আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

এখন চাঙ্গা মিয়ানমারের অর্থনীতি, তবে ভবিষ্যত ঝুঁকিপূর্ণ

মিয়ানমারের অর্থনীতি এখন অত্যন্ত চাঙ্গা মনে হচ্ছে, তবে এর ভবিষ্যত অনিশ্চিত। অন্তর্নিহিত অভ্যন্তরীণ ইস্যু ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রবণতাকে সামনে রেখে এমন ধারণা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

সম্প্রতি প্রকাশিত ষন্মাসিক ‘মিয়ানমার ইকোনমিক মনিটরে’ বিশ্বব্যাংক ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে আসন্ন অর্থ বছরে দেশটির অর্থনীতি ৬ ভাগের বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে, যা আগের বছরের প্রবৃদ্ধির চেয়ে সামান্য বেশি। তবে একই সময় এতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে যে দেশটিতে চলমান সঙ্ঘাত দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ইয়াঙ্গুনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করার সময় বিশ্বব্যাংক মিয়ানমারের প্রধান অর্থনীতিবিদ হ্যান্স আনন্দ বেক বলেন, মিয়ানমার অব্যাহতভাবে বিপুল প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশের অবনতি হতে থাকায় চলমান সঙ্ঘাতের চ্যালেঞ্জগুলোর মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলী দেশের দীর্ঘ মেয়াদি সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সশস্ত্র গ্রুপ ও সঙ্ঘাতের উপস্থিতির ফলে দেশের এক তৃতীয়াংশ এলাকায় ব্যবসার জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে। সঙ্ঘাতময় এলাকায় ব্যবসা অব্যাহত রাখার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। সর্বোপরি সঙ্ঘাতের ফলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি নিরুৎসাহিত করছে।

তিনি বলেন, সঙ্ঘাতের উৎস বন্ধ করতে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে হবে। এছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক কর্মসম্পাদনা দক্ষতা বাড়াতে হবে বেসরকারি খাতে।

বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে কম হচ্ছে, বাণিজ্যিক উত্তেজনা রয়ে গেছে। এগুলো মিয়ানমারের ভবিষ্যত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব বিস্তার করবে। মধ্য প্রাচ্যের উত্তপ্ত অবস্থার ফলে তেলের দাম বাড়তে পারে। এতে করে ডলারের দাম বেড়ে যেতে পারে। এসবেরও প্রভাব রয়েছে অর্থনীতির ওপর।

তবে বিশ্বব্যাংক এখনো আশা করছে যে পরিবহন ও টেলিযোগাযোগ খাতে বিপুল বেসরকারি ও সরকারি বিনিয়োগ বাড়ার ফলে জোরালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে। তাছাড়া ২০২০ সালের নির্বাচন পরিক্রমায় অবকাঠামো খাতে সরকার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, সেটিও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, সংস্কারের ফলে বিশ্বব্যাংকের ‘ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্সে’ মিয়ানমারের অবস্থান ভালো হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের এই ইতিবাচক মূল্যায়ন ইউরোপের বেশ কয়েকটি কোম্পানিও সমর্থন করেছে। তবে তারা বিশ্বব্যাংকের অনেক আশঙ্কার সাথেও একমত প্রকাশ করেছে।

ডিসেম্বরে প্রকাশিত বার্ষিক ইউরো চাম মিয়ানমার বিজনেস কনফিডেন্স সার্ভে অনুযায়ী ইউরোপিয়ান ব্যবসায়ীরা এখন মিয়ানমারে দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসা করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। এক বছর আগের চেয়েও তারা এখন মিয়ানমারকে নিয়ে অনেক বেশি আশাবাদী।

সীমাক্ষায় দেখা যায়, গত বছরের চেয়ে এবার পরিবেশের উন্নতি হয়েছে ৩৫ ভাগ। সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন দেখা গেছে আইনি কাঠামোর দিক থেকে। সাউথ এশিয়ান মনিটরকে এমন বলেছেন ইউরো চাপ মিয়ানমারের ব্যবসা উন্নয়ন ম্যানেজার গার্ডিয়েন ভেলিঙ্ক।

জরিপে অংশ নেয়া এক তৃতীয়াংশের বেশি কোম্পানি জানিয়েছে, গত ১২ মাসে স্থানীয় ব্যবসায়িক পরিবেশের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। এটি গত বছরের জরিপের চেয়ে ২০ ভাগ বেশি। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইউরোপিয়ান কোম্পানি মনে করে, মিয়ানমারের ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি হয়েছে কিংবা অন্তত উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

ইউরো চাম মিয়ানমারের প্রধান নিকোলাস ডেলাঙ্গে বলেন, ইউরোপিয়ান ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাস থাকার বিষয়টি তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। তারা মান্দালয় ও শান রাজ্যের মতো নতুন নতুন রাজ্য ও নগরীতে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে।

ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগই আশা করছে যে আগামী বছরগুলোতে তাদের বাজার হিস্যা বাড়বে। জরিপে অংশ নেয়া বেশির ভাগ কোম্পানি আশা করছে, আগামী বছরগুলোতে তাদের মুনাফা বাড়বে কিংবা অন্তত একই রকম থাকবে।

মিয়ানমারের সম্ভাবনা নিয়ে ইউরোপিয়ানরা আশাবাদী থাকলেও অধিকতর বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। প্রায় অর্ধেক কোম্পানিই আগামী বছরগুলোতে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করছে না। ইউরোপিয়ান ব্যবসায়িক সমীক্ষা অনুযায়ী বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মিয়ানমারের সম্ভাবনার রাশ টেনে ধরছে।

ভেলিঙ্ক বলেন, আইনগত অনিশ্চয়তা ছাড়াও ব্যবসায়ীরা দক্ষ শ্রমিকের অভাবকে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এই কারণেও দেশটিতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তাছাড়া এখানে ব্যবসা করতে গিয়ে ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলো দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে বাধার মুখে পড়তে পারে। এসব সমস্যার সমাধান না করা হলে দীর্ঘ মেয়াদে ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলো আসবে না। তাছাড়া দুর্বল স্বাস্থ্য পরিচর্যা, শিক্ষা ইত্যাদি খাতের দিকেও জরুরি ভিত্তিতে নজর দিতে হবে।

মিয়ানমারের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী মনে করেন, মিয়ানমারের উন্নয়ন ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বর্ধিত নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ অত্যাবশ্যক। বিনিয়োগকারী জাও নাইঙ বলেন, যথার্থ ও পর্যাপ্ত অবকাঠামো ছাড়া বিনিয়োগ করতে কেউ আগ্রহী হবে না।

তবে আরো বেশি কাজ করতে হবে আর্থিক খাতকে উন্নয়নে। এই খাতের উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সবাই একমত। ইতোমধ্যেই এ ব্যাপারে কাজ শুরু করেছে সরকার। আগামী দিনগুলোতে এ ব্যাপারে নতুন আরো কিছু ঘোষণা আসতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্মার্ট গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রধান ও প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক কিয়াও কিয়াও হ্লাইঙ বলেন, চলতি বছরের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে আমি মাত্রাতিরিক্ত আশাবাদী হতে পারি না। ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্যাসি (এনএলডি) ক্ষমতায় ফিরে আসবে এবং আমরা প্রায় একই অবস্থায় থাকব। এই সরকারের বিশ্বাসযোগ্য কোনো নীতি, ভিশন বা সমন্বিত বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল নেই।