আমরা লাইভে English বুধবার, আগস্ট ০৪, ২০২১

কর সংগ্রহ কম হলে ‘নয়া পাকিস্তানের’ স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে

COLUMN-ENG-08-10-2020

পাকিস্তানের একটি প্রধান সমস্যা হলো যে পরিমান রাজস্ব আদায় হয়, তার সাথে কর দেয়ার উপযোগী প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা, যারা কর দেয় এবং যারা দেয় না, তাদের হিসাব মেলে না। 

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও দুর্বল, সমন্বয়হীন এবং প্রায়ই তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, এবং প্রশাসনিক স্টাফরা আধুনিক ধারণা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য যোগ্য নন। 

একটি আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কিভাবে কাজ করা উচিত এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র কিভাবে কাজ করে, সেটা জানাটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্র ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে নিজেদের সম্পর্কটা বোঝার জন্য, তাদের কল্যাণের জন্য দায়িত্ববোধ তৈরি করা এবং সেখানে অবদান রাখার সক্ষমতা অর্জনের জন্য সেটা জানাটা একটা পূর্ব শর্ত। আমাদের স্কুল ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, সেটা পাকিস্তানীদেরকে ভালো নাগরিক হতে সাহায্য করে না। 

প্রতিটি নাগরিকের রাষ্ট্রের প্রতি প্রাথমিক দায়িত্বের একটি হলো কাজ বা ব্যবসার মাধ্যমে রাষ্ট্রের জিডিপিতে অংশগ্রহণ করা; আয় অনুযায়ী কর দেয়া; অবস্তুগত অবদানের মাধ্যমে যেমন আইডিয়া দিয়ে, পরিবেশের উন্নতি সাহায্যের মাধ্যমে অবদান রাখা। 

আধুনিক রাষ্ট্রে কর দেয়াটা যে একটি মৌলিক বাধ্যবাধকতা, সেটা পাকিস্তানে যথার্থভাবে ব্যাখ্যা করা এবং বাস্তবায়ন করা হয়নি। বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ কর দিতে পছন্দ করে না কারণ এর মানে হলো কষ্টার্জিত আয়ের একটা অংশ দিয়ে দেয়া। পাকিস্তানসহ সব দেশেই বৈধ ও অবৈধভাবে করের পরিমাণ কমিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এটাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, সাধারণ কল্যাণের জন্য কর দেয়াটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। 

ধারাবাহিকভাবে বিশ্ব ব্যাংকের অনেকগুলো টিম পাকিস্তানের অর্থনীতিকে সঠিক লাইনে রাখার চেষ্টা করেছে এবং তারা অভিযোগ করেছে যে, পাকিস্তান যথেষ্ট পরিমাণ কর আদায় করতে পারছে না। এর কারণ এটা নয় যে, অর্থনীতির অবস্থা খুব খারাপ বা জিডিপি অনেক কম, বরং এর কারণ হলো যারা মূল করদাতা, তারা তাদের নির্ধারিত কর দিচ্ছে না এবং রাষ্ট্র এতটা সঙ্ঘবদ্ধ নয় যে, কর ফাঁকিবাজদের ধরবে। কর ফাঁকির অধিকাংশ কারণ হলো কর সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর খোলামেলা ও চরম দুর্নীতি। এটা সম্ভব হয়েছে কর দেয়ার প্রক্রিয়াকে জটিল করে রাখার কারণে, যেটা সাধারণের বোধগম্য নয়। কর দফতর অগোছালো, এর স্টাফরা প্রশিক্ষিত না, বা ২০০ মিলিয়ন জনগোষ্ঠির কর ব্যবস্থাপনার জন্য সুসজ্জিতও নয়। যেটা প্রয়োজন, সেটা হলো কর দাতাদের কম্পিউটারাইজড রেজিস্টার এবং নাগরিকের কর পরিশোধের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং কর ফাঁকিদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। 

প্রত্যেকেই স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, কর্মসংস্থান, সড়ক নির্মাণ, সুরক্ষা ও আরও অনেক বিষয়ে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু একটা রাষ্ট্র কিভাবে এত সব কিছুতে অর্থায়ন করবে? দুর্বল কর সংগ্রহের কারণে যে ঘাটতি রয়ে গেছে, বহু বছর ধরে এই ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ নিয়ে। পাকিস্তানের যে বিপুল ঋণ জমেছে, তার কারণ এটাই। ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে। 

