আমরা লাইভে English রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যার দায় কার!

ed_1_photo_afp-1

বিষয়টি নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। টেলিভিশন টকশো বা পত্রিকায় বিশেষ প্রতিবেদন দূরে থাক, খবর হিসেবেও বিষয়টি যেন ছিল অনাকর্ষণীয় ও অবহেলিত। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত হত্যা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের সময় এ বিষয়ে ওই নীতির যে গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে তা যেন সবার নজরই এড়িয়ে গেল।

গত ৪ মার্চ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে এক সাংবাদিক সম্মেলনে সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর এ ইচ্ছার ব্যক্ত করেন যে, ‘সীমান্তে কোনো অপরাধ, কোনো হত্যা না হওয়াই আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য হওয়া উচিৎ’। বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, সেটা যদি আমরা অর্জন করতে পারি তাহলে এ সমস্যার কার্যকর সমাধান যৌথভাবে খুঁজে বের করতে পারব।

আপাতভাবে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্য নিরীহ ও সাদামাটা মনে হলেও এর মধ্যে সীমান্ত হত্যা সংক্রান্ত ভারতীয় নীতির গুণগত পরিবর্তন লক্ষণীয়। সীমান্তহত্যা বাংলাদেশের নাগরিকদের কাছে একটি স্পর্শকাতর বিষয়। প্রতিবছর বেশকিছু বাংলাদেশি সীমান্ত হত্যার শিকার হন। অধিকার’র হিসেব অনুযায়ী ১০ বছরে ৯৩৩ জন বাংলাদেশি সীমান্ত হত্যার শিকার হয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনিয়মিতভাবে সীমান্ত অতিক্রম করার সময় তারা আক্রান্ত হন। যেমন: গরু চোরাকারবারিরা। আবার অনেক ক্ষেত্রে সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চাষবাস করা মানুষ ভারতীয় বাহিনীর গুলিবর্ষণের শিকার হন। এ ছাড়া, সীমান্তের এদিক থেকে এলাকাবাসীকে ধরে নিয়ে গিয়ে শারীরিক নির্যাতন ও হত্যার উদাহরণও রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে ভিডিও ফুটেজসহ প্রতিবেদন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে।

ভারত-বাংলাদেশে সীমান্ত হত্যা আন্তর্জাতিকভাবে একটি উদ্বেগের বিষয়। এ সীমান্তকে বিশ্বের একটি অন্যতম অনিরাপদ এবং সহিংস সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১০ সালে ডিসেম্বরে ‘ট্রিগার হ্যাপি’- বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ শিরোনামে একটি  প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে প্রায় ৪০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দু’দেশের সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর গালিগালাজ, ভীতি প্রদর্শন, নির্যাতন-নিগ্রহ, মারধর ও হত্যাসহ নানা ধরনের অপব্যবহারের উল্লেখ করেছে। বিএসএফ তার আচরণের জন্য কার্যকরভাবে দায়বদ্ধতা নেই বলেই এ ঘটনা অব্যাহতভাবে ঘটছে বলে সংস্থাটি মনে করে। গরু চোরাচালান বন্ধ করার লক্ষ্যে গৃহীত হলেও বিএসএফ’র সহিংস তৎপরতায় শিশুসহ সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর ধরে শিকার হচ্ছেন। বিএসএফ’র বিবেচনায় যারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা এবং সতর্ক না করে গুলি চালানো হয়, এটি একটি সাধারণ অভিযোগ। ভারতীয় বাহিনী কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশকারীদের সন্ত্রাসী হিসেবে দায়ী করলেও তাদের দাবির সপক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ হাজির করে না।

নিহত ব্যক্তির গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য পলায়ন অথবা আত্মরক্ষার জন্য বিএসএফ’র গুলিবর্ষণের যুক্তি ধোপে টেকে না। এসব অজুহাতে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এমনকি ভারতীয় আইনেও এর বৈধতা নেই। ভারতীয় আইন গ্রেপ্তার এড়ানো ব্যক্তিকে ধরার লক্ষ্যে শক্তি ব্যবহারের জন্য রাষ্ট্রকে ‘সব প্রাপ্তব্য পদ্ধতি’র অনুমতি দিলেও সুনির্দিষ্টভাবে প্রাণসংহার নিষিদ্ধ করেছে, যখন সম্ভাব্য অপরাধী এমন অপরাধে অভিযুক্ত নয় যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’র প্রতিবেদনে জানানো হয় যে, সীমান্ত হত্যার প্রতিটি ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা হয় নিরস্ত্র ছিল, না হয় তাদের হাতে শুধুমাত্র কাস্তে, লাঠি অথবা ছুরি ছিল। অনেক ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তিকে পেছন থেকে গুলি করা হয়েছিল, যা থেকে প্রতীয়মান হয় তারা পালাতে চেষ্টা করেছিল। খুব কাছ থেকে গুলি করা এবং শারীরিক অত্যাচারের ফলে মৃত্যুর ঘটনাও বিরল নয়। কোনো ক্ষেত্রেই মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে প্রাণঘাতী অস্ত্র বা বিস্ফোরক সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে বলে বিএসএফ দাবি করতে পারেনি। প্রাণঘাতী অস্ত্রের এ ধরনের যত্রতত্র ব্যবহারের কারণেই বাংলাদেশের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বিএসএফ’র এ আচরণকে ‘ট্রিগার হ্যাপি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

