আমরা লাইভে English শনিবার, মার্চ ০৬, ২০২১

‘এক দেশ-এক আইন’ ধারণার সূচনা করবে শ্রীলঙ্কার নতুন সংবিধান

TOP NEWS-ENG-31-08-2020

৫ আগস্টের পার্লামেন্ট নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে শ্রীলংকা পোদুজানা পেরামুনা (এসএলপিপি) দলের মাইলফলজ বিজয়ের পর ২৫ দিন পার হয়ে গেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসা আর তার ভাইদের তৈরি চার বছর বয়সী দলটি যে বিজয় অর্জন করেছে, সেটা একই সাথে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সব রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে মুছে দিয়েছে। সাবেক সরকারি দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) পার্লামেন্ট থেকে পুরোপুরি মুছে গেছে এবং তাদের একটিও রাজনৈতিক আসন সেখানে নেই। 

২০১৫ সালে ইউএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অবদান ছিল সংবিধানের ১৯তম সংশোধনী নিয়ে আসা। এই সংশোধনীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা অনেকখানি কমিয়ে আনা হয়েছিল। 

এসএলপিপি এখন বিষয়টি সংশোধনের দায়িত্ব নিয়েছে এবং সম্ভবত আগের সরকারের ঠিক উল্টোটা করবে তারা; প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে; যেহেতু তারা মনে করে যে, ২০১৯ সালের নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সেটা করার জন্য জনসমর্থন তারা পেয়েছে। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সরকার এখন ২০তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৯তম সংশোধনী পরিবর্তনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দেখছে। 

সরকারি পত্রিকা সানডে অবজার্ভার ৩০ আগস্ট ‘দায়িত্বশীল সূত্রের’ উদ্ধৃতি দিয়েছে, যিনি বলেছেন যে, সংবিধানের ২০তম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯তম সংশোধনীর অনেক বিষয় বদলে ফেলা হবে এবং কিছু জিনিস অক্ষত রাখা হবে, এবং নভেম্বরে ২০২১ সালের বাজেটের আগেই এটা পার্লামেন্টে পেশ করা হবে। নতুন নিযুক্ত আইন মন্ত্রী আলী সাবরি এরইমধ্যে মন্ত্রিসভার সবশেষ বৈঠকে ২০তম সংশোধনীর প্রস্তাব দিয়েছেন। রাজনৈতিক সূত্র এবং সানডে অবজার্ভারের প্রতিবেদন অনুযায়ী নতুন আইনের খসড়া তৈরির কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। 

রাজাপাকসারা গত বছর দাবি করেছিলেন যে, ১৯তম সংশোধনী করা হয়েছে মূলত রাজাপাকসা পরিবারকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার জন্য। (যেমন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে অংশ নেয়ার বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছে এবং ন্যূনতম বয়স ৩৫ বছর করা হয়েছে)। ২০১৮ সালে ভারত সফরকালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসা ভারতীয় মিডিয়াকে বলেছিলেন যে, তার ছেলে নামাল রাজাপাকসা ২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য একজন সম্ভাব্য প্রার্থী, কিন্তু ১৯তম সংশোধনীর কারণে সে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার হারায়। ১৯তম সংশোধনীতে আরও যোগ করা হয় যে, দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী কেউ পার্লামেন্ট সদস্য হতে পারবে না। এটাকেও রাজাপাকসা পরিবারকে ঠেকানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসা গত বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিশাল বিজয় লাভ করেন এবং নির্বাচনের কয়েক মাস আগে তাকে মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়তে হয়েছে। অন্যদিকে এসএলপিপি দলের কৌশলবিদ বাসিল রাজাপাকসা একজন মার্কিন নাগরিক হওয়ায় রাজনীতিতে ঢুকতে পারেননি তিনি। 

১৯তম সংশোধনীর প্রধান পরিকল্পনাকারী ইউএনপি নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিঙ্গেকে ভোটাররা পার্লামেন্ট থেকে বের করে দিয়েছে। পার্লামেন্টে বিরোধী দল হিসেবে রযেছে ইউএনপি থেকে আলাদা হয়ে আসা সামাগি জন বালাবেগায়া (এসজেবি)। কিন্তু এসজেবি এসএলপিপি দলের পরিকল্পনার বিরোধিতা করবে না বলেই মনে হয়, কারণ পার্লামেন্টে তাদের যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব নেই। আর তাছাড়া প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসার সাথেও এসজেবি’র সম্পর্ক তাদের নিজের দলের নেতাদের চেয়ে ভালো। 

আপাতত দৃশ্যপট থেকে বিরোধী দল মুছে যাওয়ায় এসএলপিপি’র শাসন ব্যবস্থা সংহত করার সবশেষ পদক্ষেপ হবে এমন একটা সংবিধান তৈরি করা, যেটা বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় করবে। রাজাপাকসাদের যুক্তি হলো শক্তিশালী প্রেসিডেন্টের জন্য শক্তিশালী ক্ষমতা থাকলে জাতীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের জন্য সেটা অনুকূল হবে। 

