আমরা লাইভে English বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২১

পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করতে বেপরোয়া মোদি ও দোভাল

SAM SPECIAL-ENG-02-07-2020

পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে লেখার শিরোনামটি গ্রহণ করার জন্য ইয়ান ফ্লেমিংয়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। করাচিতে আবার সন্ত্রাস ফিরে এসেছে এবং এটা হলো: ফ্রম ইন্ডিয়া উইথ ‘লাভ’।

হামলাটি চালিয়েছিল নিষিদ্ধ বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সন্ত্রাসীদের পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জে (পিএসএক্স) এই হামলায় চারজনের প্রাণ যায়। এদের একজন পুলিশ অফিসার, অন্য তিনজন প্রহরী। 

পুলিশ ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দৃঢ় জবাবে স্টক এক্সচেঞ্জে প্রবেশ করে তাণ্ডব চালানোর পরিকল্পনাটি ভণ্ডুল হয়ে যায়। মাত্র ৮ মিনিটের মধ্যে হামলাকারীদের কেবল পিএসএক্সে প্রবেশ রুখেই দেয়নি, সেইসাথে তাদের হত্যাও করা হয়। তাদের হাতে থাকা অস্ত্রের মধ্যে ছিল একে-৪৭ রাইফেল ও গ্রেনেড। এছাড়া তাদের কাছ থেকে পানি ও খাবারও উদ্ধার করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভবনে প্রবেশ করে লোকজনকে হত্যা করার পাশাপাশি কয়েকজনকে পণবন্দীও করা।

আরও পড়ুনঃ পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জে হামলা

সন্ত্রাসী হামলার ব্যাপারে করাচি নিরাপত্তা বাহিনীর অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের সন্ত্রাসপ্রতিরোধ সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের কেবল ফিঙ্গারপ্রিন্টই চিহ্নিত করা হয়নি, সেইসাথে তাদের উৎসও নির্ধারিত হয়, কোথা থেকে হামলা শুরুর কাজ হলো, তাও জানা যায়। এটা বড় ধরনের অগ্রগতি।

তথাকথিত বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি, সুপরিচিত ও সন্ত্রাসী সংগঠন, ভারতের র-এর গড়ে তোলা ও অর্থপুষ্ট। ইরান থেকে এসে বালুচিস্তানে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানোর সময় পাকিস্তানে গ্রেফতার হন কুলভূষণ যাদব। বালুচিস্তানে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানোর দীর্ঘ ইতিহাস আছে ভারতের র-এর।

আজ পর্যন্ত বালুচদের কেউ কেউ মনে করে, ইসলামাবাদের সরকারের হাতে তারা অবহেলিত হয়েছে। এই অভিযোগ একটি মাত্রা পর্যন্ত সত্য, কিন্তু বালুচদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মনে করে, তারা অনেক বেশি নিগৃত হয়েছে তাদের গোত্রপতিদের হাতে। গোত্রপতিরা প্রবাদপ্রতীম সম্পদ গড়েছেন, করাচি ও বিদেশে বিলাসবহুল বাড়িতে জীবন যাপন করেন, তাদের সন্তানেরা দামি দামি গাড়ি চালান, সেরা স্কুলগুলোতে পড়েন। স্কুল ও রাস্তা নির্মাণের জন্য ইসলামাবাদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ তারা যথেচ্ছা ব্যয় করেছে।

Lifts-SAM Special-Bangla-2 July 2020-1

রাস্তা বা স্কুল নির্মাণের প্রতি তাদের আগ্রহ নেই। রাস্তা হলে স্কুল শিশুরা তারা তাদের কষ্টদায়ক গ্রাম ত্যাগ করে আরো ভালো জীবনের আশায় অন্যত্র চলে যাবে। বালুচ গোত্রপতিরা কিভাবে এমন বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন, ওই প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ করে দেবে।

অনেক দশক ধরে গোত্রপতি এলিটরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের লোকজনের ওপর প্রভাব বিস্তার ও তাদের পরনির্ভরশীল করে রেখেছে। চীন পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) এখন রাস্তা, রেলওয়ে লাইন, শিল্প পার্ক ও গোয়াদর পোতাশ্রয়ের মাধ্যমে উন্মুক্ত করে দেয়ার হুমকি সৃষ্টি করেছে। পোতাশ্রয় সবসময়ই নতুন মানুষ, পণ্য ও ধারণা প্রবেশের সুযোগ করে দেয়, যা স্থানীয় সমাজকে বদলে দেয়।

