আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

শাহীন বাগের বিক্ষোভকারীদের প্রতীক আম্বেদকার, গান্ধী নন

এক মাসের বেশি সময় ধরে উত্তর দিল্লীর আইনের শিক্ষার্থী তাসকিন আহমেদ প্রতিদিন দক্ষিণ দিল্লীর শাহীন বাগের অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। সেখানে ২৪ বছর বয়সী এই যুবক দলিত আইকন ড. বি আর আম্বেদকারের একটি রঙিন ছবি নিয়ে বসে থাকেন। ভারতের সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টিকারী নতুন নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে এটা করছেন তিনি। 

শাহিন বাগের অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়েছে গত ডিসেম্বরে। কিন্তু এক মাস চলে গেলেও বিক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। হাজার হাজার পুরুষ ও নারী – যারা মনে করেন যে, এই আইন মূলত দেশে তাদেরকে আরও নির্যাতনের কবলে ফেলতে করা হয়েছে, তারা শাহিন বাগের জমায়েতে জড়ো হয়ে শর্তহীনভাবে এই আইন বাতিল করার দাবি জানাচ্ছেন। শাহিন বাগকে এখন বলা হচ্ছে ভারতের তাহরির স্কয়ার। 

চলমান এই বিক্ষোভের একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর আগের অহিংস বিক্ষোভগুলোতে যেখানে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নেয়া হয়েছিল, সেখানে চলমান বিক্ষোভে আইকন করা হয়েছে ড. বি আর আম্বেদকারকে – যিনি ভারতীয় সংবিধানের স্থপতি – তাকেই এই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় চরিত্র, একটা প্রতীক, ত্রাণকর্তা এবং সুরক্ষার অস্ত্র করা হয়েছে। 

আম্বেদকারের ভক্তরা তাকে শ্রদ্ধার সাথে বাবাসাহেব নামে ডেকে থাকেন। ভারতে দলিত বা অস্পৃশ্যদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি প্রবলভাবে লড়েছিলেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম আইন ও বিচার মন্ত্রী ছিলেন তিনি। ছিলেন ভারতের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা, যিনি দলিতদের জন্য প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন এবং ভারতীয় রাষ্ট্রের সমাজবাদী ও সেক্যুলার চরিত্রটি নিশ্চিত করেছিলেন, যেটার জন্ম হয় ১৯৪৭ সালে। 

গান্ধীর সাথে আম্বেদকারের পার্থক্যটা মানুষের জানা। বহু বক্তৃতা ও বিবৃতিতে আম্বেদকার উচ্চবর্ণের হিন্দুর প্রতি গান্ধীর পক্ষপাতিত্বের জন্য তার সমালোচনা করেছেন। 

বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক ও অধিকার কর্মী অরুন্ধতী রায় তার ‘ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট’ (যেখানে আম্বেদকার হলেন ডক্টর এবং গান্ধী হলেন সেইন্ট) বইতে লিখেছেন: “প্রশ্ন হলো, দারিদ্র কি তৈরি করা যায়? কারণ, দারিদ্র প্রকৃতপক্ষে শুধু অর্থাভাব বা সম্পদের অভাব নয়, দারিদ্র ক্ষমতার অভাবও বটে”।

রায় লিখেছেন, “দরিদ্র আর ক্ষমতাহীনদের যুদ্ধ হলো নিজেদের অধিকার পুনরায় দাবি করা, পরিত্যাগ করা নয়। ডক্টর যেখানে আরও স্থায়ী একটা সমাধান খুঁজছিলেন, সেখানে সেইন্ট পুরো ভারত সফর করে মানসিক আশ্বাস বিতরণ করেছেন”।

তিনি আরও বলেছেন: “ইতিহাস আম্বেদকারের প্রতি দয়ালু হয়নি। প্রথমে তাকে সীমিত করে দিয়েছে, এরপর তার গুণকীর্তণ করেছে। ইতিহাস তাকে ভারতের অস্পৃশ্যদের নেতা বানিয়ে দিয়েছে, বস্তির রাজা বানিয়েছে। এ কারণে তার লেখাগুলো আড়ালে পড়ে গেছে। তার মৌলিক বুদ্ধিমত্তা আর সীমাহীন গর্বের বিষয়টি কেড়ে নেয়া হয়েছে। সংবিধানকে দমনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা একটি বিষয়। কিন্তু এটার দ্বারা সীমিত হয়ে পড়াটা অন্য বিষয়। আম্বেদকারের পরিস্থিতি তাকে বিপ্লবী হতে বাধ্য করেছে এবং একই সাথে যখনই সুযোগ পেয়েছেন ক্ষমতার দোরগোড়ায় পা-ও দিতে হয়েছে তাকে। তার অসামান্যতা এখানেই যে, তিনি এই দুটোকেই একসাথে ধারণ করতে পেরেছেন, এবং সেটা করেছেন কার্যকরভাবে”।

“বর্তমানের চশমা দিয়ে দেখলে অবশ্য এটা মনে হয় যে তিনি পেছনে একটা দ্বৈত এবং কখনও বিভ্রান্তিকর উত্তরাধীকার রেখে গেছেন: মৌলবাদী আম্বেদকার, এবং ভারতের সংবিধানের পিতা আম্বেদকার। বিপ্লবের পথে সংবিধানের বিষয়টি আসতে পারে। আর দলিতের বিপ্লব এখনও সম্পন্ন হয়নি। আমরা এখনও এর অপেক্ষায় আছি। এর আগ পর্যন্ত আর কিছু হতে পারে না, ভারতে নয়”।

