English সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

বাংলাদেশে কৃষকদের নতুন পথ দেখিয়েছে ‘নয়াকৃষি আন্দোলন’

SAM SPECIAL-ENG-20-04-2020

বাংলাদেশের কৃষকরা দেশের জন্য খাদ্য উৎপাদন করছে, কিন্তু এরপরও সেই শস্য বাজারজাত করে সেখান থেকে একটা মর্যাদার জীবিকা নির্বাহ করাটা তাদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। আসলে, ব্যবসায়ের শর্তগুলো সবসময়ই রফতানিমুখী শিল্প খাতের তুলনায় কৃষিখাতের স্বার্থের বিপক্ষে ছিল। 

এই বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকরা যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, সেটি সত্যিই বিস্ময়কর। তারা ভালোমানের শীতকালীন শস্য উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সেই সাফল্যটাও এখন তাদের জন্য হতাশার হয়ে গেছে। বহুজাতিক সংস্থাগুলোর ‘উন্নয়ন’ নির্দেশনা মেনে যে নব্য-উদার বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেখানে কৃষির উপর শিল্পকে প্রাধান্য দিয়ে সরকারের গৃহীত নীতির বোঝাটা বাধ্য হয়ে কৃষকদেরকেই বহন করতে হচ্ছে। 

কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারী বাংলাদেশের আগে থেকেই অবরুদ্ধ খামারি সম্প্রদায়ের উপর আঘাত হেনেছে। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে সবজি চাষিরা বড় ধরণের ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, কারণ দেশজুড়ে লকডাউনের কারণে তাদের পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যহত হচ্ছে। 

আরও পড়ুনঃ করোনার কবলে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি

শীতের শস্য, বিশেষ করে সবজিটা এখন সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু লকডাউনের কারণে স্থানীয় বাজারগুলো মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য খোলা থাকছে। সে কারণে, কৃষকদের বাধ্য হয়ে প্রায়ই এত কম দামে তাদের পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে, যেটা দিয়ে তাদের উৎপাদন খরচও মেটে না। সবজি লম্বা সময় ধরে সংরক্ষণ করা যায় না। যদিও রসুন বা পেঁয়াজের মতো শস্যগুলো তুলনামূলক লম্বা সময় ধরে সংরক্ষণ করা যায়, কিন্তু এতে সান্ত্বনা মিলছে না। পরবর্তী আমন মৌসুমে বিনিয়োগের জন্য এই শস্য বিক্রি করে অর্থ হাতে পেতে হবে কৃষকদের। 

যে সব কৃষক আলু, শসা, সিম ও বেগুন চাষ করেছিলেন, আশার চেয়ে অনেক কম দামে তাদেরকে এগুলো বিক্রি করতে হচ্ছে। এপ্রিলের শুরুর দিকে, ৩-৫ টাকা কেজি দরে শসা, ৫ টাকা কেজি দরে বেগুন এবং ৭-৮ টাকা কেজি দরে টমাটো বিক্রি হয়েছে। 

বহু হতাশ কৃষক তাদের অবিক্রিত সবজি গবাদি পশুকে খাইয়ে দিয়েছেন। একজন ক্ষুব্ধ কৃষক – আমির হোসেন – একটি ইউটিউব ভিডিওতে বলেছেন: “গরুকে টমাটোগুলো দিয়েছিলাম, কিন্তু তারাও এগুলো খাচ্ছে না”। ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে গেছে। 

বরগাচাষী এবং কৃষকদের মধ্যে যারা জমি লিজ নিয়ে চাষ করেছেন, তারা জানেন না কিভাবে লিজ তারা শোধ করবেন। এ রকম পরিস্থিতিতে কিভাবে তারা চাষাবাদ চালিয়ে যাচ্ছে, এটা কল্পনা করাটাও কঠিন। 

কৃষি বিপনন অধিদপ্তরের মতে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা তাদের উৎপাদন মূল্যের ২৫-৫০ শতাংশ দরে সবজি বিক্রি করছে। বেগুজন ৩-৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে, যেখানে উৎপাদন খরচ পড়েছে ১০.৫০ টাকা; মিষ্টি কুমড়া বিক্রি করা হচ্ছে ৮-১০ টাকা কেজি দরে, যেখানে উৎপাদন ব্যায় হলো ১৮ টাকা। [১৮ এপ্রিলের দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের খবর দেখুন - “Vegetable growers in dire straits”]

তবে, সরকার দাবি করেছে যে, দেশে কোন খাদ্য সঙ্কট তৈরি হবে না কারণ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে; যেমন, কৃষকদের ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়ার জন্য ৫০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ এবং সার ও অন্যান্য বিষয়ে সহায়তার জন্য ৯০০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। সরকারের কাছ থেকে সহজেই যে সব সহায়তা পাওয়া যাবে, সেগুলো হলো যন্ত্রপাতি, সার, সেচ এবং এইচওয়াইভি ও হাইব্রিড বীজ ইত্যাদি। 

সরকারের নীতির মাধ্যমে কৃষকদের বীজ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে এবং বীজ ও সংশ্লিষ্ট বাজার দখল করেছে বাণিজ্যিক বীজ ও কর্পোরেট কোম্পানি। 

