আমরা লাইভে English শনিবার, মার্চ ০৬, ২০২১

বেইজিং-নয়াদিল্লী-মস্কো: প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক নতুন পথের চাবিকাঠি

NEWS ANALYSIS-ENG-31-08-2020

ভারতীয় মিডিয়া বলছে, চীন-ভারত অচলাবস্থা কাটাতে ‘চীন-ভারত-রাশিয়া’র প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠকের পরিকল্পনা করছে মস্কো। জুন মাসে গ্রেট প্যাট্রয়টিক যুদ্ধ জয়ের ৭৫তম বার্ষিকী উদযাপনের সময় রাশিয়া জানিয়েছিল যে, চীন-ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠকের চেষ্টা করছে তারা। 

কিন্তু সে সময় চীনের বিরুদ্ধে ভারতের চরম শত্রুতামূলক মনোভাবের কারণে তখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের বৈঠক করা যায়নি। কিন্তু রাশিয়ার ইচ্ছা থেকে বোঝা যায় যে, দুটো সবচেয়ে ঘনবসতির দেশের মধ্যেকার এই সঙ্ঘাত নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন এবং তাদের আশা এই চীন-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যাবে। 

চীন-ভারত সম্পর্কের ব্যাপারে রাশিয়ার উদ্বেগের সাথে চীন-ভারত-রাশিয়া ত্রিপক্ষীয় মেকানিজমের শক্ত যোগসূত্র রয়েছে। শীতল যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারে নামে এবং একটা একমেরুর বিশ্ব ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা চালায়। ওয়াশিংটন আজও মস্কোর কৌশলগত ক্ষেত্র সঙ্কুচিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, এবং এ জন্য তারা পূর্ব ইউরোপিয় দেশ এবং সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোকে ন্যাটোর অধীনে নিয়ে এসেছে। তারা একইসাথে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ফ্রন্টিয়ারকে রাশিয়া সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে গেছে এবং আশা করছে যে, রাশিয়ার ভেঙ্গে যাওয়ার প্রক্রিয়া জারি থাকবে এবং এমন পর্যায়ে তারা চলে যাবে যেটা যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্রদের জন্য হুমকির কোন কারণ হবে না। 

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে জোটবদ্ধ থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং চীনকে কৌশলগতভাবে সীমিত করে ফেলার চেষ্টা করে। ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের পরাশক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও বেড়ে গেছে। শীতল যুদ্ধ পরবর্তী বহুমেরুর বিশ্বে চীন, ভারত আর রাশিয়ার সবাই একটা গুরুত্বপূর্ণ মেরু হয়ে উঠতে চাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা আধিপত্যের তারা বিরোধীতা করে। সে কারণেই চীন-ভারত-রাশিয়া ত্রিপক্ষীয় সংলাপ মেকানিজমের প্রক্রিয়াটা সামনে নিয়ে আসেন রাশিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভজেনি প্রিমাকভ। 

দুই দশক ধরে ‘চীন-ভারত-রাশিয়া’ মেকানিজমটা অনেকটা ঢিলেঢালা মেকানিজম হিসেবে চলে আসলেও তিন দেশের মধ্যেই অধিকাংশ আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক ইস্যুতে অভিন্ন নীতি রয়েছে। 

ত্রিপক্ষীয় এই মেকানিজম ভারতের আন্তর্জাতিক স্ট্যাটাস উন্নত করেছে। বৈশ্বিক শক্তি হওয়ার ক্ষেত্রে এই মেকানিজম ভারতকে বড় শক্তিগুলোর সাথে যুক্ত করবে এবং তাকে চীন ও রাশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নিয়ে যাবে। 

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাইরে ভারতই একমাত্র দেশ যাদের সাথে ত্রিপক্ষীয় সংলাপ মেকানিজম রয়েছে চীন আর রাশিয়ার। এটা ভারতকে বড় শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে। 

এদিকে, রাশিয়া চায় না যে, চীন-ভারত দ্বন্দ্বের কারণে ত্রিপক্ষীয় মেকানিজমের ক্ষতি হোক। জুনে সীমান্তে ভারত ও চীনের মধ্যে সঙ্ঘাতের পর নয়াদিল্লী বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক কতগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে, সরকারে এবং সমাজের মধ্যেও চীন-বিরোধী মানসিকতা চাঙ্গা করেছে ভারত। সামরিকভাবে, সীমান্তে আরও সেনা মোতায়েন করেছে নয়াদিল্লী। অর্থনৈতিকভাবে, ভারত সরকার চীনা কোম্পানি ও পণ্যের বিরুদ্ধে বেশ কতগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে। 

নয়াদিল্লীর বেইজিংয়ের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার এবং সঙ্ঘাতের একটা বার্তা দিয়েছে। ভারত যদি সত্যিই চীন থেকে আলাদা হয় এবং চীনের বিরুদ্ধে বড় ধরণের যুদ্ধে জড়ায়, তাহলে চীন-ভারত সম্পর্কই শুধু দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তায় পড়বে না, বরং নয়াদিল্লী সেখানে পুরোপুরি ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকে যাবে। এতে ত্রিপক্ষীয় মেকানিজম নষ্ট হয়ে যাবে এবং ব্রিকস ও সাংহাই কোঅপারেশান অর্গানাইজেশানের উপর বড় ধরণের প্রভাব পড়বে। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে আছে রাশিয়া। রাশিয়া আর ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক ক্ষোভ বা ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কিছুই নেই। ভারতের অস্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎস হলো রাশিয়া। সোভিয়েত আমল থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত এই ধারা বজায় রয়েছে। ভারত যদি চীনের সাথে সঙ্ঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ফিরে, তাহলে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে অংশীদার হারাবে এবং অস্ত্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ বাজারও হারাবে। 

চীন-বিরোধী পথে ভারত আজ অনেক দূরে এগিয়েছে, সেখান থেকে বের হওয়ার পথ পেতে তাদের সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু, বেইজিং এখন পর্যন্ত পাল্টা কোন পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত রয়েছে। এখানেই বড় শক্তি হিসেবে চীনের যৌক্তিকতা উঠে এসেছে, যেখানে চীন-ভারত সম্পর্কের উন্নতির রাস্তা খোলা রাখা হয়েছে। আর সেখানে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের জন্য রাশিয়ার প্রস্তাবটি চীন-ভারত সম্পর্ক উন্নতির জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করবে।