আমরা লাইভে English বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৫, ২০২১

লঙ্কান চা: মহামারির সময়ে সান্ত্বনা

SAM SPECIAL-ENG-03-10-2020 (1)
মেরিল ফার্নান্ডো

এখানে শ্রীলঙ্কার বৃহত্তম চা কোম্পানি দিলমা টি’র প্রতিষ্ঠাতা মেরিল ফার্নান্ডোর একটি সাক্ষাতকার প্রকাশ করা হলো। বিশুদ্ধ সিলন চা উৎপাদন ও বিপণনও করে এই প্রতিষ্ঠান।

সাউথ এশিয়ান মনিটর (স্যাম): আপনি দিলমা টির প্রতিষ্ঠাতা। শ্রীলঙ্কার এ প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম চা রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান। আপনার বয়সও ৯০ পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো খুবই ব্যস্ত সময় কাটান। কোন ধরনের জীবনযাত্রা অনুসরণ করে এই বয়সেও আপনার মানসিক ও শারীরিক শক্তি ধরে রাখতে পেরেছেন বলে আপনি মনে করেন, তা কি আন্তর্জাতিক পাঠকদের জানাবেন?

মেরিল ফার্নান্ডো (এমএফ): অল্প বয়স থেকেই আমি খুবই কঠোর পরিশ্রম করেছি। কোনো কোনো সময় দিনে ২০ ঘণ্টাও কাজ করেছি। ওই সময় আমরা সিঙ্গেল অরিজিন টি ব্র্যান্ড দিলমা প্রতিষ্ঠা করছিলাম। জায়ান্টদের সাথে প্রতিযোগিতা করার চেষ্টা করার জন্য সবাই আমাকে বিদ্রূপ করেছে। আমি একাই লড়াই করে গেছি। আর এই লড়াই আমাকে নিবেদিতপ্রাণ ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে গড়ে তুলেছে। এটিই আমাকে আজকের দিনে নিয়ে এসেছে। এটিই আমাকে ৫০ বছর বয়সের মতোই এখনো মানসিকভাবে সক্রিয় রেখেছে।

আমি প্রথমে নিজস্ব ব্র্যান্ডের চা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমাদের শ্রমিকদের সহায়তা করতে এবং সব মুনাফা দেশেই রেখে দিতে। বিদেশী কোম্পানি হলে এমনটা করা সম্ভব হতো না। তাছাড়া আমি তাজা, অমিশ্রিত, বিশুদ্ধ সিলন চায়ের, যা শ্রীলঙ্কার পাহাড়ি এলাকায় জন্মায়, মান ধরে রাখতে চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম, বিশ্বের সবচেয়ে ভালো চায়ের উৎপাদনে অবদান রাখতে।

স্যাম: কিভাবে শুরু করলেন এবং এই পর্যায়ে এসেছেন?

এমএফ: স্কুলে পড়ার সময় ছুটির দিনগুলোতে আমার বন্ধুদের এস্টেটে যেতাম। এস্টেট জীবন বেশ উপভোগ করতাম। চা উৎপাদন ও তৈরীর সাথে পরিচিত হয়েছি এভাবেই। চা ফ্যাক্টরির আশপাশে যে ঘ্রাণ থাকত, তা আমি ভালোবাসতাম। চা-পাতা সংগ্রহকারী শ্রমিকের আমি প্রশংসা করতাম। তারা খুবই ধার্মিকভাবে তাদের সন্তানদের গড়ে তুলত।

চা-বাগান ব্যবস্থাপনা স্থানীয়দের জন্য উন্মুক্ত করা দেয়ার সময় চা বাছাই ও বাণিজ্য ছিল নিষিদ্ধ। ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর ছিল আধিপত্য। তখন মনে করা হতো যে স্থানীয়রা মশলাদার খাবার খায় বলে তারা চায়ের স্বাদ বোঝে না। সেই অনুযাযী, আমাদেরকে আকর্ষণীয় চা শিল্প থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। সৌভাগ্যবশত, টি কন্ট্রোলার একটি ব্রিটিশ কোম্পানির তার দাফতরিক টি টেস্টারের অধীনে প্রশিক্ষণের জন্য স্কুল ত্যাগকারীদের নিয়োগ করা শুরু করেন। বেশির ভাগ রিক্রুট উচ্চ সমাজের হলেও আমি স্থান পেয়ে যাই।

ছয় মাস পর আমি ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং শেখার জন্য লন্ডন যাই। ওই সময় মিনচিং লেন ছিল বিশ্বের চা সেন্টার। সেখানে যা দেখলাম, তাতে কষ্ট পেলাম, আশ্চয় হলাম আমাদের ভালো, উচ্চমানের সিলন চায়ের সাথে আরো সস্তা চা মিশিয়ে সিলন টি নামে বিক্রি করা হচ্ছে। তখন আমার বয়স ছিল ২৪ বছর। আমি তখনই সংকল্প করলাম, আমি নিজস্ব ব্র্যান্ডের চা তৈরী করব। এই ব্র্যান্ড চায়ের বিশুদ্ধতা ধরে রাখবে।

