আমরা লাইভে English শুক্রবার, অক্টোবর ২৩, ২০২০

দুর্লভ ও বিপন্ন পাখিতে মিয়ানমারের করোনা-পরবর্তী পর্যটনে স্বপ্ন

travel-07-08-220-1-2
বিলুপ্তপ্রায় গোলাপী মাথা হাসের হাতে আঁকা ছবি

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম জলাশয় ইন্ডাগি লেক। এখানে ২০ হাজারের বেশি জলচর পাখির বাস। তবে পাখি-পর্যবেক্ষকদের টার্গেট গোলাপি মাথার হাঁস। এই পাখি একসময় ভারত, বাংলাদেশ ও উত্তর মিয়ানমারে দেখা যেত। কিন্তু ১৯৪৯ সাল থেকে উপমহাদেশে তা আর দেখা যায় না।

গোলাপি মাথা হাঁস (রোডেনেসাক্যারোফিল্যাসিয়া) হলো বিলুপ্তপ্রায় কয়েকটি পাখির অন্তর্গত। উত্তর কচিন রাজ্যের লন টনের কাছে প্রত্যন্ত এলাকায় এখন তাদের বাস। এছাড়া আরো আছে সাদা পুচ্ছবিশিষ্ট ও সরু ঠোঁটের শকুন।

পাখির ঝাঁক এবং এসব বিরল পাখি দেখার জন্য প্রতিবছর অনেক পাখি-পর্যবেক্ষক ইন্ডাগি জলাশয়ে ভিড় করেন। ইউনেস্কো একে বিশ্ব বায়োস্ফেয়ার রিজার্ভ হিসেবে ঘোষণা করেছে। মিয়ানমারের বন মন্ত্রণালয় যে ২১টি স্থানকে সম্ভাব্য ইকো-টুরিজম হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনা করছে, এটি তার অন্যতম। অন্যান্য স্থানের মধ্যে রয়েছে হিমালয়ের পুতাও ও চিন রাজ্যের মাউন্ট ভিক্টোরিয়া (নাত মা তুং নামেও পরিচিত)। এগুলো ভারতের সাথে মিয়ানমারের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত।

মিয়ানমারে কোভিড-১৯ পরবর্তী প্রয়াসে পর্যটনকে চাঙ্গা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, এসব স্থান প্রকৃতিপ্রেমীদেরকে প্রলুব্ধ করবে, বিশেষ করে পাখি-পর্যবেক্ষকদের। বিদেশী পর্যটক ২০১৬ সালের ২.৯ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ২০১৯ সালে হয়েছিল ৪.৪ মিলিয়ন। কিন্তু পশ্চিম রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার পর ইউরোপের পর্যটক আসা কমে গেছে। আর চলতি বছরে কোভিড-১৯-এর কারণে ৫৪ মিলিয়ন লোকের দেশটিকে পর্যটকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে।

তবে চীনের নতুন রেলওয়ে এবং ইকোটুরিজমের ফলে বিপুল মাত্রায় পর্যটন আবার শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

অবশ্য পরিবেশবাদীরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে স্বল্পমেয়াদি মুনাফার দিকে না গিয়ে স্থানগুলো আরো ভালোভাবে ব্যবস্থাপনা করা ও সংরক্ষণ করা উচিত। বিশেষ করে দক্ষিণ শান রাজ্যের ইনলে লেকে যা ঘটেছে, তার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হবে। সেখানে একসময় বিপুলসংখ্যায় পর্যটক যেত। কিন্তু ভাসমান বাগানের সার ও কীটনাশক ধুয়ে পানিতে মিশে গিয়েছিল। আর এতে করে বন্যপ্রাণীর ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যায়।

travel-07-08-220-2-1

travel-07-08-220-3-1
উপরে: ইন্ডাগি লেকের জলাভূমি; নীচে: ইন্ডাগি লেকে অত্যন্ত বিপদাপন্ন বিয়ার্স পোচার্ড ডাক

আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোও এই ইস্যুতে ইন্ডাগিকে সহায়তা করছে আগ্রহী। এখানেও সার ও কীটনাশকের উপদ্রুপ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কাছের ধানক্ষেত ও অবৈধ স্বর্ণখনি মারাত্মক দূষণ সৃষ্টি করছে।

