আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫, ২০২১

আফগান শান্তি নাগালে, তড়িঘড়ি প্রত্যাহার বোকামি হবে

EDITOR’S CHOICE-ENG-28-09-2020
২৪ সেপ্টেম্বর হেরাত প্রদেশে এক প্রশিক্ষণকালে সাঁজোয়া যানের ভেতর থেকে বিজয় চিহ্ন দেখাচ্ছেন এক আফগন সেনা

আফগানিস্তান ও আমাদের অঞ্চলের জন্য আমরা এক বিরল মুহূর্তে উপনীত হয়েছি। অবশেষে কাতারের দোহায় ১২ সেপ্টেম্বর থেকে আলোচনায় বসেছেন আফগান সরকার ও তালেবান প্রতিনিধিরা। রাজনৈতিক নিষ্পত্তির জন্য তারা আলোচনা করছেন যেন আফগান যুদ্ধের ইতি টানা যায়।

প্রাণবন্ত আফগানরা ছাড়া আফগান সঙ্কটের কারণে আর কোন জাতি পাকিস্তানের মতো এতটা উচ্চমূল্য দেয়নি। দশকের পর দশক ধরে চলা এই সঙ্কটের সময় ৪০ লাখ আফগান উদ্বাস্তুর যত্ন নিয়েছে পাকিস্তান। বন্দুক ও মাদকে আমাদের দেশ সয়লাব হয়ে গেছে। এই যুদ্ধ আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ব্যাহত করেছে এবং আমাদের সমাজে চরমপন্থী মনোভাব সৃষ্টি করেছে। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে যে পাকিস্তানে আমি বেড়ে উঠেছি সেই পাকিস্তান গভীরভাবে স্থানচ্যুত হয়ে গেছে।

এই অভিজ্ঞতা আমাদেরকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। প্রথমত, ভৌগলিক, সাংস্কৃতি ও আত্মীতার বন্ধনে আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তান গভীরভাবে মিশে আছে। আমরা বুঝতে পেরেছি যতদিন আমাদের আফগান ভাই ও বোনেরা শান্তি পাবে না তদদিন আমরাও সত্যিকারের শান্তি পাবো না।

আমরা এটাও শিখেছি যে বাইরে থেকে বলপূর্বক আফানিস্তানের উপর শান্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চাপিয়ে দেয়া যাবে না। আফগানিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে নিয়ে একান্তভাবে আফগান মালিকানাধিন, তাদের নেতৃত্বাধিন পুনর্মিলন প্রক্রিয়াই স্থায়ী শান্তি আনতে পারে। 

তাই আফগানিস্তানে আলোচনার মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক নিষ্পত্তি অর্জনের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালের শেষ দিকে যখন আমাকে চিঠি লিখেন তখন আমরা তাকে এমন নিশ্চয়তা দিতে দেরি করিনি যে, এ জন্য পাকিস্তান সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে—আমরা সেটাই করেছি। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে ক্লান্তিকর আলোচনা শুরু হয় এবং যার পরিণতি ছিলো ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-তালেবান শান্তিচুক্তি। এটা আফগান সরকারের সঙ্গে তালেবানের আলোচনা শুরুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

এই জায়গায় সহজে আসা যায়নি। এজন্য সব পক্ষ থেকে আমরা যে সাহস ও নমনীয়তা দেখেছি সে জন্য সবাইকে ধন্যবাদ দেই। কাবুল ও তালেবানের মধ্যে বন্দিবিনিময়ের ব্যবস্থা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। আফগান জনগণের শান্তি আকাঙ্ক্ষার প্রতি সাড়া দিয়েছে আফগান সরকার ও তালেবানরা।

আন্তঃআফগান আলোচনা আরো কঠিন হতে পারে। এর জন্য সবপক্ষের ধৈর্য্য ও আপোস দরকার হবে। অগ্রগতি হতে পারে ধীর ও শ্রমসাধ্য; মাঝে মধ্যে অচলাবস্থাও দেখা দিতে পারে, যেহতু আফগানরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে কাজ করছে। এসময় আমাদেরকে ভালোভাবে মনে রাখতে হবে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে রক্তক্ষয়ী নিষ্পত্তির চেয়ে আলোচনার টেবিলে রক্তপাতহীন অচলাবস্থা অনেক ভালো।

যারা আফগান শান্তি প্রক্রিয়ার পেছনে বিনিয়োগ করেছে তাদেরকে অবাস্তব সময়সীমা নির্ধারণের প্রলোভন সামলাতে হবে। আফগানিস্তান থেকে তাড়াহুড়া করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চলে যাওয়া হবে বোকামি। আমাদেরকে আঞ্চলিক বিনাশকারীদের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। এরা শান্তির জন্য কাজ করেনি, এরা আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতাকে নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের পথে বাধা বলে মনে করে।

একটি ঐক্যবদ্ধ, স্বাধীন ও সার্বভৌম আফগানিস্তান লাভের জন্য আফগানিস্তানের জনগণকে পাকিস্তান সবসময় সমর্থন দিয়ে যাবে, যে রাষ্ট্রটিতে শান্তি থাকবে এবং তার প্রতিবেশিদের সঙ্গেও শান্তি বজায় রাখবে। পাকিস্তান মনে করে জবরদস্তির মধ্যে শান্তি আলোচনা চলতে পারে না এবং সব পক্ষের প্রতি সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানায়। আফগান সরকার রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে তালেবানকে মেনে নিয়েছে। তাই আশা করা যায় যে তালেবানারাও আফগান সরকারের অগ্রগতিকে স্বীকার করে নেবে। 

যুক্তরাষ্ট্রের মতো পাকিস্তানও আফগানিস্তানকে কোন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা হিসেবে দেখতে চায় না। ৯/১১-এর পর থেকে এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে পাকিস্তানের ৮০,০০০ হাজারের বেশি নিরাপত্তা সদস্য ও বেসামরিক লোক জীবন দিয়েছে। আর কোন দেশ এত ক্ষতি স্বীকার করেনি এবং এটা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সফল লড়াই। এরপরও আফগানিস্তান থেকে বাইরের শক্তির প্রভাবিত সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর টার্গেট হচ্ছে পাকিস্তান।

বৈশ্বিক শান্তির প্রতি বর্তমান হুমকি এসব সন্ত্রাসী গ্রুপ। আফগান সরকার এদের মূলোৎপাটনের ব্যবস্থা নেবে বলে আমরা আশা করি। যে রক্ত ও সম্পদ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যয় হয়েছে তা বৃথা যাক এটা যুক্তরাষ্ট্রের মতো আমরাও চাই না।

যুদ্ধোত্তর আফগানিস্তানে কীভাবে টেকসই শান্তি আনা যাবে সে ব্যাপারে পরিকল্পনা প্রণয়ন শুরু করা উচিত।

পাকিস্তানের ব্যাপারে আমার ভিশনে আমি আমার দেশ ও আমার অঞ্চলের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেই। কানেকটিভিটি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে যা হাসিল করতে হবে। 

পাকিস্তানের জনগণের উন্নততর ভবিষ্যতের জন্য আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা অর্জনে বহুজাতিক সহযোগিতার ব্যাপারে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। 

এই শান্তির পথে প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে দোহায়। আফগানিস্তানের শান্তি প্রক্রিয়ার এগিয়ে না যাওয়া বা কোন কারণে একে পরিত্যাক্ত হতে দেখা হবে অত্যন্ত মর্মান্তিক বিষয়।

 

(লেখক, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী)