আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

কাশ্মীরীদের জীবনও গুরুত্বপূর্ণ

Kashmir-2

বর্ণবিরোধী আন্দোলন ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ (বিএলএম) একটা বৈশ্বিক উন্মাদনা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে যেখান থেকে বর্ণবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়, সেখান থেকে আরেকটি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে – ‘অল লাইভস ম্যাটার’। ব্রিটিশ পাকিস্তানীরা এই শ্লোগানের বক্তব্যকে অনুধাবণ করে ‘কাশ্মীরী লাইভস অলসো ম্যাটার’ আন্দোলনের মাধ্যমে ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে (আইএইচকে) কাশ্মীরীদের পরিস্থিতির দিকে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। চলচ্চিত্র তারকা মেহবিশ হায়াতের দিকে ইঙ্গিত রয়েছে এই নামের, যিনি অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতীয় বর্বরতার নিন্দায় সবসময় সোচ্চার রয়েছেন। 

নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রীত্বকালে শুধু কাশ্মীরীদের জন্য নয়, বরং ভারতীয়দের জন্যও অনেক কিছু খারাপ মোড় নিয়েছে। ব্রিটিশ পাকিস্তানী ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি নেতা তারাব রাজা কাশ্মীরের পরিস্থিতির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, পশ্চিমা বিশ্ব সম্প্রতি এই বাস্তবতাটা বুঝতে পেরেছে যে, কালোদের জীবনও গুরুত্বপূর্ণ (ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার) কিন্তু তাদেরকে ‘কাশ্মীরীদের জীবনও গুরুত্বপূর্ণ’ প্রচারণার দিকে মনোযোগ দিতে হবে যেটা বহু দিন ধরে চলে আসছে। 

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে এবং ভারতীয় পার্লামেন্টের অনুমোদনক্রমে পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে বিতর্কিত কাশ্মীর অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করেছে ভারত, এবং এর মাধ্যমে জাতিসংঘের প্রস্তাবনা এবং আন্তর্জাতিক আইন তারা লঙ্ঘন করেছে। 

আরও পড়ুনঃ আমাদের মানসিকতাকে উপনিবেশমুক্ত করা জরুরি

মোদি এই অঞ্চলকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ এবং দুটাকেই তথাকথিত ‘কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন, যেটা নয়াদিল্লীর সরাসরি শাসনাধীনে থাকবে। 

একটা কলমের খোঁচাতে তিনি জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচিত আইনসভা এবং এর সরকারকে বাতিল করে দিয়েছেন। কাশ্মীরের রাজনীতিবিদদের গৃহবন্দী রাখা হয়েছে। ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের’ এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বোঝা গেছে যে, কি ধরনের গণতন্ত্র সেখানে বিরাজ করছে। 

সেই সাথে, ‘ঘর ওয়াপসি’ আন্দোলনের নামে বেশ কিছুকাল ধরেই মুসলিম-বিরোধী প্রচারণা চলছে, যেখানে মুসলিমদেরকে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। এর বাইরে ভারতীয় মুসলিমদের টার্গেট করে আরও যে সব আইন করা হয়েছে, সেগুলো কাশ্মীরী মুসলিম এবং অন্যান্য ভারতীয় মুসলিমদের নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। 

Lifts-1-SAM Special-Bangla-21 July 2020-1

কাশ্মীরে বহু দশক ধরে সহিংসতা চলে আসছে, যেখানে অর্ধ মিলিয়ন ভারতীয় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে ‘আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি’ রক্ষার জন্য। কাশ্মীর এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় খোলা কারাগারে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি, একটি ছবিতে দেখা গেছে, ভারত-শাসিত কাশ্মীরের সোপোরে দাদার লাশের উপর একটি তিন বছরের শিশু বসে আছে, যে ছবিটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে। নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ৬৫ বছরের ওই বৃদ্ধকে তার গাড়ি থেকে টেনে হিচড়ে বের করে তাকে হত্যা করে। গাড়িতে তার সাথে শুধু তার নাতিই ছিল।

