আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনীতে নিয়োগে নৃতাত্ত্বিকতা ও ধর্ম

BOTTOM8-ENG-28-07-2020-SAM FEATURE (1)
সিলন রাইফেল রেজিমেন্টের একজন মালয় সেনা, ১৮৩০ সালের ছবি

সেই ডাচ ও ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সিলন/শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনীতে নিয়োগে নৃতাত্ত্বিকতা ও ধর্ম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিবেচিত হয়ে আসছে।

সপ্তদশ শতক থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত ডাচ ও ব্রিটিশ শাসনে থাকা জাভা ও মালয় উপদ্বীপ থেকে আনা মালয়রা দ্বীপদেশটিতে ডাচ ও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে প্রাধান্য বিস্তার করে ছিল। ১৮৭৩-পরবর্তী সময়ে মালয়দের স্থলাভিষিক্ত হয় ব্রিটিশ প্লান্টার, খ্রিস্টান বারগার ও খ্রিস্টান তামিলরা। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর সিংহলি বৌদ্ধরা হয় সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান গ্রুপ। এ সময় ক্ষমতা গ্রহণ করে সিংহলি-বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠরা।

মালয়

বি এ হুসাইনমিয়া তার ওরাং রেজিমেন্ট: দি মালয়স অব সি সিলন রাইফেল রেজিমেন্ট গ্রন্থে লিখেছেন যে ভিরিনগদে ওস্টিনডিসচে কোম্পানির ভিওসির বসতিগুলো পাহারা দিতে বাটাভিয়ার (ইন্দোনেশিয়া) ডাচ বসতি থেকে মালয়দের নিয়ে আসে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ভিওসির সেনাবাহিনীতে মালয়রা ছিল একক বৃহত্তম উপাদান।

মালয় সৈন্যরা গলে (১৬৪০), কলম্বো (১৬৫৫-৫৬) ও জাফনায় (১৬৫৮) পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে ডাচদের সব অভিযানে অংশ নিয়েছিল। ১৬৫৮ সালে ডাচ কমান্ডার রাকিলফ ভ্যান গোয়েন্সের অধীনে এক মালয় কমান্ডারের নেতৃত্বে একটি মালয় বাহিনী পর্তুগিজদের ওপর হামলা চালাতে কেরালার মালাবার উপকূলে যায়। ১৬৮০ সালে ক্রিস্টোফার স্কুইজার লিখেছেন, মালয়রা খুবই ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন ও বেড়া ডিঙ্গাতে উস্তাদ। এসব কাজ করতে ভয় পায় স্থানীয় সিংহলিরা।

ক্যান্ডিয়ান যুদ্ধের সময় ক্যান্ডিয়ানরা গেরিলা কৌশল অবলম্বন করে। ডাচরা চতুরতার সাথে মালয়দের সামনে মোতায়েন করে, তার কিরিচ আর ছোট তরবারি দিয়ে ক্যান্ডিয়ানদের মোকাবিলা করে। ১৭৯৫-৯৬ সময়কালে উপকূলে ডাচদের ওপর যখন ব্রিটিশরা আক্রমণ করে, তখন কেবলমাত্র মালয়রাই কিছু প্রতিরোধ করে। 

ব্রিটিশরা এতে এতই মুগ্ধই হয়েছিল যে তারা উপকূলীয় প্রদেশগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করলেও মালয়দেরই সামরিক শক্তির প্রধান উৎস বিবেচনা করতে থাকে। 

গভর্নর ফ্রেডেরিক নর্থ ১২ শ’ সদস্য ও ২২ ইউরোপিয়ান অফিসার নিয়ে মালয় কোর গঠন করেন। তারা ১৮০৩ সালে রাজার কমিশন লাভ করে।

বাহিনীতে আরো মালয় আকৃষ্ট করার জন্য নর্থ ইস্ট ইন্ডিজগুলোতে আরো মালয় আনার প্রস্তাব দিতে থাকেন, তাদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করেন। 

মালয় বাহিনী বৃদ্ধি করেই ১৮১৫ সালে ব্রিটিশরা শেষ শ্রীলঙ্কার রাজা শ্রী বিক্রমা রাজাসিঙ্গেকে পরাজিত করেছিল। ঘটনাক্রমে বিক্রমাসিঙ্গেও তার দেহরক্ষী হিসেবে মালয় সম্প্রদায় থেকে সদস্য সংগ্রহ করেছিল। তিনি সিংহলিদের সন্দেহ করায় তাদের ওই পদে গ্রহণ করেননি। ১৮১৮ সালে উভা প্রদেশে একটি মারাত্মক বিদ্রোহ দমন করতে মালয়রা সহায়তা করেছিল।

মালয় রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়া হলো

১৮৩৩ সালে নবগঠিত পুলিশ বাহিনীতে বিপুলসংখ্যক মালয় যোগ দেয় বেতন ও সুযোগ সুবিধা বেশি থাকায়। হোসাইনিমিয়ার কথা অনুযায়ী, ১৮৩৩ সালে ১০ পুলিশ সার্জেন্টের মধ্যে ৯ জনই ছিলেন মালয়, ৭৫ ভাগ কনস্টেবল ছিলেন মালয়। তুয়ান এম জামির করিমের মতে, প্রতিটি থানা মালয় গ্রামে পরিণত হয়েছিল।

এদিকে শ্রীলঙ্কায় কোনো যুদ্ধ না হওয়ায় গভর্নর উইলিয়াম গ্রেগরি ১৮৭৩ সালের ১৫ আগস্ট মালয় প্রাধান্যপূর্ণ সিলন রাইফেল রেজিমেন্ট ভেঙে দেন। তাদের স্থানে ব্রিটিশ প্লান্টার ও অন্যদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠিত হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল খ্রিস্টান তামিল ও বারগাস। তারা ছিল ব্রিটিশপন্থী।

সিংহলি-বৌদ্ধদের উত্থান

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পুরোপুরি সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি বৌদ্ধদের দিকে যায়। এর প্রভাব পড়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী গঠনে। এর ফলে ১৯৬২ সালের ২৭ জানুয়ারি একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটে। সেনা, নৌ ও পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ক্ষমতা গ্রহণের প্রয়াস পান। তাদের প্রয়াসে দেশের উদীয়মান ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা ফুটে ওঠেছিল। ওই বিভাজন এখনো শ্রীলঙ্কায় বিরাজমান।

উপনিবেশ আমলের এলিট আর সদ্য উদীয়মান এলিটদের মধ্যে বিরাজমান সঙ্ঘাত ফুটে ওঠেছিল তাতে। এলিটরা ছিল প্রধানত খ্রিস্টান (ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্ট), পাশ্চাত্যভাবাপন্ন, নগর ও ডানপন্থীরা। অপর পক্ষে ছিলেন সিংহলি-বৌদ্ধপন্থী, অ-পাশ্চাত্য, গ্রামীণ ও বামপন্থীরা। 

ফলে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রায় সবাই যে খ্রিস্টান ও সমাজের উচ্চ শ্রেণীর হবেন, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু ছিল না। তারা আবার ছিলেন পাশ্চাত্য ভাবাপান্ন ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির (ইউএনপি) সমর্থক। অবশ্য অভ্যুত্থানের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না।

এক হিসাবে দেখা যায়, ১৯৪৯-১৯৬৬ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনীর তিন-পঞ্চমাংশ ছিল খ্রিস্টান, তামিল ও বারগার। খ্রিস্টানরা ছিল শ্রীলঙ্কার জনসংখ্যার মাত্র ১০ ভাগ। কিন্তু সেনাবাহিনীতে তাদের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি, ছয় ভাগের এক ভাগ। আর সিংহলি-বৌদ্ধরা দেশের জনসংখ্যার ৭০ ভাগ হলেও অফিসারদের মধ্যে মাত্র দুই-পঞ্চমাংশ ছিল তারা।

তবে এসডব্লিউআরডি বন্দরনায়েকের শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি (এসএলএফপি) ও এর জোট অংশীদার মহাজানা একসাথ পেরামুনা (এমইপি) বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। এর ফলে মাত্র ১০ বছরের মধ্যে সিংহলি বৌদ্ধরা অফিসার কোরে অনুপাতের চেয়ে বেশি অংশে প্রবেশ করেন।

পুলিশেও একই অবস্থা হয়। ১৯৫৮ সালে বন্দরনায়েকে তিন সিনিয়র খ্রিস্টান প্রার্থীকে ডিঙিয়ে এক বৌদ্ধকে আইজিপি করেন।

বন্দরনায়েকে নিহত হওয়ার পর তার স্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে ক্ষমতায় আসেন। তিনি সেনাবাহিনী ও পুলিশে আরো পরিবর্তন আনেন।