আমরা লাইভে English সোমবার, মে ১৬, ২০২২

শ্রীলঙ্কায় তামিলদের প্রতি চীনের মুক্ত সমর্থন, ভারতের নতুন মাথাব্যথা

311902_Abul-4-1

গত মাসে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী ভারতের কমপক্ষে ৬০ জন জেলেকে গ্রেপ্তার করে। এ নিয়ে তামিলনাড়ু রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ১৯ শে ডিসেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট করে যাচ্ছেন ওই রাজ্যের জেলেরা। যদি সব জেলেকে ছেড়ে দেয়া না হয়, তাহলে তারা ব্যাপকভিত্তিতে ‘রেল রোখো’ আন্দোলন করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কাছে চিঠি লিখেছেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্টালিন। এতে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর ভীতি প্রদর্শনের কৌশল থেকে সব জেলের নিরাপত্তা ও তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে। এর প্রেক্ষিতে ৫ই জানুয়ারি শ্রীলঙ্কার একটি আদালত ১৩ জন জেলেকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু পক প্রণালীর দুইপাশে তামিল জেলেদের মধ্যকার অব্যাহত বিরোধ ভারত ও শ্রীলঙ্কার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে গুরুত্বর প্রভাব ফেলেছে।

২০২১ সালে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী কমপক্ষে চারবার তামিল জেলেদের ওপর আক্রমণ চালায়। এতে অনেকের মৃত্যু হয়েছে।

ভারত বনাম চীন

শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলে দুটি আগ্রহোদ্দীপক ঘটনার প্রেক্ষাপটে চলমান এই সঙ্কটকে দেখতে হবে। প্রথমত, উত্তেজনা শুরুর কয়েকদিন আগে শ্রীলঙ্কার মৎস্য বিষয়ক মন্ত্রী ডগলাস দেবানন্দ ১৩ই ডিসেম্বর সাক্ষাত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্টিন কে. কেলির সঙ্গে। শ্রীলঙ্কা এবং ভারতের মধ্যে জেলে নিয়ে এই বিরোধে তার সহায়তা চেয়েছেন তিনি। এই বিরোধকে শ্রীলঙ্কার একজন প্রথম সারির তামিল নেতা আন্তর্জাতিকীকরণ করার চেষ্টা করছেন। এতে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে শ্রীলঙ্কায় ভারতের প্রভাবের দীর্ঘ দিনের সমালোচক হলেন দেবানন্দ। তিনি বর্তমান রাজাপাকসে সরকারের সঙ্গে জোট গড়েছেন। ফলে এক্ষেত্রে তিনি প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসের সমর্থন পাচ্ছেন।

অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শ্রীলঙ্কার তামিল সম্প্রদায়ের মধ্যে অনাকাঙ্খিতভাবে পৌঁছে গেছে চীন। এর প্রেক্ষিতে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিরোধ উসকে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশে তিন দিনের ঝটিকা সফর করেছেন চীনের রাষ্ট্রদূত কি ঝেনহোং। তার এই সফর শ্রীলঙ্কার তামিলদের প্রতি শক্তির কোমল সমর্থন ছাড়া আর কিছু নয়। ১৫ই ডিসেম্বর তিনি আইকনিক জাফনা পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেছেন। এ সময় সেখানে তিনি ল্যাপটপ এবং বই উপহার দিয়েছেন। তার সঙ্গে ছিলেন মৎস্য বিষয়ক মন্ত্রী। তিনি তাকে চীনা কোম্পানি নির্মিত একটি সামুদ্রিক শসা উৎপাদনের হ্যাচারিতে নিয়ে গিয়েছিলেন।

পরেরদিন খালি গায়ে একটি সাদা ধুতি পরে চীনা রাষ্ট্রদূত ঝেনহোং জাফনায় নাল্লুর কাদাস্বামী মন্দিরে প্রার্থনা করেন। পরবর্তীতে তিনি মান্নারে নিউ সিল্ক রোড ফুডস্টাফ কারখানায় স্টাডি ট্যুর করেন। চীনা দূতাবাসের টুইটার একাউন্ট অনুযায়ী, সেখান থেকে ওই এলাকার হাজার হাজার জেলে পরিবারের কাছে খাদ্য সরবরাহ দেয়া হয়। জেলেদের মধ্যে কোভিড সংক্রান্ত ত্রাণ সামগ্রী ও মাছ ধরার সামগ্রী বিতরণ শেষে তিনি ১৭ই ডিসেম্বর ভারতের মূল ভূখ- থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে পয়েন্ট পেদ্রো পরিদর্শন করেন।

হেরে যাচ্ছে চীন

২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি হয়। তারপর থেকে দেশটির দক্ষিণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চীন। এক্ষেত্রে লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) বিরুদ্ধে সিংহলিজ জাতীয়তাবাদীদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে তারা। এর মধ্য দিয়ে তাদেরকে কলম্বো সরকারের মৌলিক ব্যাকার বা সমর্থক হিসেবে অটল অবস্থানে নিয়ে আসছে। তবে শ্রীলঙ্কায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারের ঘটনায় শ্রীলঙ্কার ভিতরেই চীনবিরোধী সেন্টিমেন্ট প্রবল হচ্ছে। ২০২১ সালের মে মাসে কলম্বো পোর্ট সিটি ইকোনমিক কমিশন (সিপিসিইসি) অ্যাক্ট কার্যকর করেন রাজাপাকসে সরকার। তখন থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছেন সিংহলিজ-বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। এই আইন করার ফলে সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে যে, রাজাপাকসে শাসকগোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে শ্রীলঙ্কার সার্বভৌমত্বকে চীনের হাতে তুলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে এই পোর্ট সিটি ‘চাইনিজ কলোনি’ হয়ে উঠছে বলে আভ্যন্তরীণভাবে ধারণা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয় ২০২১ সালের জুলাই মাসে। ওই সময় প্রেসিডেন্সিয়াল সেক্রেটারির একটি প্রান্ত কাটার চেষ্টা করে চীনা একটি কোম্পানি। এর ফলে সিপিসিইসির চেয়ারম্যান ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকার অভিযোগে ২০ হাজার টন অর্গানিক সার আমদানি প্রত্যাখ্যান করে শ্রীলঙ্কার ন্যাশনাল প্লান্ট কোয়ারেন্টিন সার্ভিস। এতে আরেকটি ধাক্কা খায় চীন। এর জবাবে শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত চীনা দূতাবাস টুইট করে যে, পাওনা পরিশোধ না করার কারণে রাষ্ট্র মালিকানাধীন পিপলস ব্যাংক অব শ্রীলঙ্কা’কে কালো তালিকাভুক্ত করেছে তারা। ৬৭ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে বসে চীন। এতে শ্রীলঙ্কার অনেকের মনে এমন সন্দেহ জাগ্রত হয় যে, তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও সুবিধা নেবে চীন এবং তাকে টেনে নিয়ে যাবে তারা।

এরপর নভেম্বরে উত্তরাঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক প্রকল্পে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার দেয়ার প্রস্তাব বাতিল করে শ্রীলঙ্কা। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে চীনা কোম্পানিগুলোকে এ কাজ দেয়া হয়েছিল। এই প্রকল্পগুলো ভারতের রামেশ্বরম শহরের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। ফলে এ নিয়ে কলম্বোর কাছে কড়া প্রতিবাদ পাঠায় ভারত। এসব প্রকল্প বাতিল হওয়ার পর কলম্বোতে অবস্থিত চীনা দূতাবাস টুইটারে একটি বিবৃতি দেয়। তাতে প্রকল্প বাতিলের নেপথ্যে তৃতীয়পক্ষের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করা হয়।

শ্রীলঙ্কায় চীন বিরোধী সেন্টিমেন্ট চীনের স্বার্থকে ভিন্নদিকে নিয়ে যাচ্ছে। চাইনিজ কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) এবং রাজাপাকসে ভাইদের মধ্যে ‘প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট’ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এর বেশিরভাগ ঘটছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক প্রকল্পে সিসিপি থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণে রাজাপাকসে ভাইদের সক্ষমতা সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলিজ জাতীয়তাবাদীদের কাছে তাদের অবস্থানকে পাকা করেছে। সিংহলিজ জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে চীনবিরোধী সেন্টিমেন্ট বৃদ্ধির মধ্যে নয়া দিল্লির সমর্থন নিয়ে বেইজিংয়ের প্রভাবের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা শুরু করেছেন রাজাপাকসে ভাইয়েরা।

কোথায় কোথায় আছে ভারত

২০২১ সালের আগস্টে শ্রীলঙ্কা সরকার চূড়ান্তভাবে তার হাই কমিশনারকে ভারতে পাঠায় কমপক্ষে দেড় বছর বিলম্ব শেষে। অভিন্ন সভ্যতার বন্ধন এবং বৌদ্ধইজমের মধ্যে নয়া দিল্লি ও কলম্বোর মধ্যে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে একে দেখা যেতে পারে একটি দেশের সমন্বিত কৌশল হিসেবে। এরপর উচ্চ পর্যায়ের ধারাবাহিক সফর হয়েছে। এর মধ্যে আছে অক্টোবরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার কলম্বো সফর। নভেম্বরে শ্রীলঙ্কার অর্থমন্ত্রী বাসিল রাজাপাকসের নয়া দিল্লি সফর। ফল হিসেবে ভারত এখন একটি অর্থনৈতিক প্যাকেজ নিয়ে কাজ করছে এবং শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকে সহায়তার জন্য মুদ্রা বিনিময় চুক্তি করার চেষ্টা করছে। একই সময়ে বিরোধপূর্ণ ত্রিণকোমালি তেল ট্যাঙ্ক বিষয়ক ফার্ম প্রজেক্ট নিয়ে অগ্রসর হয়েছে শ্রীলঙ্কা।

ওদিকে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণে সিংহলিজ জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে যখন শত্রুতামূলক মনোভাব দেখতে পাচ্ছে চীন, তখন তারা উত্তরে তামিলদের মধ্যে তাদের প্রভাব ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। শ্রীলঙ্কায় সিংহলিজ-বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রকল্পে চীন ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখে সমর্থন দিয়েছে। এটা সিসিপির প্রভাব নিয়ে শ্রীলঙ্কার তামিলদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বেইজিং আশা করছে এমন প্রেক্ষাপটে চীন যদি আরো গভীরে প্রবেশ করতে পারে তাহলে তারা তারা শ্রীলঙ্কার তামিলদের আস্থা অর্জন করতে পারবে। ফলে এ জন্যই শ্রীলঙ্কার জেলে সম্প্রদায়কে সমর্থন দিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে বেইজিং। এক্ষেত্রে তারা কোমল শক্তি সামনে ঠেলে দিচ্ছে, বিশেষ করে যখন পক প্রণালী জুড়ে উত্তেজনা তুঙ্গে।

শ্রীলঙ্কার তামিলদেরকে ভারতের কাছ থেকে কেড়ে নেয়ার বেইজিংয়ের চেষ্টায় নয়াদিল্লির মাথাব্যথার কারণ হয়েছে। তা সত্ত্বেও, জেলেদের নিয়ে বিরোধ অব্যাহতভাবে নয়া দিল্লির কাছে কম অগ্রাধিকারে থাকার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। গ্রেপ্তার করা জেলেদের অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে ভারতকে দুই দেশের মধ্যে জেলে নিয়ে যে সঙ্কট তা সমাধানের জন্য সমঝোতার দিতে অগ্রসর হওয়া উচিত। এই প্রেক্ষাপটে বেইজিংপন্থি তামিল নেতাদের এই বিরোধকে আন্তর্জাতিকীকরণ করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়া উচিত ভারতের। এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কার সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীতে নয়া দিল্লির ভূমিকাকে সিংহলি জাতীয়তাবাদীরা ভাল চোখে দেখেন না। ভারত যদি জেলেদের বিরোধ সমাধানে অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভারতপন্থি শ্রীলঙ্কান তামিলরা পা পিছলে নয়া দিল্লি থেকে দূরে সরে যাওয়ার সমূহ বিপদ আছে।