আমরা লাইভে English রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

কোভিড-১৯: নতুন করে পুরনো বৈষম্য

675688-1

এমনকি কোভিড-১৯-এ দৃশ্যপটে হাজির হওয়ার আগে এবং পুরো দুনিয়া ওলোট-পালোট হয়ে যাওয়ার আগেই বৈশ্বিকব্যবস্থায় পরিবর্তনের চাকা ঘুরতে শুরু করেছিল। অত্যন্ত মূল্যবান সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ (বিশেষ করে অ্যাঙ্গো-স্যাক্সন পাশ্চাত্যে এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের সচেতন অধিকার কর্মীদের প্রশংসা পাওয়া) ম্লান হতে বসেছিল। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে এটি পেছনের আসনে পড়ে যাচ্ছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্প, নরেন্দ্র মোদি ও অন্যান্য লোকরঞ্জক ব্যক্তিত্বরা সারা দুনিয়ায় বেড়ে ওঠছিলেন এবং নতুন ধরনের ‘গণতন্ত্র’ জন্ম নিচ্ছিল।

বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দীর্ঘ দিন ধরে পিছিয়ে পড়া মানুষ, গণতন্ত্র, মানবাধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার ছিল। অতীতে তারা তাদের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব গোপন রেখে জাতীয়তাবাদী বাগাড়ম্বড়তা ও কথিত সেক্যুলার উদারবাদ দিয়ে ঢেকে রাখলেও এখন দ্রুততার সাথে তা ঝেড়ে ফেলছে। দলের নেতা দেশীয় ‘গণতন্ত্রের কন্যা’ শেখ হাসিনা চতুরভাবে ‘গণতন্ত্রের আগে উন্নয়ন’ মন্ত্র ব্যবহার করতে পেরেছেন। তবে মাহাথিরের মতো বোধগম্য উন্নয়ন না হলেও গণতন্ত্র থেকে বেশ বোধগম্য বিচ্যুতি ঘটেছে, তা নিশ্চিত।

স্বৈরতন্ত্রের বৈশ্বিক উত্তরণ বর্তমান সময়ের বাস্তবতা। অনুমোদনহীন? হ্যাঁ। অদৃষ্টপূর্ব? না। দেয়ালের লিখন বেশ আগেই হয়ে গিয়েছিল। অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের মতো লোক ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও সারা ইউরোপে ডানপন্থী নেতাদের উত্থান ঘটছিল, ভারতে বিশ্বের তথাকথিত বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে হিন্দুত্বাদ শেকড় গড়েছিল, নির্দোষ কাশ্মিরি জনগণের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছিল, অথচ কোনো বিবেকবান হৃদয় টু শব্দটিও করেনি।

Lifts-SAM Special_18 May-Ban- 1

স্বৈরতন্ত্রের এই প্রবৃদ্ধি নিরবচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল। উচ্চাভিলাষী স্বৈরতন্ত্রীরা সিঙ্গাপুরের লি কুন ওয়ে ও মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদের মতো কল্যাণকর স্বৈরশাসকের ইতিবাচক উদাহরণ চতুরভাবে ব্যবহার করেছে। পাশ্চাত্যের প্রিয়পাত্র কোনোভাবেই ছিলেন না মাহাথির। তবে লি কুন গ্রহণযোগ্য ছিলেন কারণ আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক গ্রুপিংয়ে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিলেন।

আরো পড়ুনঃ সার্ক: করোনাউত্তর দক্ষিণ এশিয়ার মহৌষধ

সামাজিক, মানবিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধগুলো পেছনে সরে যাওয়াতে এবং বস্তুগত মূল্যবোধ তাদের স্থলাভিষিক্ত হওয়ায় পুঁজিবাদকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়, প্রকাশ্য বর্ণবাদ ও ডান চরমপন্থী গ্রুপগুলো জায়গা পেতে থাকে। তারা সাধারণ মানুষকে বোকা বানাতে জিডিপির অংকগুলেকে ব্যবহার করে। সাধারণ মানুষও গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুত পুরস্কারগুলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। উদার গণতন্ত্রগুলো তো কোনোভাবেই তাদের জীবনের মান বাড়াতে পারেনি।

উদারবাদকে অস্বীকারকারী লোকরঞ্জক আন্দোলনগুলো অর্থনৈতিক পরিভাষা, অঙ্কের মুলা দিয়ে বিভ্রান্ত সৃষ্টি করে। তারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা সরিয়ে নিতে উন্নয়নের রঙিন ফানুশ প্রদর্শন করে। সারা দুনিয়ায় ক্রমবর্ধমান মানুষ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের প্রতি তাদের সমর্থন দিতে থাকে। সামাজিক ন্যায়বিচার নিন্দিত হয়, নেতারা প্রায় প্রকাশ্যেই দুধ আর মধুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে বোকা বানাতে থাকে।

আর তারপর কোভিড-১৯-এর নাটকীয় প্রবেশ ঘটে। আর তা শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক শতকের ওপর পর্দা টেনে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

মহামারীটির ব্যাপারে বিশ্ব অসচেতন ছিল এবং ধনী-গরিব সবাই বিস্মিত হয়ে যায়। এমনকি ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে পর্যন্ত এটি ঢুকে পড়েছে, আবার বাংলাদেশের উখিয়ার গরিব রোহিঙ্গা শিবিরেও এখন হানা দিয়েছে। অবশ্য এটি ভেদাভেদের অবসান ঘটাচ্ছে না।

