আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি কাজে লাগাতে হবে

বিশেষ সাক্ষাতকারে শ্রীলঙ্কার ডেইলি এফটি’র সম্পাদক নিস্তার কাসিম

নিস্তার কাসিম

নিস্তার কাসিম শ্রীলঙ্কার ইংরেজিভাষী সংবাদপত্র ডেইলি ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং ডেইলি মিররের সাবেক প্রধান সম্পাদক। শ্রীলঙ্কার মিডিয়া জগতে তিনি অর্থনৈতিক ও করপোরেট বিশেষজ্ঞ হিসেবে অত্যন্ত খ্যাতিমান। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে অর্থনৈতিক সাংবাদিকতার এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছেন তিনি।

সাউথ এশিয়ান মনিটর’র সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাতকারে নিস্তার কাসিম শ্রীলঙ্কার বর্তমান ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিশ্ব অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাব এবং আগামী ২৫ এপ্রিল শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিতব্য পার্লামেন্ট নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছেন:

সাউথ এশিয়ান মনিটর (এসএএম): শ্রীলঙ্কার বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

নিস্তার কাসিম (এনসি): বিনিয়োগ ও ব্যবাসায়িক পরিবেশ উন্নত করা ও অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সরকার বেশ কিছু কর হ্রাস ও নীতিগত সংস্কার সাধন করেছে। চলতি ধারণা হলো, যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, তাতে অর্থনীতি টিকে থাকার মতো অক্সিজেন পাবে, কিন্তু দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার দম পাবে না। এর কারণ হলো ২০১৫ সাল থেকেই বেসরকারি খাত মন্থরতা ও নিম্ন প্রবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নীতিগতভাবে বলা যায়, বেসরকারি খাত ও বিনিয়োকারী সম্প্রদায় ২৫ এপ্রিলের নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। তাছাড়া বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবও স্থানীয় ব্যবসায়িক ভাবাবেগের রাশ টেনে ধরেছে।

এসএএম: করোনা ভাইরাসের ফলে বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ান ও বৈশ্বিক অর্থনীতি কতটুকু প্রভাবিত হবে বলে আপনি মনে করেন?

এনসি: প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, মহামারিটি ছড়িয়ে পড়ছে। শুক্রবার রেটিং এজেন্সি স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওর্স জানিয়েছে যে করোনাভাইরাসের কারণে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অর্থনীতিতে মোট ২১১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হবে। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক জানিয়েছে, মহামারিটির ফলে বৈশ্বিক জিডিপি ০.১ ভাগ থেকে ০.৪ ভাগ হ্রাস পেতে পারে। আর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৭৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৪৭ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। মহামারিটির প্রাদুর্ভাব অনুযায়ী, প্রভাব আরো বেশি হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আমদানি-রফতানির ওপর নির্ভরশীল এবং বিমান ভ্রমণসহ সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্নতা সৃষ্টি হবে। অবশ্য দক্ষিণ এশিয়ার সরকারগুলোর প্রয়োজন ঘরোয়া অর্থনীতির সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা কিংবা করোনা সঙ্কটকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে সহজাত দুর্বলতাগুলো দ্রুত সমাধান করা ও ঘরোয়া অর্থনীতি, স্থানীয় উৎপাদনকে চাঙ্গা করা।

এসএএম: শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি চীনের ওপর যেভাবে নির্ভরশীল, তার আলোকে প্রশ্ন হতে পারে, দীর্ঘ  ও স্বল্প মেয়াদে এটি কী প্রভাব বিস্তার করতে পারে?

এনসি: চীনকে বিবেচনা করা হয় বিশ্বের কারখানা হিসেবে এবং যৌক্তিকভাবেই তা শ্রীলঙ্কার বৃহত্তম আমদানির উৎস। চীন দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্যটক সৃষ্টিকারী বাজার ও বড় বিনিয়োগকারী, শ্রীলঙ্কার অন্যতম অবকাঠামো নির্মাতা। করোনা ভাইরাসের সরাসরি প্রভাবে ফেব্রুয়ারিতে চীন থেকে শ্রীলঙ্কায় পর্যটক আগমন ৯২ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। ৮ বছরের মধ্যে চীন এই প্রথম শ্রীলঙ্কার ১০ পর্যটন উৎসের অন্যতম থাকার কৃতিত্ব হারাল। চীন থেকে আমদানি হ্রাস পাওয়ায় চীনা কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল শ্রীলঙ্কার রফতানির ওপর প্রভাব ফেলছে। নির্মাণ খাতও প্রভাবিত হয়েছে। এমনকি ছোট মাত্রার আমদানি ও ব্যবসা চীনা পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাতেও প্রভাব পড়বে।

এসএএম: শ্রীলঙ্কার বর্তমান এসএলপিপি সরকারের কর হ্রাসের ব্যাপারে মন্তব্য করুন।

এনসি: কর হ্রাস ও ঋণ অবকাশ অর্থনীতিকে শুভ সূচনা করার সুযোগ দেবে। অনেক বছর ধরে এটি নিম্ন প্রবৃদ্ধিতে জর্জরিত ছিল। সরকার আশা করছে, নতুন উদ্যোগের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা হবে। 

এসএএম: শ্রীলঙ্কার আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনের ব্যাপারে কিছু মন্তব্য করবেন?

এনসি: শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতে, ফলাফল অনুমেয়, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গোতাবায়া রাজাপাকসার সহজ জয়ের ফলে। অবশ্য এসএলপিপি পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠার দিকে নজর দিয়েছে। তাদের দুই-তৃতীয়াংশ প্রাপ্তি নির্ভর করছে তারা জনগণের কাছে বার্তা কিভাবে পৌঁছে দিতে পারবে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল নির্বাচনে কী কৌশল গ্রহণ করে তার ওপর।

এসএএম: এসএলপিপি সরকার দুর্নীতি হ্রাসের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ঘুষ চাওয়ার দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই প্রতিশ্রুতি কতটা ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করেন?

এনসি: দুর্নীতি নির্মূলের প্রতিশ্রুতি সবসময়েই স্বাগত। তবে নতুন সরকার কিভাবে তা করবে, তাকে সে ব্যাপারে একটি রূপরেখা দিত হবে। শুরুর পদক্ষেপ হিসেবে ই-প্রকিউমেন্ট প্রবর্তন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে অনেক দেশ সফল হয়েছে। আরেকটি প্রত্যাশা হলো, আরো স্বচ্ছ ও মূলধারার বিনিয়োগ। ইজি অব ডুইয়িং বিজনেস ইনডেক্সে শ্রীলঙ্কার র‌্যাংকিং উন্নতি হতে পারে আরেকটি মাইলফলক।

এসএএম: বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো দ্রুত বিকাশ লাভ করছে। এসব দেশ কিভাবে উন্নতি করছে, অথচ শ্রীলঙ্কা পিছিয়ে পড়ছে?

এনসি: বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির জন্য বৃহত্তর আন্তঃআঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধ ও সংহতি প্রয়োজন। বেসরকারি খাতের বিপুল সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাদের এগুলোর প্রয়োজন।

এসএএম: দক্ষিণ এশিয়ার সবার অর্থনৈতিক কল্যাণের জন্য সার্কের পুনর্জীবনের প্রয়োজনীয়তার ওপর মন্তব্য করবেন?

এনসি: হ্যাঁ, এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। শক্তিশালী আঞ্চলিক ব্লককে কাজ করতে হলে সত্যিকারের রাজনৈতিক ইচ্ছা ও সেইসাথে পারস্পরিক আস্থা ও সংহতি থাকা দরকার। সার্কের মতো সংস্থাকে আমাদের পরিত্যাগ করা উচিত হবে না।

এসএএম: শ্রীলঙ্কার এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক ঋণ। শ্রীলঙ্কার সার্বিক ঋণ সমস্যাকে কিভাবে বিবেচনা করবেন?

এনসি: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিডিপির সাথে ঋণের অনুপাত প্রায় ৮০-৯০ ভাগে গিয়ে ঠেকেছে। বিদেশী ঋণের সুদ, বিশেষ করে বাণিজ্যিক ঋণের, একটি চ্যালেঞ্জ। সরকার এখন ঋণ পরিশোধের সময় নতুন করে নির্ধারণ করার আলোচনা শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তহবিল সংগ্রহের পরিকল্পনাও করছে। শ্রীলঙ্কা অতীতে কখনো খেলাপি হয়নি এবং ভবিষ্যতেও তা হবে না বলে আশা করা যায়। ঋণ পরিশোধের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো রফতানি বাড়ানো।