কর সংগ্রহের বিষয়টি একটি কার্যকর, আধুনিক রাষ্ট্রের চালিকা শক্তি, যেটা ছাড়া রাষ্ট্রের কোন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কর হলো একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে ব্যক্তি সরকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকে, এটা আমাদেরকে নাগরিকদের অর্থ নির্ধারণে সাহায্য করে। করের বিষয়টি রাষ্ট্র আর নাগরিকদের মধ্যে, সার্বভৌম আর তার অধীনস্থদের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উন্নয়নের জন্য সব সরকারেরই টেকসই অর্থায়নের উৎস দরকার। সমৃদ্ধশালী, কার্যকর ও শৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজের অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও অন্যান্য সেবাদানকারী কর্মসূচি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজস্ব থেকে শুধু জনগণের পণ্য আর সেবাই দেয়া হয় না, সেটা একই সাথে রাষ্ট্র আর নাগরিকের মধ্যে চুক্তির প্রধান অংশ, এবং এটা নাগরিকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অর্থ নির্ধারণ করে। কর দেয়ার প্রক্রিয়াটা নাগরিক পরিচয় তৈরি করে; একটা বর্ধিত রাজনৈতিক ও সামাজিক কমিউনিটির অংশ হিসেবে আর্থিক দায়বদ্ধতা এর মাধ্যমে নিশ্চিত হয়। এটা নির্ধারণ করে কে এই কমিউনিটির সদস্য, বা এই ‘আমাদের’ বৃত্তটার পরিসর কত বড়। 

একটা জাতি গঠনের কেন্দ্রীয় উপাদান হলো এর সব সদস্যকে সমান পর্যায়ের হতে হবে। শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, বরং ধর্মীয়, জাতিগত ও অন্যান্য পার্থক্যের উর্ধ্বে উঠে জাতির সদস্য হিসেবে সবাইকে সমান হতে হবে। সবাই এখানে তাদের সামর্থ অনুযায়ী অভিন্ন কল্যাণের জন্য অবদান রাখে। আর জাতির সব সদস্যের মধ্যে এখানে সংহতি রয়েছে, যার মধ্যে বস্তুগত, আর্থিক এবং প্রয়োজনের সময়ে মানসিক সহায়তা দেয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত। 

পাকিস্তানী জাতি ধর্মীয়, জাতিগত ও অন্যান্য আত্মকেন্দ্রিক কারণে দুর্বল হয়ে গেছে। জাতির ধারণা সম্পর্ক ধারণার অভাব এবং নাগরিক আর রাষ্ট্রের মধ্যে যে সংহতি দরকার, সেটার অভাবের কারণেই এটা হয়েছে। অবস্থাসম্পন্ন নাগরিকদের এটা বুঝতে হবে যে, সম্পদ একটা সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দুর্বল অবস্থাসম্পন্ন নাগরিকদের প্রতি ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করে। এর উদ্দেশ্য হলো অভিন্ন কল্যাণে কাজ করা। 

ঘটনাক্রমে ইসলামের অন্যতম মূল বক্তব্যও এটাই। এমনকি গরিব নাগরিকদেরকেও সচেতন হতে হবে যে, রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যান্য সদস্যদের প্রতি এবং তাদের দায়দায়িত্ব রয়েছে এবং প্রত্যেককে এখানে কিছু অবদান রাখতে হবে। এটা হলো শিক্ষার বাধ্যবাধকতা। একটি মুসলিম দেশে ইসলামের কারণে এই ধারণাটা আরও ভালোভাবে থাকার কথা ছিল। 

পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের বর্তমান যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সেখানে শুরুতে একটা শ্লোগান ছিল: প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কোন কর নেই। এটি একটি রাজনৈতিক শ্লোগান যেটার উৎপত্তি ১৭০০ শতকে। আমেরিকান ঔপনিবেশিকদের ‘তেরোটি উপনিবেশে’ যে ২৭টি অভিযোগ ছিল, তার মধ্যে এটি ছিল অন্যতম, এবং আমেরিকান রেভল্যুশানের কারণ ছিল এটা। সেখানকার অনেকেই বিশ্বাস করতেন যে, বহু দূরের ব্রিটিশ পার্লামেন্টে যেহেতু তাদের কোন প্রতিনিধিত্ব নেই, তাই সেই পার্লামেন্টে পাস করা যে কোন আইন (সুগার অ্যাক্ট ও স্ট্যাম্প অ্যাক্ট) ১৬৮৯ সালের বিল অব রাইটস অনুসারে অবৈধ বিবেচিত হবে। এই শ্লোগানটি আজ মানুষ প্রায় ভুলে গেছে। 

প্রতিনিধিত্বের অর্থ হলো পার্লামেন্টে বা কোন নির্বাচিত ফোরামে আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব থাকা। এ ধরনের পদের জন্য যারা চেষ্টা করছেন, তাদেরকে তাদের নাগরিক দায়বদ্ধতা পূরণের ব্যাপারে অতিরিক্ত সতর্ক হতে হবে। এবং যে কাউকে কোন পদের জন্য নির্বাচিত হওয়ার আগে তাকে যাচাইয়ের জন্য একটা ত্রুটিমুক্ত পদ্ধতি থাকতে হবে। সততার সাথে সম্পদের হিসাব হতে হবে এবং কোন গোপন একাউন্ট বা সম্পদ থাকা চলবে না। এবং স্ত্রী এবং প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের আর্থিক সম্পদের বিষয়টি প্রকাশিত হতে হবে। এই সবগুলো ক্ষেত্রেই পাকিস্তানকে আরও বহু দূর যেতে হবে। ‘নয়া পাকিস্তান’ অর্জনের কোন শর্টকাট পথ নেই। 

 

লেখক একজন প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক