আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

স্বাধানীতা দিবস উদযাপন করছে ভারত-কেমন স্বাধীনতা?

sunday special

কাশ্মীরে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মাত্র কিছুক্ষণ আগে নিহত পিতামহের বুকের উপর এক ছোট্ট শিশুর বসে থাকার ছবি কারো মন-মমন থেকে সহজে মুছে যাওয়ার নয়। কাশ্মীরী তরুণী ও শিশুদের রক্তমাখা সুন্দর মুখ, পেলেট গানের বুলেটে বিদ্ধ লোকজন, শুধু চরম বেদনা ও আতঙ্কেই পূর্ণ থাকতে পারে। প্রাচীন মসজিদ—বাবরি মসজিদ গুড়িয়ে দিয়ে তার জায়গায় হিন্দুদের রাম মন্দির নির্মাণের বিরুদ্ধে কোনরকম প্রতিবাদ, এমন কি হতাশা প্রকাশেরও সাহস নেই মুসলমানদের। উত্তরপূর্ব ভারতে বাংলাভাষী জনগণ নিজেদের মাতৃভূমি থেকে উচ্ছেদের হুমকি পেয়ে থর থর করে কাঁপছে। ভারতের রাজধানী, অভিজাত দিল্লীতে, নারীরা পর্যন্ত ধর্ষিতা হওয়ার আশঙ্কায় বাসে চড়তে ভয় পায়। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর এই দিল্লী।

এরই মধ্যে স্বাধীনতা উদযাপন করছে ভারত।

কেমন স্বাধীনতা? এটা কি স্বাধীনতা?

এটা কি স্বাধীনতা যেখানে মিডিয়ার গলা টিপে ধরা হয়েছে অথবা অনুগত বা মোদির মেশিন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে? যেখানে রাস্তায় নারীর নিরাপত্তা নেই? যেখানে কোন পুরুষ যদি অবিচারের প্রতিবাদ করে তাহলে তাকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়?

অবশ্যই না।

ভারত যদি সত্যিকারের স্বাধীনতা উদযাপন করতো তাহলে এর দারিদ্রপীড়িত রাজ্যগুলোর নাগরিকরা কি বাংলাদেশে যোগ দিতে চাইতো, যেখানে তারা কিছুটা উন্নয়নের ছটা দেখতে পায়? কাশ্মীর কি তার রাজ্য মর্যাদা হারিয়ে দিনের পর দিন রক্তে হাবুডুবু খেতো? কোভিডের জন্য মুসলমানদের উপর দায় চাপানো হতো, নিম্নবর্ণের হিন্দুরা এখনো অচ্ছুৎ বিবেচিত হতো?

এই হলো ভারত। এই সেই ভারত যে তার স্বাধীনতার ৭৩ বছর উদযাপন করছে।

ভারতে এখনো রিপোর্টার ও অন্যান্য ভিন্নমতাবলম্বী কণ্ঠের জন্য নিপীড়নের ক্রমবর্ধমান ভয়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের প্রেস ফ্রিডম সূচকে ২০১৫ সালের ১৩৬তম থেকে ভারতের অবস্থান ২০২০ সালে ১৪২তম স্থানে নেমে গেছে। মাত্র ৫ বছরে এই অবনতি।

এটা স্বাধীনতা নয়।

ব্যবসায়, অর্থনীতি, আইটি, শিল্পকলা ও সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা ভারতের গর্বিত জনগণ আগ্রহ ভরে অপেক্ষা করছিলো প্রতিদেশীদের নেতা হওয়ার জন্য। তারা চেয়েছিলো দক্ষিণ এশিয়ার দৃশ্যপটে ভারত হবে দক্ষিণ এশিয়ার বড় ভাই, উৎপীড়কের মতো বড় ভাই নয়। তাদের কাছে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের মানে ছিলো এটাই।

এর বদলে নেতা, রাজনীতিক ও সরকারযন্ত্র তাদেরকে নীচে টেনে নামিয়েছে। লজ্জা ও ঘৃণায় তাদের মাথা হেট হয়ে গেছে, যখন তারা দেখছে আঞ্চলিক সম্পর্কে অগ্রগতি না হয়ে অধোগতি সৃষ্টি হয়েছে।

তারা ‘আমান কি আশা’ বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলো। ‘শান্তির আশা’য় উদ্যোগ নিয়েছিলো দুটি মিডিয়া হাউজ—পাকিস্তানের জং গ্রুপ ও ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া। সেই উদ্যোগ বাতাসে মিলিয়ে গেছে এবং দিব্যি দেয়া শত্রুরা তেমন শত্রুই থেকে গেছে। কারণ ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন লোকরঞ্জনবাদী নেতারা গেরুয়া কুজ্ঝটিকা ভেদ করে কিছু দেখতে পাননা।

