আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

প্লাস্টিক বর্জের বিনিময়ে গরম গরম খাবার

গত বছর তামিল নাড়ু রাজ্যের মামাল্লামপুরমে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি সেখানকার সমুদ্র সৈকতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পরিত্যাক্ত প্লাস্টিক সামগ্রী কুড়ানোর ছবি ব্যাপকভাবে গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিলো। কিন্তু তারও অনেক আগে ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে পশ্চিম বঙ্গ রাজ্যের শিলিগুড়িতে গুটি কয়েক মানুষ ‘প্লাস্টিক পার প্রাহার’ বা ‘প্লাস্টিকের বিনিময়ে খাদ্য’ নামে এক দাতব্য কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন।

‘প্লাস্টিকের বিনিময়ে খাদ্য’ প্রকল্পের কার্যক্রম খুবই সাদামাটা, মাত্র পাঁচ রুপির বিনিময়ে পুষ্টিকর নিরামিষ খাবার সরবরাহ। প্রকল্প পরিচালনার ২৫ সদস্যের কমিটির একজন এস সি সিং সালুজা বলেন, এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যায়। একটি হলো দারিদ্র বিমোচনা, আর দ্বিতীয়টি রাস্তা, ড্রেন, নদী ও অন্যান্য জলাশয়কে প্লাস্টিকের বর্জ থেকে মুক্ত করা।

মোদির প্লাস্টিক বর্জ্য কুড়ানো ছিলো পিআর কার্যক্রম। টিভি চ্যানেলে, পত্র-পত্রিকায় প্রচারের জন্য সেটা করা হয়। কিন্তু শিলিগুড়ির কার্যক্রম তেমন কিছু নয়। এর পরিচালনার সঙ্গে রয়েছেন গিথলস মেমরিয়াল স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। এটি দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠিত অন্যতম পুরনো ইংলিশ মিডিয়াম আবাসিক স্কুল। শিখ সংগঠন নিস্কাম, খালসা সেওয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তারা এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

প্রথমে এই প্রকল্প চালু হয় প্রতি শনিবার শিলিগুড়ির দরিদ্রদের মাঝে বিনামূল্যে একবেলা খাবার বিতরণের মাধ্যমে। প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের বিষয়টি পরবর্তীতে যুক্ত হয়। এতে বলা হয়, কেউ ৫০০ গ্রাম প্লাস্টিক বর্জ্য এনে দিলে তাকে মাত্র ৫ রুপিতে ভাত, ডাল, সব্জি, সালাদ ও মিষ্টি খেতে দেয়া হবে।

এই প্রকল্পের আওতায় গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ জন খাবার খায়। সংগৃহিত প্লাস্টিক বর্জ্য প্যাক করে একটি রিসাইকেল প্লান্টে পাঠানো হয়। 

শিলিগুড়ির শীর্ষস্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী ও গিথলসের প্রাক্তন ছাত্র সালুজা বলেন, আমাদের শহরকে সাহায্য করতে আমরা এই প্রকল্প নিয়েছি। ভারতের অন্যান্য শহরের মতোই এর পার্বত্য এলাকা জঞ্জালের সঙ্গে লড়াই করছে। 

তিনি বলেন, ব্যবসা কেন্দ্র ও কলকাতার পর পশ্চিম বঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, ৭ মিলিয়ন জনসংখ্যা অধ্যুষিত শিলিগুড়িকে প্লাস্টিকের বর্জ্যমুক্ত করার জন্য জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

গরীর মানুষকে খাওয়ানোর ধারণাটি এসেছে সালুজার শিখ ধর্ম থেকে। শিখদের গুরুদুয়ারাগুলোতে লঙ্গর নামে রান্নাঘরে বিনামূল্যে খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। যেকেউ গুরুদুয়ার লঙ্গরে গিয়ে বিনামূল্যে খেতে পারে। 

সাম্প্রতিক সময়ে আরো উদ্ভাবনী বিষয় যোগ হয়েছে। সাউথ এশিয়ান মনিটরকে সালুজা বলেন, আমরা একটি নতুন প্রস্তাব যোগ করেছি। কেউ যদি এক কিলো প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে আসে তাহলে সে বিনামূল্যে খাবার খাওয়া ছাড়াও এক কিলো চাল পাবে।

২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ২৪ হাজারের বেশি মানুষকে খাওয়ানো হয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলো কিভাবে ক্ষুধার মোকাবেলা করছে সে বিষয়ে সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে ভারতের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে (জিএইচআই) ভারতের অবস্থান ১০২তম। ১১৭টি দেশকে নিয়ে এই সূচক তৈরি করা হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের অবস্থান সবচেয়ে নিচে। বাকি দেশগুলোর অবস্থান ৬৬ থেকে ৯৪ এর মধ্যে। ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যেও ভারত সবচেয়ে পেছনে। ভারতের উপরে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান ৫৯তম।

ক্ষুধা সূচকে ভারতে ক্ষুধার মাত্রা গুরুতর বলে উল্লেখ করা হয়। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউট (আইএফপিআরআই), ওয়েলথহাঙ্গারফিলফ ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে এই রিপোর্ট তৈরি করে। 

একেবারে বিনামূল্যে খাবার না দিয়ে ৫ রুপি নেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে সালুজা বলেন যে লঙ্গরখানায় আসতে মানুষ ইতস্তত করে। খাওয়ার পর অর্থ পরিশোধ তাদের মধ্যে এক ধরনের মর্যাদাবোধ তৈরি করে।

সালূজা বলেন, স্কুলের শতবর্ষ পুর্তি উপলক্ষে আমরা প্রাক্তন ছাত্রদের এই সমিতি গঠন করি। আমরা দাতব্য কাজ শুরু করি। এর মধ্যে বন্যা ও ভূমিধসের সময় ত্রাণ কার্যক্রমও রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে মানুষকে খাবার খাওতে গিয়ে আমরা দেখি যে পানি খেয়ে প্লাস্টিকের গ্লাস যেখানে সেখানে ফেলে দেয়া হচ্ছে। তখনই নগরীকে প্লাস্টিক-মুক্ত করার পরিকল্পনা আমাদের মাথায় আসে এবং পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন করার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা শুরু হয়।

ভারতে প্রতিদিন ২৫,০০০ টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে প্রতিদিন ১০,০০০ টনের বেশি সংগ্রহহীন অবস্থায় থেকে যায়।