আমরা লাইভে English শনিবার, ডিসেম্বর ০৪, ২০২১

কোভিড-১৯ সঙ্কটকালে চীনের উত্থান মার্কিন আধিপত্যে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে

SAM SPECIAL-ENG-02-05-2020 (1)-2

গুয়ামে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী থিওডোর রুজভেল্ট

ইউরোপ ও আমেরিকায় কোভিড-১৯-এর ধ্বংসলীলা, মহামারীটি থেকে চীনের দ্রুত সেরে ওঠা এবং শতাধিক আক্রান্ত দেশে কোভিড-১৯ শনাক্ত ও সুরক্ষা কিট সরবরাহকারী বিশ্বের কারখানা হিসেবে চীনের আত্মপ্রকাশ - সব মিলিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে (আইপিআর) মার্কিন আধিপত্যে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।

মার্কিন ওয়েবসাইট ডিফেন্স ওয়ানে সাম্প্রতিক এক প্রবন্ধে সেন্টার ফর নেভাল এনালাইসিসেরে ড. জেফরি বেকার বলেন, বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন যে বর্তমান সঙ্কটে বিশ্বব্যবস্থা চীনের অনুকূলে পুনর্গঠিত হবে কিনা। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই অঞ্চলে আরো সিদ্ধান্তসূচকভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তবে সে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য আমূল পরিবর্তনের বীজ বপণ করতে পারে।

চীন দেশে করোনাভাইরাসকে পরাজিত করার পর তার মেডিক্যাল কূটনীতি খুবই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক ডামাডোলে যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম রূপ ধারণ করেছে। বিরোধীরা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ঢিলেমি, অদক্ষতা ও সিদ্ধান্তহীনতার অভিযোগ এনেছেন। ক্রমবর্ধমান সংখ্যক আমেরিকান বলছেন যে অর্থনীতির শাটডাউন ছিল অপ্রয়োজনীয় ও সেইসাথে উৎপাদনপরিপন্থী।

আরও পড়ুনঃ করোনাকালে দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতার চেয়ে সঙ্ঘাত বেশি

আর গঠনমূলক কিছু করতে ব্যর্থ হয়ে, এমনকি মৃত্যু ৫৬ হাজার হওয়া ও বেকারকত্ব ২১ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে, ট্রাম্প তার পুরনো কৌশল অবলম্বন করে মহামারীটির জন্য চীনকে দায়ী করে বলছেন যে বিশ্বে ভাইরাসটি ছড়িয়ে দেয়ার জন্য চীনকে বিপুল পরিমাণ জরিমানা দিতে হবে। কিন্তু এই দাবি চীনের মুখপাত্র গেঙ শুয়াঙ জোরালভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

কোভিড-১৯ দমনে চীনা সহযোগিতার তুলনায় মার্কিন সহযোগিতা একেবারেই অপ্রতুল। ভারত পেয়েছে ২.৯ মিলিয়ন ডলার, শ্রীলঙ্কা ১.৩ মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশ ৩.৪ মিলিয়ন ডলার। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল বিশ্বাসযোগ্য প্রয়াস চালাতে হবে। কারণ মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে মার্কিন অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করেছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৯ সালের ১ জুন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলবিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলেছিল যে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার আকাশ, সাগর, স্থল ও মহাকাশ পথে উন্মুক্ত ও অবাধ বাণিজ্যের সুবিধাটি যেকোনো মূল্য বহাল রাখতে হবে। কারণ চীনা সম্প্রসারণবাদের কারণে এগুলো হুমকির মুখে পড়েছে।

ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিদ্যমান ব্যবস্থাকে তাচ্ছিল্য ও চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এতে অভিযোগ করা হয় যে বিদ্যমান অবাধ ও উন্মুক্ত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা থেকে চীন যে বিপুলভাবে উপকৃত হয়েছে এবং কোটি কোটি লোককে দারিদ্র থেকে বের করতে আনতে পেরেছে, তা চীন স্বীকার করে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন দক্ষিণ চীন সাগরকে সামরিককরণ করা অব্যাহত রেখেছে বিতর্কিত স্পার্টলি আইল্যান্ডসে জাহাজবিধ্বংসী ক্রুইজ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করে এবং অন্যান্য দাবিদারদের বিপরীতে আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছে।

এতে বলা হয়, তাইওয়ানের আশপাশের এলাকায় বোমারু বিমান, জঙ্গি বিমান, নজরদারি ব্যবস্থা বাড়িয়েছে চীন। যেসব দেশ চীনের জাতীয় স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে অভিযোগ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক হাতিয়ারসহ নানাভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলছে বেইজিং।

যেকোনো উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিই তার সামরিক শক্তি বাড়াবে, এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা আবার স্বাভাবিকভাবেই আইপিআরের বিদ্যমান শক্তি কাঠামোতে হুমকি সৃষ্টি করবে।