জনগণ সমস্যা নয়। জনগণ এখনো সমস্যা নয়। শাহরুখ খানকে দেখে পাকিস্তানিরা যখন হাসে, তখন ফাওয়াদ খানকে দেখে ভারতীয়রা বেহুঁশ হয়ে যায়। সঙ্গীতের দুনিয়ায় ভারতীয়রা রাহাত ফতেহ আলী খান, আতিফ আসলাম, জুনুন, রক ব্যান্ড স্ট্রিং, আলি জাফরের জন্য দেহ-মন উজার করে দেয়। অতীতে নুর জাহান, মেহেদি হাসান, গুলাম আলী ও নাজিয়া হাসানের জন্যও তারা এমন ব্যাকুল ছিলো। কিন্তু রাজনীতিকরা এসে তাদের থামিয়ে দিলো। পাকিস্তানী শিল্পীদের ভারতে নিষিদ্ধ করা হলো। ‘ক্ষতি হয়েছে আমাদের’, আক্ষেপ করে বললেন দিল্লীর এক তরুণ সঙ্গীতভক্ত, ‘সঙ্গীত, শিল্পকলা, সংস্কৃতির কোন সীমানা নেই।’

 আসলে ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোর সংস্কৃতি ও জনগণের মধ্যে টেলিভিশন সংস্কৃতিতে বেশ কার্যকরভাবে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছিলো, যেখানে মুখরা শাশুড়ির কারণে বউয়েরা তাদের স্বামীর মন জয় করতে নতুন বাড়িতে দাসী-বান্দির মতো থাকে, সবটুকু শুধু ভুল বুঝাবুঝি এবং চাকচিক্যময় গ্লামারে পূর্ণ। তবে কোভিডের মওসুমে নেটফ্লিক্স, ইউটিউব ও ওয়েব ফ্লিমের বিস্তার ঘটায় মনে হচ্ছে ভারত সেই একচেটিয়া জায়গাটি হারিয়েছে। কেউ এ কথা অস্বীকার করলে, ইউটিউবে পাকিস্তানী ড্রামা সিরিয়ালগুলোর কমেন্টগুলো পড়ুন। দেখবেন সেখানে বেশিরভাগ ফ্যান ভারতীয়, সেখানে পাকিস্তানী সিরিয়ালগুলোর জন্য প্রশংসা, আর নিজেদেরগুলোর জন্য কটু মন্তব্যে ভর্তি।

পরিসংখ্যান যখন তাদের চশমার সামনে হাজির করা হয়, সূচক টেনে বের করা হয়, তারা খুশি হয় না। তারা অনুকম্পার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের দিকে তাকায়। অথচ এই দেশটিও এখন প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়ে শিক্ষা, প্রাণঘাতি রোগের প্রতিষেধক, এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যান্য সূচকে তাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে।

জনগণ এই ভারত চায়নি। তারা চেয়েছিলো নেপাল তাদের বন্ধু হবে, বেপরোয়া প্রতিবেশী হবে না, যে কিনা তাদের মানচিত্র নতুন করে এঁকেছে, আর ভারত শুধু চেয়ে দেখছে।

ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা চীন যখন বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কাসহ সব প্রতিবেশী এবং এর বাইরের দেশগুলোর মন জয় করতে ব্যস্ত তখন দীপ্তি হারাচ্ছে ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’।

বাগাড়ম্বরতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, মেকি-গণতন্ত্র নিয়ে একটি দেশ কতদিন টিকে থাকতে পারে? নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র নামে ডাকলেই সে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র হয়ে যায় না। গণতন্ত্র কোন বুলি নয়, এটা হলো মুক্তি, অধিকার, পছন্দ ও স্বাধীনতা।

তাই ভারত যখন স্বাধীনতা বার্ষিকী উদযাপন করছে, তখন দেশটির জনগণ এক মুহূর্তের জন্য হলেও ভাবছে স্বাধীনতা যাকে বলে এগুলোই কি সেই?

কাশ্মীরীরা স্বাধীনতা চায়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজগুলোকে বলপ্রয়োগ করে দমিয়ে রাখা হয়েছে। তাই বলে তাদের মধ্যে কি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নেই, যেখানে তাদের সম্পদ তাদেরই উন্নয়নের কাজে লাগবে, দিল্লীতে পাচার হয়ে যাবে না?

জনগণ শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুখের সঙ্গে বাঁচতে চায়, যেগুলোর প্রতিশ্রুতি তাদের দেয়া হয়েছিলো। তাদের মধ্যে যারা অনেক বেশি হকিশ, ভারত পরাশক্তি হবে বলে যাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তারাও বুঝতে পেরেছে যে পরাশক্তি হতে গেলে শক্তির চেয়েও বেশি কিছু প্রয়োজন। মার্ভেল কমিক সুপার হিরো স্পাইডারম্যানের ভাষায়: ‘মহা শক্তির সঙ্গে মহা দায়িত্বও আসে।’ আর, মোদি মেশিনের ব্যর্থতা এখানেই।