বিএসএফ’র এ ধরনের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্ত্বেও এ বাহিনীসহ ভারতের অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা ফৌজদারি মামলা থেকে দায়-মুক্তিপ্রাপ্ত। অবশ্য সরকার অনুমোদন করলে বিএসএফ’র সদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু করা যেতে পারে। যদিও বিএসএফ’র সদস্যদের ‘নিষ্ঠুর, অশোভনীয় এবং অস্বাভাবিক মর্যাদাহানিকর আচরণের জন্য’ অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থা রয়েছে, আজ পর্যন্ত ওই ব্যবস্থার অধীনে সীমান্তে হত্যাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে একজন সদস্যকেও সাজা দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি। ফেলানী হত্যার মামলার আসামিও এ প্রক্রিয়ায় দোষী সাব্যস্ত হয়নি। নয় বছর পরও এ মামলা ভারতীয় আদালতে অমীমাংসিত রয়েছে।

গত কয়েক দশক ধরে সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় তার উদ্বেগের কথা জানিয়ে এসেছে। এ হত্যার মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনার বাংলাদেশের দাবির প্রতি ভারত অঙ্গীকারবদ্ধ ছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য নানা কারণে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

প্রথমত: মন্ত্রীর এ অবস্থান ভারতের পূর্ববর্তী অবস্থানের বিপরীতমুখী এবং এই ধারণাই দিচ্ছে যে সীমান্তে অবৈধ গমনাগমন বন্ধ না হলে সীমান্ত হত্যা বন্ধ হবে না। অর্থাৎ এ হত্যার দায় বাংলাদেশকেই বহন করতে হবে। দ্বিতীয়ত: এ বক্তব্য অভিযুক্তকারী সংস্থা বিএসএফকেই একাধারে বিচারক, জুরি এবং হত্যাকারীর ভূমিকা পালনের স্বীকৃতি দিচ্ছে। যেকোনো ব্যক্তির আইনের আশ্রয় গ্রহণের অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে যেমন স্বীকৃত, তেমনি অন্যান্য যেকোনো সভ্য দেশের মত ভারতীয় আইনেও তা স্বীকৃত। কিন্তু মন্ত্রীর এ বক্তব্য অভিযুক্তকে বিচার প্রক্রিয়ায় আনার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। এতে করে বিএসএফ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীকে সীমান্তে হত্যাসহ নানাধরনের বিধিবহির্ভূত কর্ম সম্পাদন করতে যে উৎসাহিত করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তৃতীয়ত: আইনের শাসনের অন্যতম উপাদান হলো অপরাধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ শাস্তির মাত্রা। যেকোনো কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি স্বীকার করবেন যে, অভিযুক্ত গরু চোরাচালানকারী এবং সরকার প্রধান হত্যাকারীর শাস্তি এক হতে পারে না।

সীমান্ত হত্যা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট উক্তি কোনো  রাজনীতিকের অতিকথন  নয়। রাশিয়া, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করা এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর একজন পোক্ত কূটনীতিক। সুতরাং তার এ অবস্থান নিঃসন্দেহে অনেক ভাবনা-চিন্তা প্রসূত এবং একে বিবেচনায় না নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

পরিতাপের বিষয় হল, জয়শঙ্কর এ বক্তব্য যখন দিচ্ছিলেন, তখন তার পাশে বাংলাদেশের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাদের এ বিষয়ে তখন এবং পরবর্তীতে নীরব থাকা ভারতকে কি এ বার্তাই দেয় না যে, আসলেই সীমান্ত হত্যার দায় বাংলাদেশের ওপরই বর্তায়?

 

সি আর আবরার পেশায় একজন শিক্ষক। মানবাধিকার এবং অভিবাসন বিষয়ে তার আগ্রহ রয়েছে।