আমি দিলমা শুরু করি ১৯৮৮ সালে। আমার দুই ছেলে দিলশান ও মালিকের নামে এই নাম। দিলমায় মান ধরে রাখার দায়িত্ব ব্যক্তিগত হাতে নিলাম। এটা অবয়বহীন ব্র্যান্ড ছিল না। আমি প্রতিটি দিলমা টি প্যাকে আমার ছবি দিলাম। ফলে আমি মান বজায় রাখতে ছিলাম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

আমি শুরু করি ১৮ জন কর্মী দিয়ে। এখন কেবল কলম্বো কারাখানাতেই আছে ১,৪০০ কর্মী, ১৬ হাজার প্লান্টেশন কর্মী। আমাদের এস্টেট রত্নপুরা থেকে নয়ালাতিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। আমরা আমাদের সব স্টাফের সন্তানদের শিক্ষায় সহায়তা করি।

স্যাম: সাত দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ব্যবসায়ী হিসেবে কোভিড-১৯ সময়কালকে কিভাবে দেখছেন?

এমএফ: আমার ব্যবসায়িক জীবনে কোভিড-১৯ সবচেয়ে বিপর্যয় শক্তি মনে করছি। জীবন আমাকে শিখিয়েছে যে প্রতিটি দুর্ভাগ্যে অদেখা একটি সুযোগও থাকে। সেটির সন্ধান পাওয়া গেলে সৌভাগ্যের দেখা মেলে। বর্তমান সময়ে নতুন নতুন উদ্যোগ গড়ে ওঠছে। যারা সমস্যায় আছে, তারা তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেভাবে পরিচালনা করার দরকার ছিল, সেভাবে করেনি। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর পতন ঘটবে, শক্তিশালীগুলো আরো শক্তিশালী হবে।

স্যাম: বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় আমরা কিভাবে কাটিয়ে ওঠতে পারব বলে আপনি মনে করেন?

এমএফ: বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষিত করতে হবে। ফাস্ট ফুড এড়িয়ে যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণ করতে হবে। আজ যেসব ফল, সব্জি ও গোশত খাচ্ছি, সবকিছুতেই থাকছে রাসায়নিক। আপনি আপনার আঙিনায় প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন না কলে খামারের উৎপাদন ও স্থানীয় মুদি দোকানের ওপর নির্ভর করতেই হবে। গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণ দিয়ে সহায়তা করতে হবে। তারা যাতে পারিবারিকভাবে উৎপাদন ও বিপণন করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

স্যাম: মহামারিজনিত বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধসে সাধারণভাবে শ্রীলঙ্কার চা কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?

এমএফ: বস্তুত, বর্তমানের মতো সময়ে চা পান বেড়েই যায়। কোনো কোনো ভোক্তা আরো সস্তা ব্র্যান্ডের দিকে গেছে। এর ফলে আমার রফতানি হ্রাস পেয়েছে। তবে অতীতে আমরা আরো কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে পড়েছি। আমাদের তাই সতর্কভাবে এগিয়ে যেতে হবে।

স্যাম: অনেক কোম্পানির মতো আপনিও কি বর্তমান মহামারির কারণে লোকজনকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করেছেন?

এমএফ: না। কোনোভাবেই তা করিনি। আমাদের পুরনো কোম্পানি। আমরা এ ধরনের অবস্থা থেকে নিজেদের রক্ষা করেছি।

স্যাম: দেশ হিসেবে শ্রীলঙ্কা কিভাবে কোভিড-১৯-এর সামাজিক সংক্রমণ পুরোপুরি প্রতিরোধ করতে পারবে বলে আপনি মনে করেন?

এমএফ: আয়ুর্বেদ, সিদ্ধা ও উনানির মতো দেশীয় ওষুধ ভারত ও আরবে সৃষ্টি হয়েছে। লোকজন এসবের কথা জানে। আর শ্রীলঙ্কায় আরো প্রাচীন হেলা বেদা বা দেশিয়া চিকিৎসা নামে ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা চায়ে দ্রবীভূত অনন্য হার্বাল ওষুধের সন্ধান দিতে পারি বিশ্বকে। আমরা এ নিয়ে অনেক প্রকাশনা করেছি। শ্রীলঙ্কান ফার্স্ট এইড বক্সে দিলমার ওই চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকে। ২০১২ সালে আমরা দিলমা কনজারভেশন্স হেরিটেজ কনজারভেশন কর্মসূচি শুরু করেছি।

স্যাম: এখন জলবায়ু পরিবর্তন ও বন উজার করা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। দিলমা বন উদ্যান ধারণা সামনে এনেছে। এটি ব্রিটিশদের প্রবর্তিত মনোকালচার পদ্ধতির মতো নয়। এটি কি শ্রীলঙ্কার মৌলিক ব্যবস্থা?

এমএফ: জ্বি। আমরা বন উদ্যোনে চা চাষের ধারণা সৃষ্টি করেছি। আমরা বলতে চাচ্ছি যে আমাদের প্রতিটি পণ্য প্রকৃতির উপাদান। শ্রীলঙ্কার অনন্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে দিলমা টি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য ২০০৭ সালে আমরা আলাদা একটি কাঠামো গড়ে তুলেছি।

আমি বিশ্বাস করি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে যে মাটিতে আমরা কাজ করি তা সুরক্ষিত রাখা। আর এভাবেই শ্রীলঙ্কার চা শিল্পকে টেকসই নিশ্চিত করা সম্ভব।