আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

ঠিক এক শতাব্দি আগে আরেক ভয়াবহ মহামারীর মুখোমুখি হয়েছিল শ্রীলংকা

SAM SPECIAL-ENG-16-04-2020
বিংশ শতাব্দির শুরুতে কলম্বো পোতশ্রয়ের দৃশ্য

ঠিক ১০০ বছর আগে, শ্রীলংকা আরেকটি ভয়াবহ মহামারীর মধ্য দিয়ে গিয়েছিল – সেটা ছিলো স্প্যানিশ ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা, যে রোগে প্রায় ২০,০০০ মানুষ মারা গিয়েছিল। 

ওই ‘ফ্লু’ সারা বিশ্বে ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়ন মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল; গরিবদের পাশাপাশি ধনীদের উপরও চরম আঘাত হেনেছিল; সমৃদ্ধ পশ্চিম এবং দারিদ্র-পীড়িত প্রাচ্য সবখানেই এর প্রভাব পড়েছিল। এবং সবখানেই এর আঘাত পড়েছিল একই তীব্রতা নিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতে মারা গিয়েছিল ২০ মিলিয়নের বেশি মানুষ আর শ্রীলংকায় মারা গিয়েছিল ২০,০০০। 

মহাত্মা গান্ধী তখন মাত্র দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরেছেন। বোম্বেতে মারাত্মক এই ফ্লুতে আক্রান্ত হন তিনি। তিনি বেঁচে যান, কিন্তু এই রোগে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েন যে, তিনি লিখেছেন: “বেঁচে থাকার সব আগ্রহই আমি হারিয়ে ফেলি”।

আরও পড়ুনঃ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের কঠোর আঘাত

কোভিড-১৯ এর মতোই ইনফ্লুয়েঞ্জা শ্রীলংকায় এসেছিল বাইরের দেশ থেকে। ১৯১৮-১৯ সালের ঘটনায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে যে সব সেনা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধক্ষেত্রগুলো থেকে দেশে ফিরছিল, তারাই সাথে করে এই রোগ নিয়ে আসে। সফর এবং পশ্চিম, ভারত ও শ্রীলংকার মধ্যে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে কলম্বো ও তালাইমান্নার বন্দরের মধ্য দিয়ে যে সব যাতায়াত হতো, সেই পথেই এই রোগ আসে। কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রেও এই ভাইরাস বয়ে এনেছে পর্যটকরা, ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে সফরকারীরা এবং অভিবাসী শ্রমিকরা, এবং এরা এসেছে কলম্বো বিমানবন্দর দিয়ে। 

ল্যাংফোর্ড ও স্টোরেই

“ইনফ্লুয়েঞ্জা ইন শ্রীলংকা, ১৯১৮-১৯: দ্য ইমপ্যাক্ট অব অ্যা নিউ ডিজিজ ইন অ্যা প্রি-মডার্ন থার্ড ওয়ার্ল্ড সেটিং” শিরোনামের একটি একাডেমিক গবেষণা পত্রে লণ্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের পপুলেশান স্টাডিজ বিভাগের সি এম ল্যাংফোর্ড এবং পি স্টোরেই শ্রীলংকার অতীত ওই ঘটনাকে তুলে ধরেছেন। 

গবেষণা পত্রটির কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করা হলো: 

১৯১৮ সালের বসন্ত-গ্রীষ্মে যে প্রাথমিক ঢেউ আসে, সেটা ছিল তুলনামূলক হালকা। দ্বিতীয় ধাক্কাটা আসে ১৯১৮ সালের শরৎ আর শীতকালে। এবারের ধাক্কার তীব্রতাটা ছিল বেশি এবং নিউমোনিয়াজনিত জটিলতা এবং মৃত্যুর হার এতে বেড়ে যায়। যারা এই ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিল, তাদের মধ্যে ২০ শতাংশের নিউমোনিয়া সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দেয় এবং এই ২০ শতাংশের মধ্যে আট শতাংশই মারা যায়। তৃতীয় ধাক্কাটা আসে ১৯১৯ সালের শুরুর দিকে। এটাও মারাত্মক ছিল কিন্তু সার্বিকভাবে এর প্রভাব ছিল কম। 

তখনকার যুক্তরাষ্ট্র

কোভিড-১৯ এর মতোই ফ্লু মহামারীর ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভূমিকা ছিল। বর্তমান ক্ষেত্রে করোনাভাইরাস যদিও তার যাত্রা শুরু করেছে চীন থেকে, কিন্তু এই ভাইরাস যখন যুক্তরাষ্ট্রের পৌঁছায়, তখনই কেবল সেটা বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেয়। ল্যাংফোর্ড আর স্টোরেইয়ের মতে, এক শতাব্দি আগে, ১৯১৮ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে এই ফ্লু ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী চার মাসে সেটা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। 

জুন ও জুলাই মাসে এটা ব্রিটেনে আঘাত হানে, ১৯১৮ সালের জুনে এটা বোম্বেতে পৌঁছায় এবং এরপর সেটা কলম্বো ও তালাইমান্নারে ছড়ায়। সে সময়টাতে, কলম্বোর পরেই সবচেয়ে বড় বন্দর ছিল তালাইমান্নার, যেখানে সবচেয়ে বেশি নৌযান ও লোকজনের যাতায়াত ছিল। ১৯১৮ সালে তামিলনাড়ুর মাণ্ডাপাম কোয়ারেন্টিন ক্যাম্প থেকে দুই লাখের মতো মানুষ শ্রীলংকা থেকে যাওয়া আসা করেছে। 

