আমরা লাইভে English সোমবার, আগস্ট ০২, ২০২১

পাকিস্তানে ফল চাষের আদর্শ পরিবেশ থাকলেও উৎপাদন কম

SAM SPECIAL-ENG-11-09-2020

পাকিস্তান পরিবেশগতভাবে খুব সহজে বিপুল পরিমাণে ফল উৎপাদনে সক্ষম। প্রাচীনকাল থেকেই উপমহাদেশে ফল ও সব্জি জন্মানোর প্রমাণ রয়েছে। সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতায় প্রায় চার হাজার বছর ধরে লেবুজাতীয় ফল উৎপাদিত হচ্ছে। এখানকার জলবায়ুতে প্রায় সব ধরনের ফলই চাষ করার সুযোগ রয়েছে।

আপেল, এপ্রিকট, চেরি, পিচ, নাশপতি, আলুবোখারা, আঙুর, স্ট্রবেরি ও কারেন্ট হলো তাপমাত্রা প্রভাবিত ফল। কলা, আম, পেয়ারা, পেপে ও তেঁতুল হলো মৌসুমী ফল, এগুলো হালকা কুয়াশায় সহ্য করতে পারে না। আর খেজুর, ডুমুর, কমলা ও আনার হলো আধা-উষ্ণমণ্ডলীয় ফল।

উচ্চ মূল্য ও সচেতনতা কম থাকায় শহর ও গ্রামের গরিবদের মধ্যে ফল খাওয়া হয় গড়ের চেয়ে কম এবং ধনীরা খায় গড়ের চেয়ে বেশি।

মাথাপিছু ফল খাওয়া হয় বছরে প্রায় ৩৩ কেজি। এটি প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মাত্রার চেয়ে কম। ২০১৯ সালে গ্যালপ অনুসন্ধানে দেখা যায় যে পাকিস্তানের মাত্র ২৬ ভাগ লোক প্রতিদিন ফল খায়। অথচ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ফল খাওয়া অপরিহার্য বিষয়। এ কারণেই ফল খাওয়াকে উৎসাহিত করা হয়।

মাল্টা ও কমলা (ম্যান্ডারিন) উৎপাদনে পাকিস্তান বিশ্বে ষষ্ট স্থানে রয়েছে। লেবুজাতীয় ফল মাল্টা একটি প্রধান রফতানি পণ্য। ২০১৭ সালে ২২২ মিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ৩,৭০,০০০ টন রফতানি করা হয়েছিল। আর ২০১৬ সালে ছিল ৩২৫,০০০ টন।

পাকিস্তানের চার প্রদেশে মোট ২০৬,৫৬৯ হেক্টর জমিতে লেবুজাতীয় ফল উৎপাদিত হয়। ২০১৫-১৬ সময়কালে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন টন এই ফল হয়। পাঞ্জাবের সাগোদা জেলার আবহাওয়া চমৎকার ও কৃষিব্যবস্থা অনুকূল থাকায় এখানে হয় ৯৮ ভাগ ফল। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মড়কের কারণে মাল্টা উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় শীর্ষস্থানটি হারিয়ে ফেলেছে পাকিস্তান। তাছাড়া বীজহীন ফল উৎপাদন করতে না পারাও আরেকটি কারণ। এসব সমস্যা সমাধান করতে না পারলে পাকিস্তান বর্তমান বাজারও হারিয়ে ফেলতে পারে।

অন্য ফসলের মতো লেবুজাতীয় ফলও পোকামাকড়, রোগ-বালাই ক্ষতি করে। কোনো কোনো পোকামাকড় ও রোগ ফলের কোনো ক্ষতি না করলেও গাছের প্রাণ শেষ করে দেয়। তাছাড়া অন্যান্য দেশের তুলনায় পাকিস্তানি বাগানগুলোর আয়ু অনেক কম।