ধনী-গরিবের মধ্য সাম্যতা তো আনছেই না, বরং সরকার বা বহুজাতিক কোম্পানি বা বড় ব্যবসায়ী তাদের বিলাসবহুল জীবনযাপন অব্যাহতই রেখেছে।

Lifts-SAM Special_18 May-Ban- 2

গরিব মানুষ ভাইরাস থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে মাস্ক পরছে। আর ধনী ও শক্তিশালী লোকদের মাস্ক তাদের কুৎসিত বাস্তবতা প্রকাশ ঢেকে রাখছে। তারা দস্তার ওপর সোনার প্রলেপ দেয়ার কথাও গোপন করছে না। তারাই বলছে, লোকজন স্বেচ্ছাতেই লকডাউন অনুসরণ করছে। এটি একটি নির্দেশ হতে পারে, কিন্তু এটা করা হচ্ছে বৃহত্তর কল্যাণের জন্য। তারা যখন সামাজিক দূরত্বের কথা বলছে, তারা তা থেকে সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করছে। আর তা করছে লোকজন থেকে দূরে থাকার জন্য।

উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের কথা বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের সরকার বাধ্যতামূলক ছুটি ঘোষণা করেছে যাতে লোকজন দল বেঁধে বাড়ি যেতে পারে, ভিড়ের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, আরো বেশি করে সমস্যার পড়ার আশঙ্কায় থাকে। তারপর বিলাসবহুল বাড়ির ভেতরে থেকে তৈরী পোশাক শিল্পের মালিকেরা আবার শ্রমিকদের তলব করলেন, নারী ও পুরুষেরা চাকরি হারাবার ভয়ে ফিরে এলেন। সমালোচনার মুখে সরকার বলল যে কারখানাগুলো অবশ্যই বন্ধ থাকতে হবে। ফলে লোকজন আবার ফিরে গেল। অনেকে মাছের মতো করেই ট্রাকে করে গেল। তারপর ব্যবসায়ীরা (তাদের অনেকে সরকারযন্ত্রের অংশবিশেষ) ‘জীবন ও জীবিকার’ প্রশ্নটি তুললেন। আর এর মাধ্যমে আবারো শ্রমিকদের নগরীতে ফিরিয়ে এনে কারখানাগুলো খোলা হলো। ধনী লোকদের খেলার সামগ্রীতে পরিণত হয়ে পড়েছে এসব গরিব। এখানে অস্ত্রই শক্তি। এটি আগের চেয়েও সত্যি।

মহামারীটি একসময় চলে যাবে, কিন্তু নতুন যে বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে, তা বহাল থাকবে। বাংলাদেশে অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের নেশায় মহা নদীটির উপর শিগগিরই পদ্মা সেতু হয়ে যাবে, কিন্তু ধনী আর গরিবের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান ফাটল মেরামতের কোনো সেতু হবে না।

আরো পড়ুনঃ কালো মেঘের উজ্জ্বল দিক

পরিচিত মুখগুলো কুৎসতি প্যাঁচ কষছে। বিল গেটস কি প্রশংসা পাওয়া ও বিশ্বাস করার মতো কল্যাণকামী বিলিওনিয়ার? নাকি তিনি আরো কিছু অর্থ বাগানোর ধান্ধায় আছেন? তিনি কি ভ্যাকসিন বিক্রি করে লাভবান হবে না? তিনি কি এই পৃথিবীর প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে মাইক্রোচিপ বসানোর পরিকল্পনা করছেন? এগুলো কি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব? নাকি তিনি হরর মুভিতে দেখতে পাওয়া বীভৎস চরিত্র? কে জানে? হয়তো সময়ই বলে দেবে? কিংবা আমরা কোনো দিনই জানতে পারব না।Lifts-SAM Special_18 May-Ban- 3

দুনিয়া কোথায় আছে, এতেই তা বোঝা যায়। দুনিয়া বদলে গেছে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করার অসাধ্য পর্যায়ে বদলে গেছে। আমরা কি এই দুর্যোগকে আরো ভালো দুনিয়ায় বাস করার কাজে ব্যবহার করতে পারব? কোভিড-১৯ কি তরুণ প্রজন্ম থেকে নতুন নেতৃত্ব বের করবে, যারা সব ধরনের বিভ্রান্তি, মিথ্যা থেকে সত্য, সুন্দরের পথে আমাদের চালিত করতে পারবে? কেন আসবে না? আমরা কেবল আশাবাদীই হতে পারি। উদাহরণ তো আছেই, নিউজিল্যান্ডের জ্যাসিন্দা আর্ডেন। আবার ক্ষমতায় আসার আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ছিলেন শিক্ষা, সততা, স্বাস্থ্য, প্রগতির নায়ক। কানাডার জাস্টিন ট্রুডোও আছেন। তিনি সংহতি প্রকাশের জন্য মুসলিমদের সাথে ইফতারও করেছিলেন।

এখন সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর, উঠে দাঁড়ানোর। এটা একটি নতুন বিশ্ব, আমরা দুষ্টু আর ধনী লোকের ইচ্ছার কাছে মাথা নত করব না।

আমরা এখন পুরনো বৈষম্যের নতুন স্বাভাবিক অবস্থায় আছি। আসুন আমরা এমন পরিবর্তন করি, যাতে বৈষম্যহীন নতুন স্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্ট হয়। সম্ভবত নতুন স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো কিছুই অস্বাভাবিক নয়।