আমরা লাইভে English বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২০

ভারতের এসএফএফ ও তিব্বত কার্ডে চীন ভয় পাবে না

OPINION-ENG-15-09-2020
দালাই লামা

১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের পেছনে একটা প্রধান কারণ ছিল তিব্বত ইস্যু। স্থানীয় পর্যায়ে সীমান্তে ছোটখাটো সংঘর্ষ হয়েছে আগে। কিন্তু ১৯৫৯ সালে তিব্বতীদের বিদ্রোহ এবং দালাই লামার ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর চীন এটাকে গুরুত্বের সাথে নিতে শুরু করে। সীমান্তে ভারতীয় পোস্ট স্থাপন এবং সীমান্ত টহলের বিষয়কে চীন তিব্বতে তাদের শাসনকে ব্যাহত করার ভারতীয় প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে শুরু করে। দালাই লামার মর্যাদা এবং তিব্বত ইস্যুটি এখনও ভারত-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছায়া হয়ে আছে, যদিও নয়াদিল্লী তিব্বতের উপর চীনের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং দালাই লামার সাথে সরকারীভাবে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। 

তিব্বত প্রবাসী সরকারকে ধর্মশালাকে থেকে কাজ চালানোর অনুমতি দেয়া হয়েছে, কিন্তু ভারত সরকার তাদেরকে স্বীকৃতি দেয়নি। চীনের কাছে তাইওয়ান আর জিনজিয়াংয়ের মতোই তিব্বত একটি প্রধান ইস্যু। 

পরিবর্তনশীল সম্পর্ক

নরেন্দ্র মোদির সরকারের সময়ে তিব্বতের প্রবাসী সরকারের সাথে খোলামেলা আলীঙ্গন জানানোর ঘটনা ঘটেছে। 

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদির শপথ অনুষ্ঠানে তিব্বত প্রবাসী সরকারের ‘প্রধানমন্ত্রী’ লোবসাং সাঙ্গেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু ২০১৭ সালে ঘোষণা দিয়েছেন যে, তার রাজ্যের সাথে তিব্বতের সীমান্ত রয়েছে, চীনের নয়। 

তবে ২০১৮ সালের এপ্রিলে মোদি-শি জিনপিংয়ের উহান সম্মেলনের পর তিব্বত ইস্যুটি পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা জারি করা হয় যাতে সরকারী কর্মকর্তারা তিব্বত সরকারের সাথে মেলামেশা এড়িয়ে চলেন। দালাই লামা যে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সম্মেলন করতে চেয়েছিলেন, সেটিও বাতিল করা হয়। তিব্বতীদেরকে জানানো হয় যে, দালাই লামার ভারতে প্রবেশের ৬০তম বার্ষিকী যাতে স্বল্প পরিসরে উদযাপন করা হয়। 

২০১৯ সালের অক্টোবরে মোদি-শি’র দ্বিতীয় সম্মেলনেও আগের বিষয়গুলোকেই আরও চাঙ্গা করা হয়। মোদি সরকার ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, চীনের সাথে সম্পর্ক বাড়ানোর জন্য তিব্বত কার্ড তারা স্থায়ীভাবে হিমঘরে সরিয়ে রাখবে। 

ভুল কার্ড

সীমান্তে ভারত চীনের সাম্প্রতিক সঙ্ঘাতের সময় তিব্বত ইস্যুটি আবার সামনে আসে এবং পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস আর সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। মিডিয়ায় ফাঁস করা এক রিপোর্টে বলা হয় যে, বিশেষায়িত স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্সকে (এসএফএফ) দক্ষিণ পাংসোং লেকের অভিযানে ব্যবহার করেছে ভারত। এই বাহিনীতে মূলত তিব্বতীদেরকে নিয়োগ দেয়া হয়। তেনজিন নাইমা নামের এক সেনা মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়। তার শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে স্বাধীন তিব্বতের পতাকাও তোলা হয়। বিজেপি নেতা রাম মাধব সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং বিষয়টি নিয়ে তিনি টুইট করেন। পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপের পর টুইটটি তিনি সরিয়ে ফেলেন। 

বেশ কিছু ভাষ্যকার এসএফএফের রিপোর্টটিকে স্বাগত জানান। তারা বলছেন যে, এটা চীনের প্রতি ভারতের একটা বার্তা যে, ভারত এখনও তিব্বত কার্ড হাতে রেখেছে এবং প্রয়োজনে সেটা তারা ব্যবহার করবে। বিভিন্ন উদ্ভট কারণে সেই যুক্তিটা ভারতে গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে, যেটা বেইজিংয়ের সাথে শত্রুতা আর অবিশ্বাসই শুধু বাড়াবে এবং যেটা সত্যিকারের যন্ত্রণা নিয়ে আসবে। প্রতিপক্ষের সাথে যে কোন বোঝাপড়ার সময় কোন ইস্যুতেই তাদেরকে উসকানি দিতে হয় না। কিন্তু এখানে সেটাই করা হয়েছে। এটাও কৌতুহলের বিষয় যে, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সাথে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বৈঠকের আগ দিয়ে এটা প্রচার করা হয়েছে। আর যাই করুক, এটা নিঃসন্দেহে তার বোঝাপড়ার জায়গাটাকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলবে। 

গ্রহণযোগ্যতার সঙ্কট

তিব্বত ইস্যু আর দালাই লামাকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে সেটা উল্টো ফল নিয়ে আসবে। ভারতে আসার পর থেকেই তিনি ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ধর্মীয় নেতা হিসেবে শ্রদ্ধা পেয়েছেন। আমরা সবসময় এটা বজায় রেখেছি যে, ধর্মীয় নেতা হিসেবে তিনি আমাদের কাছে স্বাগতম এবং আমরা তার বা তিব্বতী সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোন স্বীকৃতি দিই না। এই অবস্থানের কারণে ভারত-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিব্বত ইস্যুতে ভারসাম্য রক্ষা করাটা সহজ হয়েছে। দুর্ভার্গজনকভাবে, দীর্ঘদিনের এই অবস্থানকে এখন মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। 

ভারত-চীন যে কোন সীমান্ত সমঝোতার ক্ষেত্রে তিব্বত ইস্যুটি আসবে। ভারতের জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হলো দালাই লামা আর চীন সরকারের মধ্যে একটা বোঝাপড়া। শি জিনপিংয়ের প্রথম কয়েক বছরে সেটা সম্ভবও মনে হয়েছিল। 

তিব্বতের জনগণের সাথে চীন সরকারে বোঝাপড়াটা দালাই লামা থাকলে বরং আরও সহজ হবে। দুই দেশই এই ইস্যুতে নিরবে আলোচনা চালাতে পারে যাতে ভবিষ্যতে এটা আরও জটিল হয়ে না দাঁড়ায়। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে চীনেরও অনেকে সমর্থন করেন। কিন্তু এখন তিব্বত কার্য নাড়াচাড়ার কারণে সেটা চীনকে শুধু উত্যক্তই করবে এবং এটা নিয়ে তারা আর কোন আলোচনায় বসতে চাইবে না। দালাই লামা আর তিব্বতি সম্প্রদায়ের সাথে ভারতে এবং প্রবাসে ভারত সবসময় যে সুনাম পেয়েছে, সেটাও এখানে হুমকির মুখে পড়ে গেছে। ভারত সরকার তাদেরকে নিয়ে যেভাবে ইচ্ছা মতো খেলছে, তাতে তিব্বতী সম্প্রদায়ও অখুশি হয়ে উঠেছে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে।