আমরা লাইভে English রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

ভারতে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যোগ দিয়েছে ভিক্ষুক আর কারাবন্দীরা

SAM SPECIAL-ENG-22-04-2020
মুখ্যমন্ত্রীর কোভিড-১৯ তহবিলে দান করছে শিলিগুড়িরি ভিক্ষুকরা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি করোনাভাইরাসের বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাতীয় সংহতির ডাক দেয়ার আগেই ভিক্ষুক, কারাবন্দী এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মানুষেরা তাদের বড় ধরনের ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে এসেছে এবং একটা উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। 

৩ এপ্রিল মোদি সব ভারতীয় পরিবারের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারা ৫ এপ্রিল রাত ৯টায় নয় মিনিটের জন্য একটি মোম বা প্রদীপ, মাটির ল্যাম্প, বা ফ্লাশলাইট, টর্চলাইন বা মোবাইল ফ্লাশলাইট জ্বালিয়ে এটা প্রকাশ করে যে, এই মহামারীর বিরুদ্ধে ভারতের ১.৩ বিলিয়ন মানুষ ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। 

মোদি বলেন যে, করোনাভাইরাস যে অন্ধকার ছড়িয়েছে তার প্রতি এটা একটা প্রতীকী চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া। এর অর্থ হলো আলোর শক্তি প্রদর্শন যাতে ১.৩ বিলিয়ন ভারতীয়ের পরাশক্তি জেগে ওঠে। ১০ দিনের মধ্যে ভারতীয়দের প্রতি এটা ছিল মোদির দ্বিতীয় আবেদন। প্রথমটি ছিল ১৪ ঘন্টার জনতা কারফিউ। সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলমান ওই জনতা কারফিউয়ের সময় তিনি ভারতীয়দেরকে ঘন্টা বাজিয়ে, হাত তালি দিয়ে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদেরকে ধন্যবাদ জানাতে বলেন, যারা সামনের সারিতে থেকে এই মহামারীর বিরুদ্ধে লড়ছে। কিন্তু সংহতি জানানোর এই আহ্বান অনেকটা উদযাপনের রূপ নেয় শেষ পর্যন্ত। 

আরও পড়ুনঃ করোনাভাইরাসকে সাম্প্রাদায়িক রূপ দেয়া হচ্ছে আসামে!

তবে ১ এপ্রিল ভারতের উত্তরাঞ্চলের পশ্চিম বঙ্গের শিলিগুড়ি শহরের ২৫ জন ভিক্ষুক ও ভবঘুরের একটি দল পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর করোনাভাইরাস মোকাবেলার ত্রাণ তহবিলে ৪১৭ রুপি দান করে। 

এই দান সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান শিলিগুড়ি ইউনিক ফাউন্ডেশান টিম। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শক্তি পাল বলেন, এই ভিখারিরা সাধারণত শহরের কেন্দ্রীয় কোন জেলার মন্দিরের আশেপাশে বসে থাকে এবং মন্দিরে যারা আসেন, তাদের কাছ থেকে ভিক্ষা নিয়ে থাকে। 

সাউথ এশিয়ান মনিটরকে পাল বলেন, “তাদের দান পরিমাণে কম হলেও এর গুরুত্ব অনেক। কারণ এটা এমন সময় আসলো যখন লকডাউনের কারণে তাদের ভিক্ষার উৎসগুলো শুকিয়ে গেছে”। ২৫ সদস্যের ইউনিক ফাউন্ডেশান টিম ২০১৮ সাল থেকে দরিদ্র ও অসহায় মানুষদেরকে বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করে আসছে, যারা এই মন্দিরের বাইরে অপেক্ষা করে। 

ভিক্ষুকরা নিজেরাই জিজ্ঞাসা করেছে যে, কিভাবে তারা মুখ্যমন্ত্রীর কোভিড-১৯ ত্রাণ তহবিলে অংশগ্রহণ করতে পারে। ২৮ বছর বয়সী পাল বলেন, “তাদের সামান্য যা কিছু ছিল, নিজ ইচ্ছাতেই তারা সেটা দান করেছে। তাদের কেউ ২ রুপি, কেউ ৫ রুপির কয়েন দিয়েছে, কেউ কেউ ১০ রুপি বা ৫০ রুপিও দিয়েছে, যদিও তারা দিনের খাবার জোটাতেই হিমশিম খাচ্ছে”। পাল আসাম রাইফেলসে কাজ করেন। ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় মনিপুর রাজ্যে দেশের সবচেয়ে পুরাতন এই আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। 

এই ফাউন্ডেশান সারা শহরের বিভিন্ন দাতাদের কাছ থেকে পণ্য ও দরকারী জিনিসপত্র সংগ্রহ করে। এর মধ্যে রয়েছে চাল, ডাল, রান্নার তেল, সবজি ইত্যাদি। এই জিনিসগুলো আবার প্রত্যন্ত গ্রাম ও বস্তির অধিবাসীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়, যারা লকডাউনের কারণে কাজ হারিয়েছে এবং যাদের এই সব জিনিসের প্রয়োজন রয়েছে। 

৩১ মার্চ পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কোভিড-১৯ তহবিল গঠনের পর মেদিনিপুর সেন্ট্রাল কারেকশনার হোমের ১২ বন্দী ৬৬,৫০০ রুপি সংগ্রহ করে সেটা মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দান করেছে। কারাগারে বিভিন্ন কাজ করে বন্দীরা যে অর্থ উপার্জন করেছে, সেখান থেকে এই অর্থগুলো সংগ্রহ করেছে তারা। 

কারাগারের দায়িত্বে থাকা এক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে বন্দীদেরকে ফুলের তোড়া এবং মিষ্টি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী ব্যানার্জি নিজেও বন্দীদের এই মানবিক আচরণের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, “রাজ্যের সমস্ত সাধারণ মানুষ যে অর্থ দিয়েছে, তার প্রতিটি রুপি করোনাভাইরাসের সঙ্কট মোকাবেলায় সাহায্য করবে”।

আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের কারাগারগুলোতে আটক বন্দীরা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পার্সনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) তৈরি করে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সহায়তা করছে। 

বাহরামপুর সেন্ট্রাল কারেকশনাল হোমের পাঁচ বন্দী পিপিই তৈরি করছে। অন্যেরা তৈরি করছে মাস্ক। জেল সুপার দেবাশিষ চক্রবর্তী এ তথ্য জানিয়েছেন। 

ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিম বঙ্গেরও পিপিই এবং মাস্কের সঙ্কট রয়েছে এবং কারাগারগুলো থেকে যে সামান্য অবদানই রাখা হোক না কেন, সেটা কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সাহায্য করবে”, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বাহরামপুর থেকে সাউথ এশিয়ান মনিটরকে টেলিফোনে এ কথা বলেন চক্রবর্তী। 

তিনি বলেন, “পশ্চিম বঙ্গের উত্তরাঞ্চলের ২৬টি কারাগারে এখানকার তৈরি মাস্কগুলো সরবরাহ করা হচ্ছে। আমাদের কারাগারে ২০ জন বন্দী মাস্ক তৈরি করছে এবং প্রতিদিন সাড়ে সাতশ’র বেশি মাস্ক তৈরি হচ্ছে”।

চক্রবর্তী বলেন জেলার চিফ মেডিকেল অফিসার সম্প্রতি এইসব সুরক্ষা সরঞ্জামের মান দেখার জন্য নিজেই কারাগারে এসেছিলেন। এখন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তাদেরকে কিছু ছবি দেয়া হচ্ছে, যেগুলোর মাধ্যমে তারা দেখছে যে কিভাবে এগুলো তৈরি করা যায়। 

চক্রবর্তী বলেন, “বন্দীরা কারাগারে এমনিতেই সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নেয়। এই বন্দীদের মধ্যে সেলাইয়ে যে পাঁচজন সবচেয়ে ভালো, তারাই এখন সুরক্ষা স্যুট তৈরি করছে। প্রতিদিন জনপ্রতি একটি করে স্যুট তৈরি করছে তারা”।

কারা প্রধান জানিয়েছেন যে, তারা বাহরামপুর শহরের ফার্মাসিউটিক্যাল ইউনিট এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও অর্ডার পেতে শুরু করেছেন। ১৭৫৭ সালের জুনে এই শহরেই ঐতিহাসিক পলাশির যুদ্ধ সঙ্ঘটিত হয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ করোনা মোকাবেলায় ম্যালেরিয়ার দাওয়াই, দার্জিলিংয়ে চাঙ্গা হচ্ছে সিনকোনার চাষ 

কারাগারের মেডিকেল অফিসার রবিশঙ্কর রিব বলেন, সংক্রমণ ঠেকাতে এই স্যুটগুলো যথেষ্ট। এবং রোগিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় তিনি নিজেও এগুলো ব্যবহার করছেন। 

রবি বলেন, “লক্ষ্য হলো ২৫টি স্যুট তৈরি করে সেগুলো জেলার অন্যান্য কারাগারে পাঠানো”।

তবে, কোভিড-১৯ রোগীদের নিয়ে সরাসরি কাজ করছেন যে সব মেডিকেল স্টাফ, তারা এগুলো ব্যবহার করবেন না। এই স্যুটগুলো ব্যবহার করছেন কারাগারের মেডিকেল ও স্বাস্থ্যসেবা স্টাফরা। রবি বলেন, “যে সব স্বাস্থ্যকর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে ঠাণ্ডা ও কাশির রোগিদের জরিপ করছেন, এই স্যুটগুলো তাদের জন্য খুবই কাজে লাগবে”।

চক্রবর্তী বলেন, “২০ মার্চ থেকে আমরা সুরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করছি এবং আশা করছি যে, বন্দীরা এর ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্য উৎপাদন আরও বাড়াতে পারবে”।