এরই মধ্যে, যে কেউ দেখতে পাবেন যে, তরুণ কাশ্মীরীরা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে এবং একটা নতুন গৃহযুদ্ধের যেন প্রস্তুতি চলছে, যেমনটা জানিয়েছে নাগরিক অধিকার গ্রুপ ‘কোয়ালিশান অব সিভিল সোসাইটি’। গত ছয় মাসে ভারত-শাসিত কাশ্মীরে ৩২ বেসামরিক নাগরিকসহ অন্তত ২২৯ জন নিহত হয়েছে। 

জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক মর্যাদা পরিবর্তনের সাথে সাথে ভারতীয় সংবিধানের ৩৫(এ) অনুচ্ছেদের অধীনে কাশ্মীরীদের যে অধিকার দেয়া হয়েছিল– যেখানে বলা হয়েছে, কোন বহিরাগত হিমালয় অঞ্চলে বসতি গড়তে পারবে না– সেই অনুচ্ছেদটিও বাতিল করা হয়েছে এবং এখন একটা আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে বাইরে থেকে বহিরাগতদের এনে ইচ্ছাকৃতভাবে কাশ্মীরের জাতিগত বৈশিষ্ট্য বদলে দেয়া হবে। ১৮ মে থেকে ২৫,০০০ এর মতো মানুষকে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের স্থানীয় অধিবাসীর সনদ দেয়া হয়েছে। মুসলিম-সংখ্যাগুরু হিমালয় অঞ্চলের জনমিতিক মানচিত্র বদলে দেয়ার যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, সেটাকেই সমর্থন করে এই পদক্ষেপ। এই সার্টিফিকেট যে কোন ব্যক্তিকে এই অঞ্চলের নাগরিকত্বের অধিকার দেবে, তারা এখানে আবাস গড়তে এবং সরকারী চাকরি করতে পারবে, যেটা গত বছর পর্যন্ত একমাত্র কাশ্মীরীদের জন্য বরাদ্দ ছিল। দল-মত নির্বিশেষে সকল কাশ্মীরী রাজনীতিবিদরা বলেছেন, এ অঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ চারিত্র বদলে দেয়ার জন্যই বিশেষ নাগরিকত্বের অধিকার বাতিল করা হয়েছে। 

Lifts-2-SAM Special-Bangla-21 July 2020-2

নিজেদের ইচ্ছেমতো কাশ্মীর সমস্যার ‘সমাধানে’ ভারত পদক্ষেপ নেয়ার কারণে কাশ্মীরী এবং ভারতীয় মুসলিমরা এখন একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছে। এর মধ্যে সম্প্রতি মোদি সরকারের আরেকটি উদ্দেশ্য প্রকাশিত হয়েছে। 

জম্মু ও কাশ্মীর থেকে লাদাখকে আলাদা করে সেটাকে এখন কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল ঘোষণা করেছে দিল্লী। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে লাদাখের ভিন্ন জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যটি সামনে চলে এসেছে এবং বোঝা গেছে লাদাখ চীনা তিব্বতের অংশ এবং সে কারণে, এখানকার জনগোষ্ঠিও তিব্বতী বা তাদের কাছাকাছি। তিব্বতের আরেকটি অংশ আকসাই চিন যেটা চীনা প্রশাসনের অধীনে রয়েছে, সে অবস্থায় লাদাখ আর ভারত-চীনের অমীমাংসিত সীমান্ত ইস্যু নতুন রূপ নিয়েছে। 

এর প্রথম ফলাফল হলো ভারত আবারও তাদের ‘ফরোয়ার্ড কৌশলের’ বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এই নীতির অংশ হলো বিতর্কিত সীমান্ত এলাকাতে সামরিক পোস্টগুলোকে যত দূরে সম্ভব ঠেলে নিয়ে যাওয়া। পঞ্চাশের দশকে গৃহিত তাদের এই নীতির কারণেই ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধ হয়েছিল। 

আরও পড়ুনঃ বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই: নাৎসি ও উগ্র হিন্দুদের স্বস্তিকা প্রতীকের একই উৎস

