আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

সরকারের বিরুদ্ধে লেখাই কাল হয়েছে: সম্পাদক, কাশ্মীর টাইমস

SAM SPECIAL-ENG-27-10-2020 (1)

কাশ্মীরের সুবিদিত সংবাদপত্রগুলোর একটি কাশ্মীর টাইমস’র অফিস চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে সিল করে দেয়া হয়েছে। কেন সেটা সিল করা হয়েছে, সেটা জানেন না পত্রিকাটির সম্পাদক অনুরাধা ভাসিন। গত ৬৬ বছর ধরে পত্রিকাটির কঠিন যাত্রাপথ নিয়ে সাউথ এশিয়ান মনিটর’র সাথে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাতকারের সারাংশ এখানে তুলে ধরা হলো:

সাউথ এশিয়ান মনিটর (এসএএম): ঠিক কি ঘটেছিল?

অনুরাধা ভাসিন (এবি): এস্টেট ডিপার্টমেন্টের লোকেরা এসে অফিস সিল করে দেয়। আমাদের কর্মীরা তখন ভিতরে কাজ করছিল। তারা লিখিত আদেশ দেখতে চায় কিন্তু সেটা তারা দেখাতে পারেনি। প্রেস এনক্লেভে (লাল চক) সবগুলো সংবাদপত্রের অফিস (এক ডজনের বেশি) অবস্থিত, আর সেটা হলো সরকারের অধীনে। তাই, সরকার যদি কাউকে সরিয়ে দিতে চায়, তাকে আগে নোটিশ দিতে হবে এবং জবাব দেয়ার সময় দিতে হবে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটা এখানে মানা হয়নি। তাছাড়া আমাদেরকে উঠিয়ে দেয়া হতে পারে, এ রকম গুজবের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আদালতে গিয়েছিলাম এবং এ বিষয়ে আদালত স্থগিতাদেশ দেয়, যদিও তখনও আমরা স্থগিতাদেশ হাতে পাইনি। ১৯ তারিখে স্থগিতাদেশ দেয় আদালত, সেদিনই অফিস সিল করে দেয়া হয়। বুধবার আমাদেরকে এটা দেয়া হয়। আমরা স্থগিতাদেশ নিয়ে এস্টেট ডিপার্টমেন্টে গেলে তারা জানায় যে, সিল তারা সরিয়ে নেবে, কিন্তু সেটা তারা করেনি।

এসএএম: আর কোন পত্রিকার অফিস কি সিল করা হয়েছে?

এবি: আমি শুনেছি যে, কাশ্মীর নিউজ সার্ভিস (কেএনএস)’র অফিসও সিল করা হয়েছে। 

এসএএম: কেন এই সিল করা হলো, আপনার কি মনে হচ্ছে?

এবি: আমি জানি না। সম্ভবত আমরা সবসময় সরকারের বিরুদ্ধে লিখে আসছি বলে। 

এসএএম: আপনার বাবা বেদ ভাসিন পত্রিকাটি শুরু করেছিলেন। সেটা কোন বছর ছিল?

এবি: সেটা ছিল ১৯৫৪ সাল। তখন এটা সাপ্তাহিক ছিল। ১৯৬২ সালে এটাকে দৈনিকে রূপান্তরিত করা হয়। 

এসএএম: মি. ভাসিন তো সবসময় সাংবাদিক ছিলেন…

এবি: হ্যাঁ, তা ছিলেন। ১৯৪৭ সালের আগে অল্প সময়ের জন্য রাজনীতিতে জড়িয়েছিলেন তিনি এবং নয়া সমাজ নামে একটি উর্দু সংবাদপত্রও চালু করেছিলেন, যেটা ১৯৫৩ সালে নিষিদ্ধ করা হয়। তিনি শেখ আব্দুল্লাহর গ্রেফতারের সমালোচনা করেছিলেন এবং নয়াদিল্লীর হস্তক্ষেপের বিরোধী ছিলেন। ওই পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করার পর নতুন পত্রিকা শুরুর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সেটা হলো কাশ্মীর টাইমস। সে কারণে বলা হয়, কাশ্মীর টাইমস’র যাত্রা শুরুর আগে থেকেই এটাকে সংগ্রামের ভেতর দিয়ে আসতে হয়েছে। আমার বাবাকে শ্রীনগরেও আরেকটি নতুন সংবাদপত্রের ঘোষণা দেয়ার অনুমতি দেয়া হয় এবং সেটাকে আরেকজনের নামে দেয়ার জন্য তাকে জম্মু যেতে হয়েছিল। এই কারণেই এক পর্যায়ে তিনি শ্রীনগর থেকে জম্মুতে চলে আসেন। 

এসএএম: শ্রীনগরে পত্রিকাটির মুদ্রণ শুরু হয়েছিল আরও পরে…

এবি: হ্যাঁ, ২০০৯ সালে। কিন্তু আমরা ১৯৯৪ সালে এই ভবনে আসি, যেটা সিল করা ছিল। জম্মু থেকে সড়কে পত্রিকাটি আগে এখানে আসতো এবং এই অফিস থেকে সেটা সাজিয়ে বিলি করা হতো। কিন্তু এটা ছিল তৃতীয় ভবন। যেটা সিল করে দেয়া হলো, সেটার আগে আরও দুটো ভবনে ছিলাম আমরা। 

এসএএম: এটা কি আগে কখনও সিল করা হয়েছে?

এবি: না। তবে বেশ কয়েকবার বেশ কিছু কারণে মুদ্রণ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য পত্রিকাগুলোও কারফিউ, বিক্ষোভ বিভিন্ন কারণে প্রকাশিত হতে পারেনি। এরপর ২০১৯ সালে জম্মু আর শ্রীনগরের ভেতরে যোগাযোগ করা যায়নি, কারণ ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়, তখন এখান থেকে পত্রিকা মুদ্রিত হতে পারেনি। 

এসএএম: এখন সরকার যেহেতু আপনার অফিস সিল করে দিয়েছে, সেখানে প্রশ্ন হলো কাশ্মীরে এখন সরকারটা কে?

এবি: আমি জানি না, এটা চিহ্নিত করাটা কঠিন। তবে লে. গভর্নর এখন প্রশাসন চালাচ্ছেন। কিন্তু বিগত কয়েক দিনে যখনই আমরা জিজ্ঞাসা করেছি যে, কে আমাদের অফিস সিল করার নির্দেশ দিয়েছে, তারা জবাব দিয়েছে যে, ‘উচ্চ পর্যায়’ থেকে এই আদেশ এসেছে। আমরা জানি না যে, কতটা উচ্চ পর্যায় থেকে সেটা এসেছে। আমরা জানি না, কে এটা নির্ধারণ করছে যে, কাকে টার্গেট করা হবে… 

এসএএম: না কি দিল্লী থেকে এই আদেশ এসেছে…

এবি: সেটাও বলতে পারবো না…

এসএএম: কাশ্মীরের সাধারণ পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার কি মনে হয়? গত বছরের চেয়ে এখন পরিস্থিতি কি ভালো না কি লেখা বা বলার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে… সাংবাদিক ও পত্রিকার জন্য স্বাধীনতা আরও সঙ্কুচিত হয়েছে?

এবি: গত বছর যেটা হয়েছে, সেটা হলো লজিস্টিক্সে বাধা সৃষ্টি করা হয়। যোগাযোগ নিষিদ্ধ করা হয় এবং সবাইকেই মুদ্রণ কমিয়ে আনতে হয়… পাতার সংখ্যা কমিয়ে আনতে হয়। যোগাযোগ বন্ধ থাকার কারণে তথ্যও পাওয়া যাচ্ছিল না। এরপর, সাংবাদিকদের মিডিয়া অফিসের বাইরে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এতে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। কারণ সেখানে কাজ করার সময় সাংবাদিকরা অনুভব করেছেন যে, তাদের কাজের উপর নজরদারি হচ্ছে। তাছাড়া, সাংবাদিকরা পুরোপুরি চলাফেরাও করতে পারেনি, মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত ছিল এবং কথা বলতে আগ্রহী ছিল না। কর্মকর্তারাও কথা বলতে চাইতো না। সাংবাদিকদেরকে পেটানো হয়েছে, ভিডিও ডিলিট করে দেয়া হয়েছে। 

এখন অবস্থা অন্য রকম। যোগাযোগের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে, যদিও ইন্টারনেট পুরোপুরি সক্রিয় করা হয়নি, এবং নতুন ভয় এখানে যুক্ত হয়েছে। পুলিশ প্রায়ই সাংবাদিকদেরকে তলব করছে, তাদেরকে চাপ দিচ্ছে, দুর্ব্যবহার করছে, হয়রানি করছে ও হুমকি দিচ্ছে। এখন একটা অঘোষিত সেন্সরশিপ কাজ করছে। অন-দ্য-গ্রাউণ্ড রিপোর্টিংয়ের কারণে অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। 

এসএএম: এরপর মিডিয়া পলিসির বিষয়ও তো রয়েছে…

এবি: হ্যাঁ, জুন মাসে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের জন্য আরেকটি কঠোর নিয়ম ইস্যু করা হয়, যেটা সার্বক্ষণিক আতঙ্কের মতো ঝুলছে। এটা অনুসারে, যে কোন তথ্য বিভাগের কর্মকর্তা যে কোন পেশাদার, বিশেষজ্ঞ গ্রুপের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যে কোনটি ভুয়া সংবাদ আর কোনটি দেশবিরোধী। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এটার অপব্যবহার করা হবে। ভুয়া সংবাদ বা দেশবিরোধী বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়, কিন্তু কোনটা ভুয়া খবর, সেই সিদ্ধান্ত সরকারের কর্মকর্তারা নিতে পারেন না। তারা সবসময় নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে যাতে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা হলেই সেটাকে দেশবিরোধী আখ্যা দেয়া যায়। যে সব সাংবাদিক পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করছে, খুব সম্ভবত তাদের বিরুদ্ধেই এই নীতিকে ব্যবহার করা হবে। 

এসএএম: পরিস্থিতির তাহলে আরও অবনতি হয়েছে?

এবি: হ্যাঁ, অবনতি হয়েছে। সাংবাদিকরা তার পরও তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টাটা চালিয়ে যাচ্ছে। 

এসএএম: কিভাবে তারা চেষ্টা চালাচ্ছে?

এবি: যতটা পারা যায় মাঠ পর্যায় থেকে রিপোর্ট করার চেষ্টা করছে তারা। প্রতি এক বা দুই দিন পরপরই আমরা শুনছি যে, সাংবাদিকদের আটক করা হয়েছে। দ্য প্রিন্ট সম্প্রতি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে যে, ১৮ জন সাংবাদিককে সম্প্রতি তলব করা হয়েছে। 

এসএএম: সবচেয়ে বেশি চাপটা কাদের উপরে – স্থানীয়, জাতীয় না কি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাংবাদিকদের উপর?

এবি: স্থানীয় মিডিয়ার উপর। তাদের উপর চাপটা বেশি যাতে স্থানীয় জনগণের কাছে কিছুই যেতে না পারে। 

এসএএম: ভারতীয় মিডিয়ার কাছ থেকে কোন সহায়তা কি আপনি পেয়েছেন?

এবি: হ্যাঁ। অনেক সমর্থন পেয়েছি। কাশ্মীরী, অকাশ্মীরী অনেকেই ফোন করে সংহতি জানিয়েছেন। অনেকেই বলেছেন, আমরা তাদের লেখা বিনামূল্যে ছাপতে পারি এবং অনেকেই এমনকি বিনা বেতনে কাজ করার আগ্রহের কথাও বলেছেন। ভারতীয় মিডিয়া সংবাদগুলো প্রকাশ করেছে এবং সার্বিকভাবে ভালো সমর্থন পেয়েছি। 

এসএএম: এখন আপনার পরিকল্পনা কি?

এবি: আমরা আইনিভাবে এই সিল করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়বো এবং অন্যান্য সুযোগও খুঁজবো। এ রকম একটা সময়ে, আমাদেরকে গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে – কিভাবে আমরা সরকার বা কর্পোরেট খাতের উপর নির্ভরতা কমিয়ে আমাদের পত্রিকা চালাতে পারি। রাজস্বের বিকল্প উৎস আমাদেরকে খুঁজে দেখতে হবে। আমরা সেটা করার চেষ্টা করছি।