আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫, ২০২১

পাকিস্তানের সবচেয়ে আতঙ্কের প্রতিকূলতা হলো জলবায়ুর বিপর্যয়

ISSUE-4-ENG-28-09-2020-Pak
করাচির বন্যার দৃশ্য

করাচি হলো ঘর। আমার প্রাণপ্রাচুর্যের কোলাহলপূর্ণ ২০ মিলিয়ন মানুষের শহর, যেটা আরব সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। জাতিগত ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বৈচিত্রপূর্ণ এই মেট্রোপলিস শহরটি পাকিস্তানের বাণিজ্যিক রাজধানী, দেশের রাজ্যের অর্ধেকের বেশি আসে যেই শহর থেকে। 

বহু দশক ধরে করাচি শহর সহিংস জাতিগত লড়াই, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং বিবদমান বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্ঘাত ও সন্ত্রাসবাদের বাধা পাড়ি দিয়ে এসেছে। করাচি অনেক ঝঞ্ঝা পারি দিয়ে এসেছে – রকেট লঞ্চার বহনকারী গ্যাংস্টার; এখানকার পুলিশ বাহিনী, যাদেরকে সাধারণ অপরাধীদের চেয়ে বেশি ভয় করা হয়; এখানকার শাসক আর আমলা – যারা সীমাহীন দুর্নীতিতে ডুবে ছিল। করাচি এখন এই সবকিছুর চেয়েও ভয়াবহ প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে: জলবায়ুর বিপর্যয়। 

আগস্টে করাচিতে গ্রীষ্মের খরতাপ ছিল চরম, তবে সম্ভাবনার। সফদা গাছ আর কাঠবাদামের পাতাগুলো ছিল প্রাণোচ্ছল, সবুজ। শান্ত, দূরের আরব সাগর ছিল কর্দমাক্ত। পাম গাছের ডালগুলো যখন দুলতে শুরু করলো, শহর তখন বুঝে গেছে যে, বাতাস বাড়তে শুরু করেছে এবং এরপরই বৃষ্টি আসবে। প্রতিবছরই মওসুম আসছে – আগের চেয়ে ক্রুদ্ধ আর ভয়াবহতা নিয়ে। অপ্রস্তুত শহরের উপর চাবুক হেনে যাচ্ছে এটা। গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষা মওসুম আরও তীব্র ও অপরিচিত হয়ে উঠছে, আরও বিস্তৃত এলাকা জুড়ে আরও দীর্ঘসময় ধরে ছড়িয়ে পড়ছে। 

২৭ আগস্ট করাচিতে প্রায় নয় ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়। একদিনে বৃষ্টিপাতের এটি সর্বোচ্চ রেকর্ড। আবহাওয়া অফিস বলছে, আগস্টে ১৯ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়েছে। যে শহরে কার্যকর পানি নিষ্কাষণ ব্যবস্থা নেই, জরুরি সিস্টেম নেই এবং নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যসেবা নেই, সেই শহরকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্য এই বৃষ্টি যথেষ্ট। গরিব মানুষদের হাজার হাজার ঘরবাড়ি বসতি পানিতে ডুবে ধ্বংস হয়ে গেছে। মারা গেছে ১০০ জনের বেশি মানুষ। 

ব্যবসায়ীদের একটি সংগঠন হিসেব করে দেখেছে, পানিতে বাজার এবং গুদামঘরগুলো ডুবে প্রায় ২৫ বিলিয়ন রুপি বা ১৫০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। স্থানীয় পত্রিকাগুলো হিসেব দেখিয়েছে যে, করাচি এক সপ্তাহ অচল থাকায়, কিছু এলাকায় আরও দীর্ঘ সময় অচল থাকায় পাকিস্তানের প্রতিদিন জিডিপির ক্ষতি হয়েছে ৪৪৯ মিলিয়ন ডলার। অনানুষ্ঠানিক খাতের অর্থনীতিকে বাদ দিয়েই এই ক্ষতি হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের হিসেবে প্রতি বছর পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে সিন্ধ প্রদেশে (যেটার রাজধানী হলো করাচি) ১৫ শতাংশ জিডিপি নষ্ট হয়। 

বিশ্বে জলবায়ু বিপর্যয়ে আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান। গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেস্ক অনুসারে, ১৯৯৮ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে পাকিস্তানে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় ১০,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এই সময়কালে ১৫২টি আবহাওয়াজনিত বিপর্যয়ে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৪ বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকদের হিসেএব গত এক দশকে পাকিস্তানে জলবায়ু শরণার্থী তৈরি হয়েছে প্রায় ৩০ মিলিয়ন। 

আমার দেশে যে সব জলবায়ু দুর্যোগ আঘাত হানছে, তার তালিকার শেষ নেই। উত্তরে হিন্দুকুশ, হিমালয় আর কারাকোরামে হিমবাহ অস্বাভাবিক হারে গলছে। যদি এই হার আর তাপমাত্রার বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, তাহলে ২১০০ সালের মধ্যে এই পর্বতগুলো তাদের এক থেকে দুই-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়ে ফেলবে। এর ফল হবে মহাবিপর্যয়কর: ২০৫০ সালের মধ্যে অতিমাত্রায় এই হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণে ভূমিধস, ভারি বন্যা, বাধ ভেঙ্গে যাওয়া এবং মাটির ক্ষয় হবে। আর গ্লেসিয়ার গলে শেষ হওয়ার পরে শুরু হবে খরা আর দুর্ভিক্ষ। 

আমাদের আসন্ন যুগের আসল আতঙ্ক হলো তাপ, আগুন আর বরফ। কয়েক বছর আগে বড় ধরণের এক বন্যার সময় আমি সিন্ধের একটি গ্রামে ছিলাম। বহু হাজার মানুষকে সেখানে এক রাতেই ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছে। ফোসকা পড়া তাপে ঘরবাড়িহারা নারীদের চেহারা ঘামে এমনভাবে ধুয়ে গিয়েছিল যে, তাদের চেহারাগুলো গ্লিসারিন দেয়া চামড়ার মতো চকচক করছিল। আমি হয়রান হয়ে গিয়েছিলাম কোনটা আসলে বেশি ভয়াবহ – ডুবে যাওয়া না কি তাপমাত্রা। 

করাচির বৃষ্টিপাত, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার মতোই জলবায়ু যুদ্ধের একটা পরিণতি মাত্র। আমরা বসে বসে আমাদের শহরগুলোতে ধীরে ধীরে মরে যেতে দেখছি। গ্রামের মানুষগুলো যখন ডুবে যাচ্ছিল এবং সংগ্রাম করছিল, তখন ভালো করে খেয়াল করিনি আমরা। কিন্তু এটা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, একটা গ্রহ এভাবেই পুড়তে থাকবে। একটি একটি করে পুড়বে। এক ডিগ্রি করে তাপ বাড়বে যতক্ষণ না শহরের অবশিষ্ট অংশটুকু করাচির প্রাচীন দরবেশদের সাদা হাড়-হাড্ডির মতো হয়ে যাবে, যেগুলো হারিয়ে যাওয়া পাহাড়ের চুড়ায় কবর দেয়া আছে।