চীন-বিরোধী ‘কোয়াড অ্যালায়েন্সে’ যোগ দেয়ার মাধ্যমে মোদি শুধু বিতর্কিত কাশ্মীর অঞ্চলকেই দেশের অন্তর্ভুক্ত করতে চান না, বরং চীনের সাথে সীমান্ত এলাকার লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল এলাকাতেও যত বেশি সম্ভব জায়গা ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে চান। এই অঞ্চলে ভারতের এই অবস্থান গ্রহণ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য কোয়াড দেশগুলোর কাছ থেকে সহায়তার আশা করার কারণেই ভারত তাদের নিজের জনগণের বিরুদ্ধে এবং এই অঞ্চলে একটা আগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে। বিগত কয়েক দশকে ভারত সিকিমকে দেশের অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং ভুটান এবং নেপালকেও নিজেদের বলে দাবি করেছে। 

ভারতের এই আগ্রাসী নীতি এরইমধ্যে এ অঞ্চলে শান্তিকে বিপদগ্রস্ত করে তুলেছে। চীনের ভূখণ্ডে যখন অনুপ্রবেশ করা হবে, তখন তারা অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে দেখবে না। গত মাসে ভারত আর চীনা সেনাদের মধ্যে যে সীমান্ত সঙ্ঘাত হয়েছে, সেটা হয়তো প্রথম একটা পদক্ষেপ মাত্র। তখন থেকেই সীমান্তে অত্যাধুনিক অস্ত্রসামগ্রী মোতায়েন করেছে চীন এবং যে কোন ভারতীয় হামলা প্রতিহত করার জন্য তারা প্রস্তুত রয়েছে। 

SAM Special -2-2020-07-21 071509

Lifts-3-SAM Special-Bangla-21 July 2020-3

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, হিমালয় অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালানোর মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ ভারতীয় সেনাবাহিনীর নেই। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য কোয়াড সদস্য এখানে শুধুমাত্র মুখে মুখেই সমর্থন দেবে। কিন্তু ভারতের মধ্যে একটা বিপজ্জনক অতি-আত্মবিশ্বাস বিরাজ করছে বলে মনে হচ্ছে। এই সম্ভাবনা রয়েছে যে, যে কোন নতুন সামরিক অভিযানের চেষ্টা করা হলে তার পরিণতি ১৯৬২ সালের মতোই হবে। সে সময় ভারত চরমভাবে পর্যুদস্ত হয়েছিল এবং চীন যদি তখন নিজ থেকে সরে না দাঁড়াতো, তাহলে লাদাখ হয়তো তিব্বতের সাথে পুণরায় যুক্ত হতো। 

ভারতে এবং ইন্দো-চীন সীমান্তে একটা বিপজ্জনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং বিশ্ব এ ব্যাপারে নীরব। ইয়েমেন, সিরিয়া, লিবিয়ায় যুদ্ধের আগুন জ্বলছে আর অমীমাংসিত রক্তাক্ত সঙ্ঘাতের মধ্যে টিকে আছে ফিলিস্তিন। এ অবস্থায় আমাদের কি আরেকটি জায়গার দরকার আছে যেখানে দিনের পর দিন মানুষ মরবে আর তাদের জীবন সার্বক্ষণিক বিপদের মধ্যে থাকবে?

Lifts-4-SAM Special-Bangla-21 July 2020-4

চীন-বিরোধী এবং মুসলিম-বিরোধী তৎপরতা থেকে ভারতকে অবশ্যই নিরস্ত করতে হবে। জম্মু ও কাশ্মীর একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিতর্কিত এলাকা এবং একতরফাভাবে ভারত এটার মর্যাদা বদলাতে পারে না। ভারতের এই ধরনের অবৈধ পদক্ষেপকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। 

আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো যখন লাদাখ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে, তখন তারা এটার সাথে কাশ্মীর সঙ্ঘাতের গভীর সংযোগের বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে, যে সঙ্ঘাতটি দক্ষিণ এশিয়ার শরীরে একটা ক্ষতের মতো হয়ে আছে। শুধু প্রতিবেশী দেশগুলোরই এটা ক্ষতি করছে না, বরং প্রথমত এবং প্রধানত এটা ক্ষতি করছে কাশ্মীরীদের। 

‘কাশ্মীরীদের জীবনও গুরুত্বপূর্ণ’ –এই বার্তাটি বিশ্বের হৃদয়ঙ্গম করা উচিত। 

 

(লেখক একজন প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক)