেকারণেই তারা দম্ভমূলক তুলনায় যায়নি।   

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির মূল স্তম্ভ তিনটি; রপ্তানি, সামাজিক অগ্রগতি এবং বার্ষিক নীতিতে পরিণামদর্শিতা। ফলস্বরূপ; ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিবছর গড়ে ৮.৬ শতাংশ হারে বাড়ে। সে তুলনায় বৈশ্বিক গড় ছিল মাত্র ০.৪ শতাংশ। বস্ত্রের মতো পণ্য উৎপাদনে জোর দেওয়ার ফলেই আসে এ সফলতা। এখাতে বাংলাদেশি পণ্য এখন তুলনামূলক প্রতিযোগী সক্ষমতায় এগিয়ে রয়েছে।

একইসঙ্গে, বাংলাদেশের শ্রম বাজারে ধারাবাহিক গতিতে বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ। সে তুলনায় কমেছে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানে। বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে, মহামারি শেষ হতে হতে ভারত ও পাকিস্তানের মোট সরকারি ঋণ জিডিপির ৯০ শতাংশ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বার্ষিক নীতির সংযত অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশের বেসরকারি খাত ঋণ নেওয়া ও বিনিয়োগের অবকাশ পায়। 

তবে দেশটির সফলতা নিজস্ব কিছু সমস্যারও জন্ম দেয়, যার অন্যতম একটি হলো; যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি'সহ নানান আন্তর্জাতিক মেকানিজমের আওতায় উন্নত দেশে শুল্কহীন রপ্তানির সুবিধা এতদিন প্রবৃদ্ধিকে সচল রাখতে সাহায্য করেছে। এসব সুবিধা স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির কল্যাণে ২০২৬ সালে নাগাদ উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ এবং তখন সুবিধাগুলো বাতিল হয়ে যাবে।  

অর্থনীতি পূর্ণাঙ্গতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে তুলনামূলক সুবিধার অন্যান্য দিকও বিকশিত হবে। যেমন এখন ভিয়েতনামের মতো কিছু দেশ শুধু পোশাক শিল্প নির্ভরতা ছেড়ে আরও উচ্চ মূল্যের পণ্য উৎপাদনে ঝুঁকেছে। এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর এই রুপান্তরের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশ যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, আগামীতে বাংলাদেশকেও তেমন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। 

আগামী দশকে অর্থনীতির ধারাবাহিক রূপান্তর এবং বৈশ্বিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিতকরণে তাই বাংলাদেশকে নতুন ধরনের কৌশল গ্রহণ করতে হবে। অর্থনৈতিক কূটনীতির সফল প্রয়োগ হতে পারে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান। উন্নত বিশ্বের বাজার সুবিধা পেতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরে উদ্যোগী হতে পারে ঢাকা। ইতোমধ্যেই, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার আসিয়ান জোটের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) প্রনয়ণের কাজ শুরু হয়েছে বলে বাংলাদেশি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। কিন্তু, আরও অনেক কিছুই করা বাকি।

এক্ষেত্রে, ভিয়েতনামকে আদর্শ মাপকাঠি ধরে নিয়ে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া উচিৎ। কারণ ভিয়েতনাম চীন নেতৃত্বাধীন রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)- চুক্তির পাশপাশি যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ টিপিপি'তেও যোগ দিয়েছে। ২০১৯ সালে হ্যানয় ইউরোপিয় ইউনিয়নের সঙ্গেও এফটিএ চুক্তি করে।

বাংলাদেশি নীতি-নির্ধারকদের বুঝতে হবে, বিদেশি প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বাণিজ্যের শর্ত নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসার কাজটি অত্যন্ত জটিল। উপলদ্ধিটি আত্মস্থ করে যত দ্রুত সম্ভব তৎপরতা শুরু করতে হবে। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সুনির্দিষ্টভাবে নিয়োগ দেওয়া বাণিজ্য আলোচকমণ্ডলী নেই। অথচ, ঢাকাকে বাড়াতে হবে তার দর কষাকষির সক্ষমতা এবং সেজন্য এই দুর্বলতা দূর করতে হবে।    

আগামীদিনের বিশাল সব চ্যালেঞ্জের পরও বলতে হয়, বিগত ৫০ বছরে সমালোচকদের মুখে ছাই দিয়ে বাংলাদেশ বিস্ময়কর অগ্রগতির যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তার কারণেই দেশটির বিরুদ্ধে বাজি ধরে কোনো নেতিবাচক আভাস দেওয়া মূর্খতা প্রমাণিত হতে পারে। ১৯৭১ সালেও অর্থনৈতিক সফলতা ছিল সুদূর-পরাহত। তবুও মনে হয়, ভ্যাটিকান সিটির চাইতেও জনঘনত্বের এই বদ্বীপের ১৬ কোটি বাসিন্দার ভাগ্যলিপিতে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভেতর ব্যতিক্রমী এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অর্জনই যেন নির্ধারিত।