আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫, ২০২১

তামিল সমস্যার ভূরাজনীতি: দিল্লীর অনধিকার চর্চার বিরুদ্ধে লঙ্কান জাতীয়তাবাদ

ISSUE-2-ENG-30-09-2020-SL (1)
মাহিন্দা ও মোদি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার শ্রীলঙ্কার প্রতিপক্ষ মহিন্দা রাজাপাকসার মধ্যকার ভার্চুয়াল বৈঠকটি স্বপ্নময় হতে পারত। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো নেতার সাথে মোদির এ ধরনের শীর্ষ বৈঠক এটিই প্রথম। প্রত্যাশা ছিল বিপুল। কিন্তু বিভেদ রেখা দৃশ্যমান হয়ে পড়েছে।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর হওয়া শীর্ষ বৈঠকের পর ইস্যু করা যৌথ বিবৃতিতে শ্রীলঙ্কার তামিল সমস্যার মূল ইস্যু সম্পর্কে বলা হয় যে প্রধানমন্ত্রী মোদি শ্রীলঙ্কা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমন্বয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়াসহ ঐক্যবদ্ধ শ্রীলঙ্কার মধ্যে সাম্য, ন্যায়বিচার, শঅন্তি ও মর্যাদার জন্য তামিল জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে শ্রীলঙ্কা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী মহিন্দা রাজপাকসা আস্থার সাথে বলেন যে সাংবিধানিক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন ও শ্রীলঙ্কার জনসাধারণের ম্যান্ডেট অনুযায়ী তামিলসহ সব জাতিগত গ্রুপের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে শ্রীলঙ্কা কাজ করে যাবে।

স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে, রাজাপাকসা ২০১৫ সালে তাকে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসা সরকার ওগুলো বাস্তবায়নে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পূরণে কোনো ধরনের অঙ্গীকার করেননি। তিনি বরং বলেছেন, তিনি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ম্যান্ডেট ও প্রাসঙ্গিক ধারা অনুযায়ী জাতীয় সমন্বয় সাধন করবেন, তামিলসহ সব জাতিগত গ্রুপের প্রত্যাশা পূরণ করবেন।

মজার ব্যাপার হলো, নির্বাচনে রাজাপাকসা যে বিপুল ম্যান্ডেট পেয়েছে সে কথাটির দিকে মোদির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, আমাদের দায়িত্ব হলো সবার জন্য, সবার সাথে কাজ করা। সংক্ষেপে বলা যায়, তিনি মোদিকে বলে দিয়েছেন যে সমন্বয় প্রক্রিয়াটি হতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য। এর অর্থ হচ্ছে, মোদি ভুল পথে চলেছেন। কঠোর বাস্তবতা হলো, মোদির সরকারও ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের নীতি বাস্তবায়ন করছে।

সিংহলি সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ইতোমধ্যেই দাবি ওঠেছে যে ১৩তম সংশোধনী বাতিল করা উচিত। তা সত্ত্বেও মোদি চাপ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কার্যত, ত্রয়োদশ সংশোধনী বাস্তবায়ন অপরিহার্য বলে মোদি জোরালো দাবি প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন রাজাপাকসা।

শ্রীলঙ্কার তামিল সমস্যার ঐতিহাসিক ভূরাজনৈতিক মাত্রা রয়েছে। কূটনৈতিক ময়দানে ভারত হলো স্টার পারফরমার। ভারতের হস্তক্ষেপ বিভিন্ন সময়ে নানা অবয়ব লাভ করেছে। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিক থেকে পাশ্চাত্যপন্থী শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট জে আর জয়াবর্ধনের (১৯৭৮-৮৯) ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য তামিল সমস্যাকে ব্যবহার করেছে।

কিন্তু শ্রীলঙ্কা বেশ কূটনৈতিক দক্ষতার সাথে ভারতের অনাধিকারচর্চামূলক নীতি এড়িয়ে যেতে সমর্থ হয়। ১৯৮০-এর দশকের মধ্যভাগে জয়াবর্ধনে অত্যন্ত মেধার সাথে তামিল জঙ্গি গ্রুপগুলোর গুরুর ভূমিকা ত্যাগ করে তাদের খতম করতে ভারতকে প্রলুব্ধ করতে সক্ষম হন।

পরের দুই দশকে ভারতের হিসাবে ভূরাজনীতি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে, যা ২৬ বছরের লড়াইয়ের পর ২০০৮ সালে তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোতে সফলভাবে পরাজিত করতে কলম্বোর জন্য সহায়ক হয়।