এছাড়া আরো কিছু উৎকট সমস্যা আছে। এগুলোও সুরাহা করতে হবে।

উপমহাদেশের সেরা ফল

পাকিস্তানে ১৫০ ধরনের আম হয়। আম চাষের জন্য পাকিস্তানের মাটি ও জলবায়ু খুবই উপযোগী। ফাওয়ের ২০০১ সালের ইয়ার বুক অনুযাযী, বিশ্বে আম উৎপাদনের দিক থেকে পাকিস্তান পঞ্চমস্থানে রয়েছে। পাকিস্তানে আম চাষের এলাকা বাড়লেও উৎপাদন বেড়েছে তুলনামূলকভাবে কম হারে।

পাঞ্জাবের আম উৎপাদনের প্রধান এলাকা হচ্ছে মুলতান, বাহাওয়ালপুর, মুজাফফরাবাদ, রমিহ ইয়ার খান। সিন্ধুতে প্রধানত মিরপুর খাস, হায়দরাবাদ ও থাট্টায় এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে পেশোয়ার ও মারদান।

পাঞ্জাবের চেয়ে এক মাস আগে সিন্ধু প্রদেশের জলবায়ু উষ্ণ হয়। এর ফলে প্রদেশটি আগাম জাতের আম চাষের সুবিধা পায়। আর পাঞ্জাবে পরে উৎপাদিত হওয়ায় বাজার সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। এর ফলে রফতানির সুযোগও বাড়ে।

২০১৯ সালে আম উৎপাদন হয়েছিল ১.৫ মিলিয়ন টন, এর মূল্য ছিল ৮০ মিলিয়ন ডলার। ২০১৮ সালে ছিল ১.৩ মিলিয়ন। বিশ্বে পাকিস্তান ষষ্ট বৃহত্তম আম উৎপাদনকারী দেশ। পাকিস্তানি আমের শীর্ষ গন্তব্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। গত বছর মোট রফতানি করা আমের ৭০ ভাগ গেছে ওই অঞ্চলে। প্রধান প্রধান আমের প্রজাতি হচ্ছে চোষা, সিন্ধি ও আনোয়ার রাতুল। বিশেষ স্বাদ ও ঘ্রাণের জন্য এসব আম সমাদৃত।

আপেল খুবই পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল। এটি ভিটামিন সি, বি ও এ সমৃদ্ধ। এতে প্রচুর পরিমাণে মিনারেল ছাড়াও ১১ ভাগ চিনি রয়েছে। আপেল বিভিন্নভাবে খাওয়া যেতে পারে। পোকামাকড় ও রোগবালাই সত্ত্বেও আপেল উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।

তাপমাত্রা অনুকূল থাকায় বালুচিস্তানে সবচেয়ে বেশি আপেল হয়ে থাকে। জাতীয় উৎপাদনের ২৫ ভাগ হয় খাইবার পাকতুনখাওয়ায়।

আপেল উৎপাদনে বৃষ্টি একটি প্রধান শর্ত। বৃষ্টি না হলে আপেল গাছে ফল ধরে না। এ কারণেই আপেল বাগান সমতল ভূমিতে হয় না, এটি হয় পার্বত্য এলাকায়।

বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদের কারণে বালুচিস্তানে আপেল উৎপাদন বেড়েছে। গবেষণার কারণে বালুচিস্তানের আপেলের রয়েছে উচ্চ চাহিদা। তাছাড়া একরপ্রতি উৎপাদনও বেড়েছে। অন্যান্য প্রদেশেও এ ধরনের গবেষণা প্রয়োজন।

পাকিস্তানে ফল উৎপাদনে একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়: জলবায়ু চাষাবাদের জন্য অনুকূল হলেও গড় উৎপাদন কম এবং সাধারণভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এজন্য প্রয়োজন ব্যাপকভিত্তিক গবেষণা।

আর এ জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। আর এভাবেই ফলকে একটি মূল্যবান রফতানি সামগ্রী ও পাকিস্তানিদের অতিরিক্ত খাবারে পরিণত করা যাবে।

 

ইকরাম সেহগাল, প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা বিশ্লেষক। 

ড. বেটিনা রোবোটকা সাবেক অধ্যাপক, সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ, হামবোল্ডট ইউনিভার্সিটি, বার্লিন।