আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে মিয়ানমারের প্রতিরোধ যোদ্ধারা

a93fcadfee98b3d5b0eed3d43fc5a3fe-60c230eacb460

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে কয়েক হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে প্রবেশ করছে। এর ফলে ভারতীয় কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, অঞ্চলটি মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী অ্যাক্টিভিস্টদের সক্রিয়তার মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে এবং অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে।

বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মিজোরাম, মনিপুর ও নাগাল্যান্ডে বর্তমানে মিয়ানমারের প্রায় ১৬ হাজার মানুষ অবস্থান করছে। নাগরিক সমাজ ও সরকারি কর্মকর্তাদের ধারণা, আগামী কয়েক মাসে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সবচেয়ে বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন মিজোরামে। এখানে গণতন্ত্রপন্থী যোদ্ধাদের ওপর কড়া নজর রাখছে কর্তৃপক্ষ। রাজ্য সরকারের এক উপদেষ্টা বলেন, আমরা খুব নিবিড়ভাবে নজর রাখছি।

তিনি জানান, বেশ কিছু দিন আগে স্থানীয় ভারতীয়দের সহযোগিতা মিয়ানমারের কয়েকজন যোদ্ধা সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন। কিন্তু পরে তারা ফিরে গেছেন।

ওই উপদেষ্টা বলেন, আমরা মিজোরামে তাদের প্রশিক্ষণ কখনও অনুমোদন দেবো না। আপনি মিয়ানমারে সমস্যা তৈরি করেন তাহলে শরণার্থীরা বিপাকে পড়বে।

রাজ্যের এক পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রতিরোধ সংগ্রামের এক সদস্য রয়টার্সকে জানান, মে মাসের শুরুতে মিয়ানমারের অন্তত ৫০ জন মানুষ মিজোরামে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে তুলেছিল। চাম্পাই জেলায় স্থাপিত ক্যাম্পটিতে অস্ত্রের ব্যবহার ছিল না। ভারতীয় আধা সামরিক বাহিনীর তল্লাশির পর ক্যাম্পটি পরিত্যক্ত হয়। ক্যাম্পের সবাই মিয়ানমারে ফিরে যায়।

গত ১ ফেব্রুয়ারি সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন অং সান সু চি। তারপর থেকেই আটক আছেন তিনি। অভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশটিতে নাগরিক অসহযোগ আন্দোলন ও বিক্ষোভ চলছে। এসব আন্দোলন দমন করতে গিয়ে প্রায় আটশ’ মানুষ হত্যা করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। বিভিন্ন রাজ্যের প্রতিবাদী মানুষেরা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন জান্তার বিরুদ্ধে। কয়েকটি রাজ্যের জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করেছে।

সেনাবাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় মিলিশিয়াদের মধ্যে সবচেয়ে সংঘর্ষগুলোর বেশ কয়েকটি হয়েছে ভারতের সীমান্তবর্তী চিন রাজ্যে।

অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া অং সান সু চির দল এনএলডির এক আইনপ্রণেতা জানান, চিন রাজ্যের কয়েকজন প্রতিরোধ যোদ্ধা ভারত ও আরাকান আর্মির কাছ থেকে অস্ত্র কিনেছেন। এতে অঞ্চলটিতে অস্ত্র ব্যবসায় গতি পাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

মিয়ানমারের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের ক্যাম্প সম্পর্কে অবগত মিজোরামের এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, স্বাভাবিকভাবে মানুষ জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে চায়। আমার মতে তারা ভারত থেকে কিছু অস্ত্র কেনার চেষ্টা করতে পারে।

ভারতের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে দিল্লির শাসনবিরোধী গোষ্ঠীও দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় আছে। এই গোষ্ঠীগুলো সীমান্তের উভয় পারে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে মাদক বিক্রি করে মুনাফা করে এসব গোষ্ঠী। 

নয়া দিল্লিতে ভারত সরকারের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমারের বিদ্রোহীরা যদি সীমান্ত পার হয় তাহলে বিষয়টি সত্যিকার উদ্বেগের। কারণ, এতে নাগা ও মনিপুরের বিদ্রোহীদের অক্সিজেন জোগাবে।

তিনি উল্লেখ করেন, মিয়ানমার-ভারত সীমান্তে প্রায় দুই ডজন সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় আছে।

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের মন্তব্য জানতে এক মুখপাত্রকে রয়টার্সের পক্ষ থেকে ফোন দেওয়া হলে তিনি সাড়া দেননি।

বিষয়টি সম্পর্কে ভারতের পররাষ্ট্র মন্তব্য জানতে চাইলে রয়টার্সকে তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইমেইলের কোনও জবাব দেয়নি।

লন্ডনের এসওএএস ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র লেকচারার অভিনাশ পালিওয়াল মনে করেন, মিয়ানমারের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সীমান্ত অতিক্রম ও সীমান্তে সংঘর্ষ তিন দশকের মধ্যে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে সবচেয়ে ভয়াবহ নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এতে মিয়ানমারের অভ্যুত্থান নেতাদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। মিয়ানমারে ভারতের ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের বন্দর ও মহাসড়ক প্রকল্প ঝুঁকিতে পড়বে।

পালিওয়াল বলেন, পুরো কানেক্টিভিটি এজেন্ডা, চীনকে মোকাবিলায় ভারসাম্য বজায় রাখা, মাদক অপরাধ ও বিদ্রোহী দমন কৌশল জটিলতর হয়ে পড়েছে। উত্তর-পূর্বের অভিবাসন সংকট ভিন্ন, রাজনীতিকরণ বা সামরিক রূপ নিতে পারে ভবিষ্যতে। 

মিজোরাম কর্তৃপক্ষ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে লিখিতভাবে আটটি শরণার্থী শিবির স্থাপনে সহযোগিতা চেয়েছে। প্রতিবেশী মনিপুরে অস্থায়ী শিবিরে প্রায় ১ হাজার শরণার্থী অবস্থান করছে।

মনিপুরভিত্তিক মানবাধিকার কর্মী বাবলু লইটঙ্গবাম ও মিয়ানমারের নাগা স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশনের এক সদস্য জানান, সীমান্ত এলাকাগুলোতে খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে চালের সরবরাহ কমে গেছে।

লইটঙ্গবাম বলেন, সহিংসতা ছাড়াও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অর্থনীতি নিম্নগামী। ফলে আরও মানুষ ভারতে আসবে। মানুষকে বেঁচে থাকার উপায় বের করতে হবে।