মোদি সরকারের প্রবেশ। ২০১৪ সালে ভূরাজনীতি প্রায় রাতারাতি ফিরে আসে। এর প্রধান কারণ মোদি সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে চীনের বিরুদ্ধে বৈরিতা প্রবেশ করে। ২০১৫ সালের জানুয়ারি শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিদেশী শক্তিগুলো রাজাপাকসার কট্টর জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব উৎখাতের জন্য জোট বাঁধে। দিল্লী ও ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে রাজাপাকসা ছিলেন চীনপন্থী।

এই সরকার পরিবর্তন ছিল অনন্য ঘটনা। এতে তামিল ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সের (টিএনএ) অধীনে তামিলরা কলম্বোতে সিংহলি-নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠিত সরকারকে উৎখাত করে ফেলে। তবে ভূরাজনৈতিক প্রকল্পের আদর্শ উপমা এই পরিবর্তন কিন্তু তামিলদের স্বার্থে হয়নি। ২০১৫ সালের সরকার পরিবর্তন অল্প সময়ের মধ্যেই তামিলদের সমস্যায় ফেললেও দিল্লী ও ওয়াশিংটন শ্রীলঙ্কার মাটিতে তাদের অবস্থান জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর একটি কারণ চীনকে সংযত করতে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল গ্রহণ।

নতুন এজেন্ডা হলো রাজাপাকসা সরকারকে কোয়াডে (যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে জোট) অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু শ্রীলঙ্কার জাতীয়তাবাদীরা এশিয়ার বেশির ভাগ দেশের মতো কোয়াড বা বেইজিংয়ের মধ্যে কোনো পক্ষ নিতে আগ্রহী হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে কলম্বোর ওপর তামিল সমস্যার চাপ উপস্থিত হয়। শ্রীলঙ্কার মানবিক হস্তক্ষেপ হলো একটি ভূরাজনৈতিক এজেন্ডার অনুসরণ। কিন্তু মহিন্দা রাজাপাকসা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার। তিনি ৭১ ভাগ ম্যান্ডেট পেয়ে সরকার গঠন করেছেন। তিনি তার ক্ষমতায় ফেরার জন্য দিল্লী বা ওয়াশিংটনের কাছে ঋণী নন।

গত সপ্তাহের ভার্চুয়াল শীর্ষ বৈঠক প্রকাশ করে যে শ্রীলঙ্কার জাতীয়তাবাদ দিল্লীর অনধিকার হস্তক্ষেপ নীতির বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থানে রয়েছে। দিল্লী অবশ্য বৌদ্ধবাদী সম্পর্ক বিকাশের জন্য ১৫ মিলিয়ন ডলারের মঞ্জুরির টোপ ফেলেছে। কিন্তু শক্তিশালী বৌদ্ধবাদ বিকাশে ভারতীয় উদ্দেশ্য নিয়ে কলম্বো এখনো বেশ সতর্ক। ২০১৪-১৫ সময়কালের ক্ষমতাসীন সরকারকে অস্থিতিশীল করার স্মৃতি এখনো সজীব রয়ে গেছে।

শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ বিষয়াদিতে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতীয় হস্তক্ষেপ সামাল দিয়ে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে কলম্বো এখন অনেক ভালো অবস্থানে আছে। 

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে কলম্বোকে অন্তর্ভুক্ত করা কোয়াডের জন্য খুবই দরকারি বিষয়। শ্রীলঙ্কায় আমেরিকান সামরিক উপস্থিতি ভারত মহাসাগরের নৌচলাচল রুট নিয়ন্ত্রণ (যা চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ) করতে তথাকথিত আইল্যান্ড চেইন কৌশলকে এগিয়ে নেবে।

গত বছর থেকে শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা শ্রীলঙ্কা সরকারকে হুমকি দিয়ে আসছে যে কলম্বো যদি ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে সহযোগিতা না করে, তবে ২০০৭-০৮ সময়কালে তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মানবাধিকার রেকর্ড তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে।

সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, মোদির ভার্চুয়াল শীর্ষ বৈঠকের আমন্ত্রণ গ্রহণের সময়ই রাজাপাকসা অনুমান করতে পেরেছিলেন যে তামিল সমস্যাটি নিয়ে আসা হবে। তিনি জবাব দিতে প্রস্তুত ছিলেন। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে শক্তি প্রয়োগের ধারণাটি ভারতের স্বার্থের কতটুকু অনুকূল হবে তা দিল্লীর ভেবে দেখা উচিত।