আমরা লাইভে English মঙ্গলবার, অক্টোবর ২৭, ২০২০

ড্রাগনের প্রবেশ, বাঘের প্রস্থান

SAM SPECIAL2020-08-29 070327

১৯৭৬ সালে ব্রুস লি’র একটি ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিল – এক্সিট দ্য ড্রাগন, এন্টার দ্য টাইগার (ড্রাগনের প্রস্থান, বাঘের প্রবেশ)। চার দশক পরে এসে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই চিত্রটা যেন উল্টে গেছে। চলচ্চিত্রের কথা বাদ দিলে, দক্ষিণের এশিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতার খেলার প্রেক্ষাপটের বাস্তবতা হলো ড্রাগনের (চীন) প্রবেশ এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং দৃশ্যপট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বাঘ (ভারত)।

এই ড্রাগনের নিঃশ্বাসে যে আগুন বের হয়, সেটা অবশ্য পোড়ানোর আগুন নয়, সেটা হলো উন্নয়ন, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, একটি মহাসড়ক যেটা পৃথিবীর চতুর্দিকে সফরের সম্ভাবনার কথা বলে। অন্যদিকে বাঘ পরাজিতের সাহস দেখানোর জন্য তার দাঁত, থাবা দেখানোর এবং গর্জন করার প্রানান্ত চেষ্টা করছে। গর্জনের ধার কমে গেছে এবং বনের অন্যান্য প্রাণীদের রক্ষার জন্য এখন ড্রাগন রয়েছে, এটা বোঝার পর বাঘ এখন প্রতিবেশীদের কাছে দয়াশীল হিসেবে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা করছে। কিন্তু মনে হচ্ছে খানিকটা দেরি হয়ে গেছে। মেঘের চাদরে ঢাকা কোন নেকড়েকে কেউ আর বিশ্বাস করতে চাইছে না। 

রূপকথা আর কল্পকাহিনী বাদ দিলে, মনে হচ্ছে আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার ব্যাপারে ভারতের মহা পরিকল্পনার উপর পর্দা পড়তে চলেছে। অন্যদিকে, চীন ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে এই অঞ্চল ও অঞ্চলের বাইরে জায়গা করে নিচ্ছিল, এবং তারা এখন তাদের গতি বাড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সমীকরণের বিষয়টি এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। মোদ্দা কথা হলো ভারত তাদের চারপাশের অনুগত ও বল প্রয়োগে নত প্রতিবেশীদের সমর্থন হারিয়েছে এবং গ্রেট ওয়ালের পেছনে লুকানো অজ্ঞেয় শক্তির বলে চীন এখন এই ব্লকের নতুন শক্তি হয়ে উঠেছে। 

আরও পড়ুনঃ ভারতকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলছে চীন!

ভারতের মতো প্রতিবেশীর উপর জবরদস্তির পথে হাঁটেনি চীন, বরং যেখানে অর্থের দরকার, সেখানে অর্থ দিয়েছে তারা। প্রতিবেশীদের জন্য তাদের বার্তা হলো “তুমি উন্নয়ন চাও? সেটা তুমি পাবে!” পশ্চিমা শক্তিগুলোরও একই রকম আধিপত্যের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে, কিন্তু চীন তাদের মতো তথাকথিত গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সেই সব চর্বিত কথা বলেনি, যেগুলো পশ্চিমারা বলতে ভালোবাসে। তারা এমন মিত্র চায়, যারা জিনিস সরবরাহ করতে পারবে এবং এ জন্য অর্থ দিতে প্রস্তুত। 

চীনের সন্দেহজনক মানবাধিকারের রেকর্ড এবং যেভাবে তারা গণতন্ত্রকে অবজ্ঞা করছে, সেটা নিয়ে পশ্চিমারা হয়তো হৈ চৈ করতে পারবে। চীন ও তাদের বৈশ্বিক প্রভাবের মোকাবেলার জন্য পশ্চিমাদের কৌশল হলো যত বেশি সম্ভব ঝামেলা তৈরি করা। হংকংয়ের বিক্ষোভ, মুসলিম উইঘুরদের ব্যাপারে তাদের যথার্থ অশ্রুপাত, চীনা ‘ঋণের ফাঁদ’ নিয়ে তাদের চেঁচামেচি – এই সবকিছুই চীনের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্বেষমূলক প্রচারণার অংশ। কিন্তু বিশ্ব এই তথাকথিত সভ্য দেশগুলোর ভণ্ডামি যথেষ্ট মাত্রায় দেখে ফেলেছে।

আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় তারা যখন নিরপরাধ পুরুষ, নারী ও শিশুদের নিশ্চিহ্ন করেছে, তখন কোথায় ছিল তাদের মুসলিম সমবেদনা? বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ এবং এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের ফাঁদের ব্যাপারে তাদের অবস্থান কি? না কি স্যুট প্যান্টের কারণে এগুলো ‘হালাল’ হয়ে গেছে? গুয়ান্তানামো বে’র সময় তাদের মানবাধিকারের বিবেক কোথায় ছিল; জর্জ ফ্লয়েড, অবাধ বর্ণবাদ এবং আরও অগণিত ঘটনা আজ তাদের ভণ্ড চেহারা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। 

ভারত এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বি-টিম হিসেবে, তাদের মধ্যস্থতাকারী ও এজেন্ট হিসেবে খুশি। প্রশ্ন হলো, দক্ষিণ এশিয়ার এজেন্টের অব্যাহত ব্যর্থতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র কি তার ব্যাপারে খুশি হবে? এ অঞ্চলে মার্কিন ও নিজেদের স্বার্থ সংহত করার বদলে একে একে সব কার্ড হারাচ্ছে তারা, এমনকি তাদের ট্রাম্প কার্ড বাংলাদেশকেও হারাতে চলেছে ভারত। মোদিকে সাথে নিয়ে জুয়া খেলার ব্যাপারে ট্রাম্প খুব একটা খুশি হতে পারবেন না। 

আরও পড়ুনঃ দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের বিরোধী চীন

অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ভারত অনে মবানতোতা বন্দরে চীনের সাথে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে শ্রীলংকা আর উদ্বিগ্ন নয়। তারা ভেবেছিল যে, আরেকেটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের জন্য শ্রীলংকা ভারতকে উদারভাবে স্বাগত জানাবে, কিন্তু শ্রীলংকার দিক থেকে কোন সাড়া নেই। নেপাল প্রায় ভৃত্যের মতো ভারতের সেবা করে গেছে, কিন্তু সেই দিন আর নেই। তারা নতুন করে মানচিত্র এঁকেছে এবং বড় ভাইয়ের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ভারতের পারমাণবিক শক্তিধর শত্রু পাকিস্তানের ব্যাপারে নতুন করে কিছু বলার নেই। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে সেখানকার ইস্যুকে নির্বোধের মতো ব্যবহারের কারণে, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতকে পচানোর আরও সুযোগ পেয়ে গেছে। ভুটানও আগের সেই অন্ধ ভক্তি হারিয়ে ফেলেছে বলে মনে হচ্ছে। মালদ্বীপও সম্ভবত সেই পথেই আছে, সময়েই সেটা বোঝা যাবে। 

এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয়টি এখন ‘টক অব দ্য টাউনে’ রূপ নিয়েছে। ভারতের শেষ অনুগত দুর্গটিও নড়বড়ে হয়ে উঠেছে, কারণ বাংলাদেশ স্পষ্টতই পূর্বের দিকে মুখ ফিরিয়েছে, এবং প্রথমবারের মতো ভারতের ব্যাপারে শীতল মনোভাব দেখিয়েছে। কৌশলি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটা ধূর্ত ভারসাম্যের কৌশল কাজে লাগিয়েছেন এবং তার কৌশল কাজ দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে কারণ সবশেষ এই দুর্গকে টিকিয়ে রাখতে সব ধরনের বেপরোয়া পদক্ষেপ নিচ্ছে ভারত, যারা তাদের সাথে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেছে বলে মনে হচ্ছে। আগামী বছর স্বাধীনতার ৫০তম বছর উদযাপন করবে বাংলাদেশ এবং মানুষ এই প্রশ্ন করতে শুরু করেছে যে, “শেষ পর্যন্ত আমরা কি সত্যিই স্বাধীন হবো, ভারতীয় আগ্রাসন থেকে কি আমরা স্বাধীন হবো, যেটা আমাদেরকে বিগত পাঁচ দশক ধরে উপরে উঠতে দেয়নি?”

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে সাধারণ প্রশ্নটি এখন ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসিত হচ্ছে, সেটা হলো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপট কি বড় ধরনের বাঁক নিয়েছে? চীনের বেল্ট অ্যাণ্ড রোড ইনিশিয়েটিভ কি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্রশান্ত কৌশলের উপর আধিপত্য করবে, যেটাকে প্রচারের জন্য শক্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত? ড্রাগনের আগুন কি শেষ পর্যন্ত বাঘের আকাঙ্ক্ষাগুলোকে ছাই করে দিয়েছে?