বিগত ইউএনপি সরকারের সময় সবশেষ যখন সংবিধান পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, যখন জাতিগত তামিলদের বিষয়টি সুরাহা করতে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের জন্য পরিবর্তন আনা হয়েছিল। খোলামেলা পশ্চিমাপ্রীতির বাইরে ইউএনপি’র জনপ্রিয়তা হারানোর আরেকটি কারণ হলো তাদের এই প্রচেষ্টা, যেটাকে দেশের জন্য হুমকি ও বিচ্ছিন্নতাবাদ উসকে দেয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিল জনগণ। যে পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিল ইউএনপি, তখন তামিল ইস্যুতে সংবিধান পরিবর্তনের জন্য কোন ঐক্যই তারা গড়তে পারেনি। শ্রীলংকায় যে ৩০ বছরের দীর্ঘ জাতিগত সঙ্ঘাত হয়েছে, সেটার কারণ হলো দেশের উত্তরাঞ্চলে আলাদা তামিলভূমির জন্য এলটিটিই’র আকাঙ্ক্ষা। ২০০৯ সালের মে মাসে এলটিটিই লংকান সামরিক বাহিনীর হাতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর পার্লামেন্টে তামিলদের প্রতিনিধিত্বকারী সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল তামিল ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (টিএনএ) একটা ফেডারেল ধরনের সংবিধান প্রণয়নের জন্য চেষ্টা চালায়। 

কিন্তু, প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনে সংখ্যাগুরু সিংহল ভোটারদের ভোট যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, সেখানে তামিলদের এই প্রচেষ্টা মূল্যহীন হয়ে পড়েছে, কারণ সুস্পষ্ট বিজয়ের জন্য আগে যে তামিল আর মুসলিমদের সমর্থনের দরকার পড়তো, সেই বাস্তবতাটা এখন আর নেই। 

ইউএনপি সংবিধান থেকে নির্বাহী ক্ষমতাকে কমিয়ে আনার কারণকেই তাদের সরকারের ব্যর্থতার জন্য দায়ি করা হয়। ইউএনপি এসএলএফপি’র সাথে জোট বেঁধেছিল এবং এসএলএফপি চেয়ারপার্সন মৈত্রিপালা সিরিসেনাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমর্থন দিয়েছিল, কিন্তু তারা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হন। ১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হ্রাসের সিদ্ধান্তকে এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে দেখা হয়। তাছাড়া প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সঙ্ঘর্ষের কারণে ২০১৮ সালের অক্টোবরে একটা সাংবিধানিক সঙ্কটও সৃষ্টি হয়েছিল। 

মাহিন্দা রাজাপাকসা ও গোতাবায়া রাজাপাকসা তাদের পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পুরো প্রচারণার সময়টাতেই ২০১৫ সালের সংবিধানের সংশোধনী পরিবর্তনের কথা বলে এসেছেন। 

বর্তমান সরকার তামিল ও মুসলিম সংখ্যালঘুদের বলে এসেছেন যে, সিংহলীয়দের ইচ্ছা বর্তমান সরকারে প্রাধান্য পাবে এবং সিংহলী বৌদ্ধদের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। 

প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসার নির্বাচন পরবর্তী নীতি বক্তৃতায় এই বিষয়টি স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। 

পার্লামেন্টে শ্রীলংকা পোদুজানা পেরামুনা (এসএলপিপি) সরকারের নীতি বিবৃতি তুলে ধরে দেয়া বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া বলেন যে, তার নতুন সরকার নতুন সংবিধান নিয়ে আসবে এবং ‘এক দেশ- এক আইনের’ ধারণাকে অগ্রাধিকার দেবে, এবং সেই অনুসারে ১৯তম সংশোধনী বিলুপ্ত করা হবে। 

প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসা ২০ আগস্ট পার্লামেন্টের আনুষ্ঠানিক অধিবেশনে বলেন, ৫ আগস্টের নির্বাচনের মাধ্যমে লংকান জনগণ তাদের সমর্থন দিয়েছে। এবং নতুন সংবিধান গঠনের জন্য ১৯তম সংশোধনী বিলুপ্ত করা হবে। 

প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসা আরও ঘোষণা দেন যে, দেশের ঐক্যবদ্ধ চরিত্রকে তিনি রক্ষা করবেন এবং দেশে বৌদ্ধ ধর্মকে রক্ষা করবেন এবং একই সাথে দেশের যে কোন নাগরিকের তাদের নিজস্ব ধর্ম অনুসরণের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করবেন। 

প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসা বলেছেন যে, এসএলপিপি সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন ২০১৯ সালের ইস্টার সানডে হামলার কারণে দেশের মানুষের নিরাপত্তা জনিত আত্মবিশ্বাস দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি আরও বলেন, “আমরা দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছি যে, আমাদের সরকারের প্রধান নীতি হলো জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আমরা নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে ঢেলে সাজিয়েছি, মানুষের ভয় দূর করেছি, এবং এর মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তা ফিরিয়ে এনেছি। আমরা এমন একটা পরিবেশ তৈরি করেছি, যেখানে যে কোন নাগরিক কোন নিরাপত্তার শঙ্কা ছাড়াই মুক্তভাবে বাস করতে পারে”। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের জন্য তার সরকার কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 

একটা নিরাপদ দেশ এবং একটা শক্তিশালী সরকার গড়ার জন্য এসএলপিপির যে ধারণা, সেটার সারবস্তু লুকিয়ে আছে একটা শক্তিশালী নির্বাহী প্রেসিডেন্সির মধ্যে, যেটার ভিত্তি হলো ১৯৭৮ সালের সংবিধান। যে সংবিধান প্রণয়নের সময় সাবেক প্রেসিডেন্ট জে আর জয়াবর্ধনা তার বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যে সংবিধান তিনি তুলে ধরেছেন, সেখানে প্রেসিডেন্ট একটা জিনিসই শুধু করতে পারেন না, সেটা হলো পুরুষকে নারী করা।