অধিকন্তু, স্থানীয় প্রশিক্ষিত বালুচ কর্মীবাহিনীর অভাবে অন্যান্য প্রদেশ ও চীন থেকে শ্রমিকদের ঢল নেমেছে। এতে করেও প্রতিষ্ঠিত শক্তির সম্পর্কের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করেছে।

পিএসএক্সকে টার্গেট করার কারণ, এটি হলো চীনা অর্থনৈতিক ও আর্থিক শক্তির প্রতীক। এখানকার প্রধান বিনিয়োগকারীরা হলেন চীনা। এটি বালুচিস্তানের পুরনো শক্তি কাঠামোর প্রতি হুমকি সৃষ্টি করেছে। ২০১৬ সালে তারা ৪০ ভাগ শেয়ার কিনে এর ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। শেয়ারের মালিকদের মধ্যে রয়েছে সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ, শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জ ও চীনা ফিন্যান্সিয়াল ফিচারেস এক্সচেঞ্জ। চীনা বিনিয়োগকারীদের সাথে সম্পর্কিত স্থানীয় একটি কোম্পানি আরো ৫ ভাগ শেয়ারের মালিক।

আরও পড়ুনঃ করাচি স্টক এক্সচেঞ্চে হামলায় সন্দেহাতীতভাবে ভারত জড়িত: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী

বালুচদের নিজেদের কাছেই প্রশ্ন করা উচিত যে কোন ধরনের মুক্তি তারা চায়। গোত্রপতিদের থেকে মুক্তি, আরো ভালো জীবনের বিকল্প ও উন্নয়ন, ভালো শিক্ষা ও চাকরি কি অগ্রাধিকার পেতে পারে না? বিএলএকে সমর্থন করা মানে তাদেরকে যারা শোষণ করছে, তাদের আরো শোষণ করার সুযোগ দেয়া। অধিকন্তু, এর মাধ্যমে তারা ভারতকে আবার পাকিস্তান ভাঙ্গার সুযোগ করে দেয়া, যা তারা ১৯৭১ সালে করেছিল।

বর্তমান মহামারীর কারণে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে আগে থেকে শুরু হওয়া পরিবর্তন আরো বেগবান হয়েছে। পাকিস্তানের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। আর ভারতের ক্ষেত্রে তা আরো বেশি সত্য। ভারতের পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ অর্থ বছরের চতুর্থ কোয়ার্টারে তাদের প্রবৃদ্ধি হবে ৩.১ ভাগ। ভারত সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা বলেছেন, এমনটা হচ্ছে প্রধানত করোনাভাইরাসের কারণে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগ্রাসী হিন্দু জাতীয়তাবাদী নীতি এখন দেশটিতে হালে পানি পাচ্ছে না। আবার গত বছরের ৫ আগস্টের জম্মু ও কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল চীনারা ভালোভাবে নেয়নি। তাদের মতে, লাদাখ হলো তিব্বতের অংশ। 

ভারতের কোয়াডে যোগদানের অর্থ হচ্ছে, চীনকে আরেক দিক দিয়ে প্রতিরোধ করা। এসব ঘটনা ভারতের মধ্যেই সমস্যা সৃষ্টি করছে।

Lifts-SAM Special-Bangla-2 July 2020-2

আফগানিস্তানেও জমি হারাচ্ছে ভারত। এ কারণেও তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ জোরদার করে থাকতে পারে। 

মোদি ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল বেপরোয়া। নিজেদের জাহির করার জন্য তাদের হাতে কি পাকিস্তানের ওপর সন্ত্রাসবাদ চালানো বা ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে হামলা চালানোই সেরা পন্থা? ভারতের জনসাধারণ এবং মিডিয়া চীনা রক্তের দাবি করতে থাকায় এটা হতে পারে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরিয়ে নেয়ার কৌশল।

এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে অবশ্যই কিছু করতে হবে। সিন্ধুতে র‌্যাঞ্জার্সের ওপর হামলা ও করাচি স্টক এক্সচেঞ্জে হামলা কেবল শুরু মাত্র। এছাড়া এমকিউএমও আছে। বিএলএ এখন এমকিউএম জঙ্গি ও জয় সিন্ধের কর্মীদের সাথে জোট গড়ছে র-এর সহায়তায়।

সরাসরি সন্ত্রাসী হামলা হিমবাহের কেবল একটি চূড়া। দেশের অখণ্ডতা ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য হাইব্রিড যুদ্ধ চলছে সব খাতে। ভুয়া খবর ছড়ানো হবে, ফলস ফ্ল্যাগ অভিযান চলবে। আর থাকবে সাইবার যুদ্ধ। পাকিস্তান নিরাপত্তা বাহিনীকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।

 

লেখক: প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক