আমরা লাইভে English সোমবার, মে ১০, ২০২১

ভারতে আটকা পড়েছে বাংলাদেশের ক্যান্সার রোগীরা

sam special 9-5-2020

কলকাতা সরোজ গুপ্ত ক্যান্সার অ্যান্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউট

 

ভারতে আটকা পড়া বাংলাদেশের বেশ কিছু ক্যান্সার রোগী দেশে ফিরতে চায় না, কারণ তারা আশঙ্কা করছে যে, দেশে ফিরলে মেডিকেল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারবে না তারা।

বাংলাদেশ সরকার যদিও আটকে পড়া কয়েক হাজার বাংলাদেশীকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে, তবে ক্যান্সার রোগীসহ অনেক মানুষ রয়েছে, যারা একটা অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছে। তারা বলেছেন যে, তারা দুটো একই ধরনের অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছেন এবং তাদেরকে একটি বেছে নিতে হবে। তারা ভারতে থাকতে চান আবার একই সাথে এটাও চান যে যাতে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে বাংলাদেশ বা ভারত সরকার তাদেরকে আর্থিক সহায়তা দেয়।

কয়েক হাজার বাংলাদেশী পর্যটক, স্বল্পকালীন সফরকারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং মেডিকেল চিকিৎসা নিতে আসা মানুষ ২৫ মার্চ থেকে ভারতে আটকা পড়ে আছেন, কারণ কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার কারণে দেশ জুড়ে লকডাউন জারি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

আরো পড়ুনঃ করোনার আঘাতে দক্ষিণ এশিয়ার সংবাদ মাধ্যমগুলোর আয়ে ধস

এর আগে দুই কিস্তিতে বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ভারতের বিভিন্ন শহর থেকে শিক্ষার্থী ও চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তিসহ দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশীকে ফিরিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু আরও বহু শত মানুষ ওই ফ্লাইটে ফিরতে পারেননি এবং ভারতে তারা চিকিৎসা, আশ্রয়, এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আর্থিক সঙ্কট এবং বিদেশে একটা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের কারণে তাদের দুর্দশা আরও বেড়ে গেছে।

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশী কূটনীতিকরা অবশ্য বলছেন যে, আটকে পড়া বাকি বাংলাদেশীদের উদ্ধারের জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে কাজ করছেন তারা।

1_ban_ 09-05-2020

কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, “যে সব বাংলাদেশী ভারতে আটকা পড়েছে এবং দেশে ফিরে যেতে চান, তাদের ফিরিয়ে নিতে ঢাকার পররাষ্ট্র দফতর এবং ভারতে বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তারা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছেন”।

ওই কূটনীতিক জানান, বাংলাদেশের জাতীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ দিল্লী, মুম্বাই ও কলকাতার বাংলাদেশ মিশনগুলোর সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে যাত্রী পাওয়া সাপেক্ষে আরও চারটি ফ্লাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশীদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করবে।

“আমাদের মিশনের স্টাফরা ভারতে আটকা পড়া বাংলাদেশীদেরকে অব্যাহতভাবে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে এবং ভারতে ভিসার অতিরিক্ত সময় অবস্থানের কারণে যারা আইনি সমস্যায় পড়েছেন, তাদেরকেও সহায়তা করছে”, জানালেন ওই কূটনীতিক।

ভারতে আটকা পড়া বাংলাদেশীদের মোট সংখ্যা কত জানতে চাইলে ওই কূটনীতিক বলেন, “বাংলাদেশ মিশন ভারতে আটকা পড়া সব বাংলাদেশীর তথ্য সংগ্রহ করছে”।

দিল্লীর বাংলাদেশ হাই কমিশন জানিয়েছে, কলকাতা থেকে ১০ মে, মুম্বাই থেকে ১২ মে, বেঙ্গালুরু-ঢাকা রুটে ১৩ মে, এবং দিল্লী-ঢাকা রুটে ১৪ মে প্রত্যাবাসন ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে।

হাইকমিশন আরও জানিয়েছে, প্রাইভেট বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সও ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় চেন্নাই থেকে পাঁচটি বিশেষ প্রত্যাবাসন ফ্লাইট পরিচালনা করবে। ওই শহরে একটা বড় সংখ্যক বাংলাদেশী আটকা পড়েছে, যারা হয় চিকিৎসা নিতে অথবা উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থী হিসেবে এখানে এসেছিলেন।

“ইউএস-বাংলা ফ্লাইটগুলো ৮ মে এবং ১০ মের মধ্যে এবং ১৩ মে ও ১৪ মে’র মধ্যে পরিচালিত হবে। যে সব বাংলাদেশী দেশে ফিরতে আগ্রহী, তাদেরকে এই বিমানের সাথে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের এক কূটনীতিক টেলিফোনে এসএএমকে জানান, “পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে কলকাতা-ঢাকা বিশেষ বাস সার্ভিস পরিচালনার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে কথাবার্তা চলছে”।

ক্যান্সার রোগী

এদিকে, কলকাতায় আটকা পড়া বেশ কিছু বাংলাদেশী ক্যান্সার রোগী একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছেন। সাথে কোন অর্থ নেই, কলকাতার বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশন বা দেশের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও কোন সাহায্য পাচ্ছেন না তারা। কলকাতার উপকণ্ঠে ঠাকুপুকুরে সরোজ গুপ্ত ক্যান্সার সেন্টার অ্যাণ্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটের কাছে একটি দাতব্য গেস্ট হাউজে কোনরকমে বাস করছেন তারা।

বাংলাদেশের বগুড়া থেকে স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন ৬৫ বছর বয়সী ক্ষুদিরাম দাস। এখন কোন টাকা-পয়সা না থাকায় কলকাতায় আটকা পড়েছেন তারা। বাংলাদেশেও ফিরতে পারছেন না তারা, চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।

সাউথ এশিয়ান মনিটরকে দাস বলেন, “লকডাউনের সময় থেকে যে সামান্য টাকা ছিল, সেটাও শেষ হয়ে গেছে। আমার স্ত্রীর প্রতি দুই সপ্তাহে কেমোথেরাপি নিতে হয় এবং আমরা জানতে পেরেছি যে, দেশে ফেরার পর আমাদেরকে দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। সে অবস্থায় আমার স্ত্রীর চিকিৎসা ব্যাহত হবে”।

“আমরা এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়ে গেছি যে, দুদিকেই আমাদের জীবনে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। বাংলাদেশে ক্যান্সারের উন্নত চিকিৎসা নেই, ভারতে যেটা রয়েছে। আমাদের সৌভাগ্য যে হাসপাতালের কাছের একটি ফার্মাসিউটিক্যাল দোকান সাহায্য করছে, কিন্তু কতদিন তারা এটা করতে পারবে?”

দাস বলেন, বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার অর্থ হলো তার স্ত্রীর চিকিৎসা হবে না। আর ভারতে থেকে যাওয়ার অর্থ হলো অনাহারে থাকতে হবে। তার ভাষ্যমতে, যেটুকু সামান্য অর্থ তাদের কাছে আছে, সেটা রক্ষার জন্য তার আর তার স্ত্রীকে বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে খাবার না খেয়ে থাকতে হচ্ছে।

“আমাদের হৃদয়বান বাড়িওয়ালা বলেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরে তাকে অর্থ পরিশোধ করলেই চলবে। কিন্তু পরিস্থিতি কি স্বাভাবিক হবে?”, বললেন দাস। কলকাতায় দেশের কূটনৈতিক মিশনে সাহায্যের আবেদন করেও এখন পর্যন্ত কোন জবাব পাননি তিনি।

আরো পড়ুনঃ করোনাভাইরাসকে সাম্প্রাদায়িক রূপ দেয়া হচ্ছে আসামে!

দাসের মতো আটকে পড়া কয়েকশ বাংলাদেশীর মধ্যে আরেকজন হলেন মোজাম্মেল হোসেন। তিনি অপেক্ষা করছেন কখন তিনি দেশে ফিরতে পারবেন। হোসেনও একজন ক্যান্সার রোগী এবং তার কাছে ওষুধ কেনার মতো টাকাও এখন নেই। তিনি বললেন যে, চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন তিনি, কারণ তার ভিসার মেয়াদও প্রায় শেষের দিকে।

টাঙ্গাইলের মধুপুরের বাসিন্দা হোসেন বলেন, “আমার মেডিকেল ভিসার মেয়াদ ১১ মে শেষ হয়ে যাবে। আমি কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনের সাথে যোগাযোগ করেছি কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন সাড়া পায়নি”। দাসের সাথে একই গেস্ট হাউজে অবস্থান করছেন তিনি।

2_ban_ 09-05-2020

দাসের মতো ৩৩ বছর বয়সী হোসেনও উদ্বেগের মধ্যে আছেন যে, বাংলাদেশে ফিরে গেলে তিনি চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারবেন কি না।

ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতাল নামে পরিচিত ক্যান্সার সেন্টারে কোভিড-১৯ লকডাউনের কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। “আমার কোভিড-১৯ পরীক্ষা করা হয়েছে এবং সৌভাগ্যক্রমে ফল নেগেটিভ এসেছে। এখন, আমার চিকিৎসার জন্য আরও বেশি অর্থ লাগবে এবং মনে হচ্ছে আমাদের দেশের সরকার আমাকে পরিত্যাগ করেছে”। তিনি আরও বলেন যে, তার মেডিকেল ভিসা নবায়ন করতে না পারলে, তাকে হয়তো বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।

গেস্ট হাউজে স্ত্রীকে নিয়ে ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছেন আরেক বাংলাদেশী ভাস্কর চৌধুরী অরূপ। ৪৪ বছর বয়সী অরূপ বলেন, তার মনে হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার তাদের সাথে প্রতারণা করেছে। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কাছে আবেদন জানাতে চান, যাতে তিনি তাদের হাসপাতাল বিল পরিশোধে সাহায্য করেন, কারণ তিনি আর তার স্ত্রীর কাছে এখন কিছুই অবশিষ্ট নেই।