পরিস্থিতি জটিল করেছে ম্যালেরিয়া

২০১৮ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে ইনফ্লুয়েঞ্জা কমে আসে কিন্তু বড় মাত্রায় ম্যালেরিয়া মাথাচাড়া দেয়। ম্যালেরিয়া মানুষকে এতটাই দুর্বল করে দিয়েছিল যে, ফ্লু-তে আক্রান্ত হলেই মানুষ তখন মারা যেতো। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ম্যালেরিয়ার বহু ঘটনার ক্ষেত্রেই নিউমোনিয়া যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে সম্ভবত ইনফ্লয়েঞ্জার কারণে।

শুকনা এলাকার জেলাগুলো (যেমন অনুরাধাপুর) ভেজা এলাকার চেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে। লেখকদের মতে, শুষ্ক এলাকাগুলোতে বেশি আক্রান্ত হওয়ার কারণ হলো ওই এলাকাগুলোতে সুস্বাস্থ্যের মাত্রা সাধারণভাবেই ছিল কম, ছিল অনুন্নত এবং সেখানে স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশানের সুবিধাও ছিল সীমিত। আর শুষ্ক এলাকাও পশ্চিম জোনের চেয়ে বেশি ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ম্যালেরিয়ার সাথে ফ্লু যুক্ত হয়ে সেটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল। 

জাতিগত পার্থক্য

১৯১১ সালের শ্রীলংকান আদমশুমারি অনুযায়ী, জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ ছিল সিংহলি, ১৩ শতাংশ ছিল সিলন তামিল, ১৩ শতাংশ ছিল ভারতীয় বংশোদ্ভুত তামিল এবং ৬ শতাংশ ছিল সিলন মুর বা মুসলমান। 

স্বল্প মেয়াদে সবচেয়ে খারাপ মাসগুলোতে মহামারীর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লেগেছিল ভারতীয় বংশোদ্ভূত তামিলদের উপর। এর পরেই ছিল মুসলিমরা। সিংহলরা ছিল তৃতীয়। সিংহলীদের তৃতীয় হওয়ার কারণ সম্ভবত তাদের আবাসস্থলগুলো ছড়ানো, যেখানে অন্যান্য সম্প্রদায়রা সাধারণত অনেক কাছাকাছি বাস করতো। 

তবে, দীর্ঘ ১৫ মাস মেয়াদকালের মধ্যে মৃত্যুর হারের ক্ষেত্রে জাতিগত পার্থক্যটা মুছে যায় বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন। 

নারী

তথ্য থেকে এটা পরিস্কার বোঝা যায় যে পুরুষের চেয়ে নারীরা ওই মহামারীতে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল। এর সম্ভাব্য একটি কারণ হলো গর্ভধারণ ও শিশু জন্মের সাথে এর সম্পৃক্ততা। ১৯১৮-১৯ সালের মহামারীসহ অধিকাংশ বৈশ্বিক মহামারীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভপাত হয়েছে এবং মৃত শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছে। 

১৯১৮-১৯ সালে, ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্ত ১৩৫০ জন গর্ভবর্তী নারীকে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল এবং দেখা গিয়েছিল যে, যাদের নিউমোনিয়া নেই তাদের ক্ষেত্রে ২৬ শতাংশের গর্ভপাত, মৃত শিশু প্রসব বা নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রসব হয়েছে। অন্যদিকে, যাদের নিউমোনিয়া ছিল, তাদের ক্ষেত্রে ৫২ শতাংশের ক্ষেত্রে এ সব সমস্যা হয়েছে। 

আরও পড়ুনঃ রাষ্ট্রগুলোর পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন অজুহাত করোনাভাইরাস

তবে লেখকদ্বয় বলেছেন যে, ১৯১৮-১৯ মহামারীতে নারীদের মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার বিষয়টি শুধুমাত্র গর্ভধারণের বিষয়টি দিয়ে বিশ্লেষণ করা যায় না। তারা উল্লেখ করেছেন, আসল উত্তর হলো সাধারণভাবেই সে সময়টাতে শ্রীলংকায় নারীদের মৃত্যুর হার পুরুষদের চেয়ে বেশি ছিল। বিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে শ্রীলংকায় জন্মের সময় পুরুষদের প্রত্যাশিত আয়ু ছিল ৩২.৭ বছর আর নারীদের ক্ষেত্রে সেটা ছিল ৩০.২ বছর। 

খাবারের সঙ্কট

ল্যাংফোর্ড ও স্টোরেই বলেছেন, কৃষি উৎপাদনের উপর মহামারীর প্রভাব, এবং ১৯১৮-১৯ সালের মহামারীতে মৃত্যু হারের উপর খাবারের প্রাপ্যতার গুরুত্বের বিষয়টি কোনভাবেই অগ্রাহ্য করা যাবে না। 

এতে কোন সন্দেহ নেই যে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী শ্রীলংকায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করেছিল। লেখকদ্বয় বলেছেন, স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়া এবং খাবার রফতানির উপর ভারতের নিষেধাজ্ঞার (ভারতেও মহামারী ছড়িয়ে পড়েছিল) কারণে শ্রীলংকায় খাবারের সঙ্কট তৈরি হয়েছিল এবং এর থেকে পুষ্টির সঙ্কট ও মৃত্যুর হার বেড়ে গিয়েছিল।