বিগত ৭১ বছর ধরে, ভারতের ‘বহুত্ববাদী’ সমাজে গান্ধী একটা আইকন চরিত্র হয়ে আছেন। প্রায় সকল অহিংস বিক্ষোভেরই কেন্দ্রীয় প্রতীক হয়ে গেছেন তিনি। তবে, বর্তমানে যে বিক্ষোভের ধারা চলছে, সেখানে অতীতের এই চর্চা অনুসরণের ব্যাপারটি যেন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। অনেকের হিসেবে, ভারত সূক্ষ্মভাবে এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে ভারত তার ক্ষতের চিকিৎসার জন্য একটা ডাক্তারের তীব্র আকাঙ্ক্ষা করছে, কোন সন্তুর রহস্য আর পুরাণ মিশ্রিত শ্লোকের মধ্যে আশ্বাসবাণী খুঁজছে নাতারা। 

তাসকিন বললেন: “এটা নতুন ভারত, যেটা ইতিহাসে সমৃদ্ধ হয়ে আছে। ভারতের জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশের বেশি এখন ৩৫ বছরের কম বয়সী যুবক। জনসংখ্যার এই অংশ নিজেদেরকে আম্বেদকারের আধুনিক ধারণার সাথে বেশি মেলাতে পারে, গান্ধীর বিশ্বাসের সাথে ততটা পারে না, কারণ আগের প্রজন্মের মানুষেরা গান্ধীকে এমন একটা উচ্চ বেদীতে বসিয়ে রেখেছেন, যেখানে অন্য কেউ পৌঁছানোর কথা ভাবতে পারে না”।

তাসকিনের মতে, বিশৃঙ্খলা যখন সবকিছুকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে, নতুন ভারত তখনই কেবল আম্বেদকারের গুরুত্ব, তার সমতা, ন্যায়বিচার আর সাম্যতার সংগ্রামকে বুঝতে পারবে। 

তাসকিনের কয়েক সারি পেছনেই আছেন ৫২ বছর বয়সি নারী শাহিদা বানু। গৃহিনী বানু তিন সন্তানের জননী এবং তার বড় ছেলে পড়ছে ১২তম ক্লাসে। তার কোলেও আম্বেদকারের ছবি। তার বিশ্বাসও তাসকিনের মতো একই রকম। 

তার মতে, আজকের ভারতের চেয়ে আর কখনও আম্বেদকার এতটা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেননি যখন ধর্মের নামে ভারতকে টুকরো টুকরো করা হচ্ছে। 

“যদি আম্বেদকার না হন, তাহলে কে? আপনি যদি প্রধান মঞ্চের দিকে যান, দেখবেন সেখানে ভগত সিং, বিসমিল, এমন গান্ধীজির মতো সকল মুক্তিযোদ্ধার ছবি রয়েছে। কিন্তু সকলের উপরে হলো বাবাসাহেবের ছবি। তিনি ছিলেন ভারতের আত্মার প্রকৃত রক্ষাকারী এবং একমাত্র তার প্রণীত সংবিধানই ভারতের বঞ্চিত এবং বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠির জন্য সুরক্ষা দিয়েছে। বর্তমান সময়ের সে ঘূর্ণি প্লাবণ, সেখান থেকে একমাত্র তিনিই সুরক্ষা দিতে পারেন”। বললেন গুজরাটের অধিকার কর্মী বানো প্রাভিন মিশ্র। তিনি বললেন, এবারই প্রথমবারের মতো আম্বেদকারের উপস্থিতি এতটা প্রবল এবং জোরালো হয়ে উঠেছে। 

মিশ্র বলেন, “আম্বেদকার কখনও জনমানুষের কথার মধ্যে এতটা প্রাধান্য পাননি, আজ যেটা হচ্ছে। এর অর্থ হলো আজকের ভারত অন্য যে কোন নেতার চেয়ে তার মাধ্যমে নিজেদেরকে চিহ্নিত করতে পারছে। একই সাথে গান্ধীজির গুরুত্বটাও পুরোপুরি চলে যায়নি। তিনিও যথেষ্ট শ্রদ্ধার জায়গায় আছেন এবং ভারতের সেক্যুলার বৈশিষ্ট্যের জায়গাতে তারও অংশ রয়েছে”।

ব্যবসায়ী সিরিজ মুনির – যিনি গত ১৫ দিন ধরে বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন, তিনি আম্বেদকারকে একমাত্র নেতা হিসেবে উল্লেখ করলেন, যিনি একটা কম্পাসের মতো, এবং দেশকে যিনি সঠিক পথের দিশা দিতে পারেন। 

মুনির বলেন, “একমাত্র তিনিই ভারতের সমাজকে এতটা ভালোভাবে বুঝেছিলেন যে, সাত দশক আগে সংবিধানের যে ভূমিকা তিনি লিখেছিলেন, সেটা আজও ভারতকে পথ দেখাচ্ছে। ভারত একমাত্র তখনই টিকে থাকবে যখন এর সংবিধান পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে। এটাকে বদলানোর চেষ্টা করা হলে চরম আগুন জ্বলে উঠবে। এ কারণেই আম্বেদকার আবার জীবিত হয়ে উঠেছেন। মনে হচ্ছে তিনি আর কখনও মরবেন না এবং আগামীর বহু প্রজন্মের জন্য তিনি বেঁচে থাকবেন”।