চীনের অর্থনৈতিক শক্তি

মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ফিলিপ এস ডেভিডসন বলেন, বেইজিং তার অর্থনৈতিক শক্তিতে অনেক দেশের স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করছে। অপ্রয়োজনীয় ঋণ, স্বচ্ছতার অভাব, বাজার অর্থনীতিতে বিধিনিষেধের ফলে এসব দেশ তার প্রাকৃতিক সম্পদ খোয়ানোর শঙ্কায় রয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো, মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের প্রতিবেদনে কিন্তু স্বীকার করা হয়েছে যে চীনা বিনিয়োগ থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ গ্রহণকারী দেশগুলো উপকৃত হচ্ছে। তবে এতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয় যে চীনের কোনো কোনো বিনিয়োগ নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে বা দেশের সার্বভৌমত্ব নস্যাৎ করতে পারে।

এতে বলা হয়, চীনা বিনিয়োগ ও প্রকল্প অর্থায়ন নিয়মিত বাজার ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ফলে মানসম্মত হয় না এবং এর ফলে স্থানীয় কোম্পানি ও শ্রমিকদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে না। এতে করে ঋণের ভার বাড়ে। একতরফা ও অস্বচ্ছ চুক্তি অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক নীতিমালার পরিপন্থী। এর ফলে এই অঞ্চলে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, উদাহরণ হিসেবে ২০১৮ সালে ঘুষ প্রদান চেষ্টার কারণে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের একটি বড় চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয়। এছাড়া একই বছর মালদ্বীপের অর্থমন্ত্রী বলেন যে চীন তার দেশে অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করছে আগে সম্মত ব্যয়ের চেয়ে বেশি অর্থে। অধিকন্তু চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান শ্রীলঙ্কা সরকারের অর্থ সঙ্কটের সুযোগটি গ্রহণ করে ৯৯ বছরের জন্য শ্রীলঙ্কার হাম্বানতোতা বন্দরটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে।

কিন্তু চীনা হুমকির ব্যাপারে মার্কিন প্রতিক্রিয়া বেশ মৃদু। ডিফেন্স নিউজে ব্রাডলি বাউম্যান ও জন হার্ড লিখেছেন যে ইডোপ্যাকমের হিসাব অনুযায়ী, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনা ক্ষমতার ভারসাম্য আগের চেয়ে এখন আরো বেশি প্রতিকূল। কমান্ড হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলে যে যুদ্ধে লড়াই করার ধারণার তুলনায় ইন্টিগ্রেটেড সার্ভিসের সুপারিশ অনুযায়ী অস্ত্র ও সামর্থ্যের অভাবে রয়েছে।

এতে বলা হয়, একইসাথে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ করায় যুক্তরাষ্ট্র কার্যকর জবাব দেয়ার আগেই আমাদের বৈরী শক্তিগুলো একতরফাভাবে বিদ্যমান অবস্থা বদলে ফেলতে সাহসী হতে পারে।

বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়

অবশ্য প্রতিরক্ষা দফতরের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয় যে চীনা বিনিয়োগ কার্যক্রম যতক্ষণ সার্বভৌমত্বকে শ্রদ্ধা করবে, আইনের শাসনের অনুকূলে থাকবে, দায়িত্বশীল অর্থায়ন নীতি অনুসরণ করবে, স্বচ্ছ ও অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী হবে ততক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এর বিরোধিতা করবে না।

সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে চীনকে ভয় দেখানো

প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনকে দমন করার প্রতিরক্ষা দফতরের কৌশলগুলোর একটি হবে স্বচ্ছতা ও অ-আগ্রসন বাড়ানোর জন্য সামরিক সম্পর্কের সাথে তা করা।

আরও পড়ুনঃ লকডাউনে দক্ষিণ এশিয়ায় বেড়েছে পারিবারিক নির্যাতন

প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়, ইন্দো-প্যাসিফিকে মার্কিন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো দুই দেশের মধ্যে গঠনমূলক, ফলফলমুখি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। চীনের সামরিক আধুনিকায়ন এবং চীনা সামরিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ থাকায় আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সমাঞ্জস্যপূর্ণ কৌশলগত সংলাপ ও নিরাপদ ও পেশাদারিত্বপূর্ণ আচরণ প্রয়োজন। চীন ও চীনা সামরিক বাহিনী যখন আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও মানদণ্ড অনুযায়ী কাজ করবে, তখন ভুল বোঝাবুঝি ও বিভ্রান্তির ঝুঁকি কমে যাবে।

এতে বলা হয়, একথা স্বীকার করে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততার (এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ পর্যায়ের সফর, পরিসি ডায়ালগ, ফাংশনাল এক্সচেঞ্জ) কেন্দ্র হচ্ছে ঝুঁকি হ্রাস এবং সঙ্কট প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

এতে বলা হয়, আমাদের সামরিক বাহিনী পর্যায়ে যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা দফতর এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে এমন আচরণ করতে চীনকে উৎসাহিত করা অব্যাহত রাখবে প্রতিরক্ষা দফতর।