সরকারের প্যাকেজে এমন কিছুই নেই, যেটা কৃষকদের সহায়তা করবে। আর তাদের পণ্যের জন্য বাজার নিশ্চিত করারও কোন পদক্ষেপ নেই। চাষাবাদ এবং ফসল সংগ্রহের কাজে যে শ্রমিকরা জড়িত তাদের জন্য কোন সহায়তাও এখানে নেই। 

নয়াকৃষি আন্দোলন

মূলধারার উন্নয়ন নীতি নির্ধারকদের বিপরীতে জীববৈচিত্র-ভিত্তিক কৃষি চর্চাকেন্দ্রিক নয়াকৃষি আন্দোলন এখানে ভিন্নভাবে চিন্তা করে। 

বাংলাদেশকে অবশ্যই ‘খাদ্য সার্বভৌমত্বের’ নীতির জায়গাতে কোন ছাড় দেয়া যাবে না, যেটার সাথে দেশের অর্থনৈতিক ও জৈবিক অস্তিত্বের সাথে জড়িত। কৃষকদেরকে বাজারের সাথে সম্পৃক্ত করাটা ইতিবাচক যদি সেটা খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করে এবং দেশকে খাদ্য আমদানি থেকে মুক্ত করে। কৃষকরা মানুষের জন্য খাবার তৈরি করে, কোম্পানির জন্য নয়। পরিবহন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে যে কাঠামোগত বাধা রয়েছে, সেটা অবিলম্বে দূর করতে হবে। 

দ্বিতীয়ত, বাইরে থেকে সার, কীটনাশক, সেচএবং অন্যান্য যান্ত্রিক ও রাসায়নিক উপাদানের ব্যবহার থেকে এখনই সরে দাঁড়াতে হবে এবং প্রাকৃতিক, পরিবেশমুখী ও জৈব বিজ্ঞান থেকে শিখতে হবে, বিশেষ করে কৃষি-ইকোলজি এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোতে মনোযোগ দিতে হবে যাবে প্রকৃতির শক্তিকে পুরোপুরি ব্যবহার করা যায়। 

পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থান ধ্বংস করা থেকে দেশকে বেরিয়ে আসতে হবে। উবিনিগের মাঠের তথ্য থেকে দেখা গেছে যে, নয়াকৃষির সাথে জড়িত কৃষকরা যদিও বাজারের সীমিত সময়ের কারণে একই ধরণের সমস্যায় ভুগছে এবং কম দামে শস্য বিক্রি করতে হচ্ছে, কিন্তু তাদের কোন ঋণ নেই। তাদেরকে সার বা কীটনাশত ডিলারদের এবং বীজ কোম্পানিগুলোর দেনা পরিশোধের কথা ভাবতে হচ্ছে না। 

গতানুগতিক কৃষকরা সবজি, গম বা চালের একফসলী চাষ করে থাকে। তাদেরকে এখন পরবর্তী আমন শস্যের কথা ভাবতে হবে, এজন্য তাদেরকে ডিলারদের কাছ থেকে টাকা দিয়ে বীজ, সার, কীটনাশক  কিনতে হবে। অন্যদিকে, নয়াকৃষি কৃষকরা কখনও তাদের জমি ফেলে রাখে না। সবসময়ই তারা কিছু না কিছু ফসল পাচ্ছে। আমন চাষের পর জমির ধরন ও ভৌগলিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে তারা সবজি, ডাল, সরিষা, গম, ভুট্টা ইত্যাদির মিশ্র চাষ করবে। 

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, টাঙ্গাইলে নয়াকৃষির একজন কৃষকের মাত্র ৩৫ ডেসিমাল জায়গা থেকে ৩৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ টাকা রোজগার হয়। এরপরও জমিতে তার অন্যান্য শস্য রয়েছে। মিশ্র ফসল চাষ করা হলে সেটা পোকামাকড়ের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। জমিতে যে অতিরিক্ত গাছ বা ঔষধি জন্মায় সেগুলো ‘চাষ ছাড়াই প্রাপ্ত খাদ্য’ বা ওষুধ এবং গরু ছাগলের খাবার হিসেবে কাজ দেয়। 

নয়াকৃষি আন্দোলনের কৃষকরা বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে ক্ষুদ্র খামারগুলোর (২.৪৯ একরের চেয়ে ছোট, যার মধ্যে খামার বসতবাড়ির ৮০% যেখানে আছে) উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে থাকে। তারা বাজারের জন্য শস্য উৎপাদনের পাশাপাশি নিজেদের জন্যও উৎপাদন করে থাকে। 

নয়াকৃষি কৃষকরা নিজের কমিউনিটির সাথে সম্পর্ক তৈরি করে এবং এর মাধ্যমে সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত করে। কৃষকরা বাজার থেকে স্থানীয় জাতের বীজ কিনে থাকে এবং নিজেদের মধ্যেও বিনিময় করে থাকে। তারা কখনই ডিলারদের উপর নির্ভরশীল নয়। 

নয়াকৃষি খামারগুলো গবাদিপশু ও পোলট্রিসহ স্বয়ংসম্পূর্ণ। লকডাউনের এই কঠিন সময়ে কিছু নয়াকৃষি কৃষক তাদের ছাগল, বা গুরু বিক্রি করছে যাতে তারা পরবর্তী শস্যের জন্য বিনিয়োগ করতে পারে, বিশেষ করে যারা জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদের পরিকল্পনা করছে। 

 

(ফরিদা আখতার, উবিনিগের নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশের নয়াকৃষি আন্দোলনের সংগঠক)