আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

কালো মেঘের উজ্জ্বল দিক

corona-food-2

বাংলাদেশে সরকার যখন প্রাথমিক পর্যায়ে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করলো, দেশে তখন অনেকটা আধা-লকডাউন শুরু হয়ে যায়। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া রহস্যময় অশুভ করোনাবাইরাসের কারণে যে দুর্ভোগ ছড়িয়ে পড়েছে, সেটার কারণে আতঙ্কিত, বিভ্রান্ত ও সচকিত মানুষজন সে সময় ঘরের মধ্যে আবদ্ধ থাকাটাকেই উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছিল। হাজার হলেও সংক্রমন এড়ানোর চাবিকাঠি হলো দূরত্ব বজায় রাখা। 

তবে, কত মানুষ এভাবে ‘ছুটি’ উপভোগের সামর্থ রাখে? রাস্তার যে হকার, তার থালায় ভাত দেবে কে? রিকশাঅলার পরিবারকে খাবার দেবে কে? দিনমজুরদের কি হবে, যারা আক্ষরিক অর্থেই দিনের খাবার দিনেই রোজগার করে থাকে? ঘরে ঘরে কাজ করা গৃহকর্মীদের কি হবে? পরিবহন শ্রমিকরা কোথায় যাবে? পথশিশুরা কি করবে? ঘরবাড়িহীন, আশ্রয়হীন অসহায়রা কি করবে?

এক রিকশাঅলা যেমনটা বলেছেন, “করোনায় যদি আমরা না মরি, তাহলে ক্ষুধায় মরে যাবো”।

বলা হয়ে থাকে যে, মেঘের আড়ালে সব সময় সূর্য থাকে। কিন্তু কোভিড-১৯ এর মেঘ এতটাই কালো যে, এটা ভেদ করে সামান্য আলোকছটা প্রকাশটাও কঠিন হয়ে উঠেছে। 

কিন্তু মানবিকতাকে কে অস্বীকার করতে পারে? আর এই ঘোর অন্ধকার সময়টা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, ভালোবাসা এখনও মানুষের হৃদয়ে প্রবলভাবে জ্বলছে। 

মহামারীর সাথে যুদ্ধ করা এবং অর্থনীতিকে ভাসিয়ে রাখার অতিকায় দায়িত্ব নিয়ে সরকার এখন হিমশিম খাচ্ছে, যেখানে তাদের সাথে রয়েছে অদক্ষ ব্যবস্থা, দূরদৃষ্টির অভাব এবং সীমাহীন দুর্নীতি। কিন্তু এই প্রয়োজনের সময়টাতে, ব্যক্তি, গোষ্ঠি, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, শিক্ষার্থী, এবং সকল পর্যায়ের মানুষেরা তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসেছে। 

স্বয়ংক্রিয় পরিচ্ছন্নতাকারী

চট্টগ্রামে, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) একদল শিক্ষার্থী সিদ্ধান্ত নেয়, তারা কিছু একটা করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিক্স গবেষণা সংস্থা - রোবো মেকাট্রনিক্স অ্যাসোসিয়েশানের (আরবিএস) সদস্যরা সেটাই করার চেষ্টা করেছে, যেটা তারা সবচেয়ে ভালো পারে। শিক্ষার্থী এবং আরবিএস অ্যালামনাইদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে তারা একটা ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সেখানে একটা স্বয়ংক্রিয় স্যানিটাইজার স্প্রে মেশিন তৈরির কাজ শুরু করে। তারা এটা করেও ফেলে। স্যানিটাইজারের নলের নিচে শুধু হাত দিলেই হাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্যানিটাইজারের ফোঁটা পড়বে। তারা বাস স্ট্যাণ্ড, হাসপাতালের গেট এবং পাবলিক প্লেসগুলোতে এই স্বয়ংক্রিয় স্যানিটাইজারগুলো বসিয়েছে। রাস্তায় যে সব মানুষের স্যানিটাইজার কেনার সামর্থ নেই এবং যাদের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে হাত ধোয়ার মতো পানিও সাথে থাকে না, তারা এখন এই সুবিধাটা ব্যবহার করছে। তাদের কোন কিছু স্পর্শও করতে হচ্ছে না, কোন টাকাও দিতে হচ্ছে না। 

লাঠি নয়, ‘ভাত’

ঢাকাতে সরকার যখন ছুটি ঘোষণা করলো, তখন জনগণকে রাস্তা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়। এই নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশকেও ভয় করেনি এক রিকশাঅলা। সে উল্টা প্রশ্ন করে, “আমি যদি ঘরে বসে থাকি, তাহলে খাবো কি?”

ধানমণ্ডি এলাকার অতিরিক্ত ডেপুটি পুলিশ কমিশনার আব্দুল্লাহ হিল কাফি রিকশাঅলার জবাবে থমকে যান। তিনি বুঝতে পারেন যে, মানুষকে রাস্তায় বের হওয়া বন্ধ করতে হয়তো লাঠির ব্যবহার করতে পারেন তিনি, কিন্তু তাতে কি তাদের পেটে ভাত পড়বে? রিকশাঅলার কথা তাকে নাড়া দেয় এবং তিনি বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, “প্রথম দুই দিন আমরা আমাদের নিজেদের তহবিল থেকে গরিবদের খাইয়েছি, কিন্তু এরপর বহু মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে”।

প্রতিদিনই এই ধরনের গল্প এখন সামনে আসছে, যেখানে মানুষ গরিবদের সাহায্যে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু ও তেলের মতো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে এগিয়ে আসছে। 

বিনামূল্যে পিপিই

তবে শুধুমাত্র গরিবদেরই যে সাহায্য প্রয়োজন, তা নয়। একেবারে সামনের সারিতে যারা লড়াই করছেন, সেই ডাক্তার, নার্স আর স্বাস্থ্য কর্মীরা প্রতিদিন নিজেদের জীবনকে ঝুঁকিতে ঠেলে দিয়ে রোগিদের নিয়ে কাজ করছেন। যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, যাদের করোনাভাইরাস হতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে এবং অন্যান্য নিয়মিত রোগিদের নিয়ে তারা কাজ করছেন। কিন্তু, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) বিপুল ঘাটতি রয়েছে। বেশ কিছু গার্মেন্টস কারখানা এগিয়ে এসেছে এবং এই পিপিই সেটগুলো তারা বিজিএমইএ’র মাধ্যমে বা সরাসরি স্বাস্থ্যসেবার সাথে জড়িত ব্যক্তিদেরকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণ করছেন। এই আচরণ সুবিধাভোগী বা বাধ্যতামূলক সিএসআরের সীমা পেরিয়ে গেছে। এই কারখানাগুলো প্রয়োজনের সময়ে বন্ধু হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ব্যবসায়ের উদ্দেশ্য শুধু অর্থ উপার্জন নয়। তারা কমিউনিটির বিপদের সময়েও হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। 

corona-no-dr-no-bedসচেতনামূলক অ্যাপ

সারা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় যে প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটিগুলো রয়েছে, তারাও এই মহামারীর সময়ে বাংলাদেশের কি অবস্থা বিরাজ করছে – সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কানাডা প্রবাসী তরুণ তাহমিদ হাসিব খান এবং তার বন্ধুরা কোভিড-১৯ নিয়ে সচেতনতা তৈরির জন্য এবং কি করতে হবে এবং কি করা যাবে না, সেটা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য একটি অ্যাপ তৈরি করেছে। মানুষ যেহেতু ঘরে আটকা পড়েছে এবং তাদের মোবাইলগুলো বাইরের বিশ্বের সাথে সংযুক্ত থাকার একমাত্র মাধ্যম, সেখানে এই অ্যাপটি বিশেষভাবে উপকারী হয়ে উঠেছে এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে একটা আবেদন তৈরি করেছে। 

‘মানবিকতার ঘর’

সিলেটে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও মানবাধিকার কর্মীদের সংগঠন ন্যাশনাল প্রেস সোসাইটি করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যে অসহায় ও গরিব মানুষদের সাহায্য করার জন্য ‘মানবতার ঘর’ খুলেছেন। 

স্টিলের দুই রুমের এই ঘরের মধ্যে চাল, ডাল, তেল, লবণ ও পেঁয়াজের পাশাপাশি কাপড়ও রাখা হয়েছে। গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ এখানে এসে বিনামূল্যে খাবার আর কাপড় নিয়ে যেতে পারে। 

সারা দেশে এ ধরনের বহু প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। 

বাংলাদেশে প্রথম যখন মহামারীর খবর ছড়ালো, তখন বাজারগুলোতে মানুষের হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল এবং যাদের সামর্থ ছিল, তারা খাবার, সাবান, স্যানিটাইজার এবং এ ধরনের জিনিসগুলো বিপুল পরিমাণে কিনে নিয়েছে। দাম বেড়ে যাওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষেরা কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে যায়। বিষয়টা ছিল দুঃখজনক। 

কিন্তু সঙ্কট বাড়ার সাথে সাথে সমাজের মানবিক দিকটাও বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। ভুপেন হাজারিকার গান মনে আসছে: “মানুষ মানুষের জন্য…”। হাঁ, আসলেই তাই।