অমুনাফামূলক ইকোটুরিজম সংগঠন ইন চিট থু বিদেশী ইকোটুরিস্টদের জন্য গঠন করা হয়েছে। তারা পাখি-পর্যবেক্ষকদের জন্যও বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকে। ইন্ডাগি ওয়েসল্যান্ড ইডুকেশন সেন্টারও বিদেশী সংগঠনগুলোর সহায়তায় কাজ করে থাকে। বিশেষ করে জার্মানির অর্থনৈতিক সহযোগিতা মন্ত্রণালয়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক এনজিও ফিউনা অ্যান্ড ফ্লোরা ইন্টারন্যাশনাল এ ব্যাপারে সহায়তা করে থাকে।

দীর্ঘ সফরে আসা পাখি-পর্যবেক্ষকেরা সন্দেহাতীতভাবেই পাখির প্রজনন ক্ষেত্র দেখার সুযোগও খুশি হন। তাছাড়া প্রায় ১৬০ প্রজাতির পাখি দেখার সুযোগ তো আছেই। এসব পাখির অনেকগুলো সেই সাইবেরিয়া থেকে এখানে আসে। তবে গোলাপি মাথার হাঁসও কি তাদের দলে?

তা জানার জন্য আমি চার ঘণ্টার ট্রেনে সফরে কচিন রাজ্য থেকে হপিনে যাই। সেখান থেকে এক ঘণ্টার মোটরযাত্রায় লেকে উপস্থিত হই। আমি সরকারি মালিকানাধীন ইন্ডাউ মাহার গেস্টহাউসে উঠি। মাত্র আট রুমের এই গেস্ট হাউসে উষ্ণ আতেথিয়তা পাওয়া যায়। কেবল এই গ্রামেই বিদেশীদের অবস্থান করার সুযোগ দেয়া হয়। রাস্তার পাশে জাতিগত সংখ্যালঘু রেড সান ও কচিন নারীরা স্থানীয় মধু ও ঝলসানো মাছ বিক্রি করে। 

আমার সফরের প্রথম দিনে আমি লম্বা লেজওয়ালা নৌকায় করে শেমিয়াটজু প্যাগোডায় গেলাম। পথে বিপুলসংখ্যক জলচর পাখির দেখা পেলাম। মধ্য দুপুরের রোদে স্বর্ণমণ্ডিত প্যাগোডাটি জ্বলজ্বল করছিল। বছরের বেশির ভাগ সময়েই নৌযানে এখানে আসা যায়। তবে মার্চে এখানকার উৎসবের সময় পায়ে হেঁটেই আসতে হয়।

পরের দিন আমি লেকের দক্ষিণ অংশ সফর করলাম। আমার গাইড, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অ্যাকাউন্ট্যান্ট, পাখি নিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তার নিকন বাইনোকুলারটি আমাকে দিলেন আরো গভীরভাবে পাখি দেখার জন্য। তিনি মাসে দুবার বের হন পাখি শুমারি করতে।

travel-07-08-220-4-1

travel-07-08-220-5-1
উপরে: ইন্ডাগি লেকে এক রেড শান তরুণী; নীচে: শোয়ে মাইতজু প্যাগোডা, বছরের বেশিরভাগ সময় সেখানে নৌযানে যেতে হয়

নানা ধরনের পাখি দেখার সুযোগটি পেয়েছি আমি। তবে আমার লক্ষ্য ছিল বিলুপ্তপ্রায় পাখিগুলোর দিকে। সেগুলোর সন্ধান পাওয়া খুব একটা সহজ ছিল না। তবে আমাদের সৌভাগ্য, আমরা চিত্রভ নীল পিঠের মাছরাঙা দেখতে পেয়েছি। বায়ের্স পোচার্ড হাঁসও দেখতে পেয়েছি। এই পাখিও বিপন্ন তালিকায় থাকা পাখি। এছাড়া লাল ঠোঁটের সারস খুবই ঝুঁকির মধ্যে আছে। 

তবে আমার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল গোলাপি মাথার হাঁসের দিকে। একসময় মনে হতো, এই পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ২০১৭ সালে অনেক সন্ধান করেও একটি হাঁসও পাওয়া যায়নি।

আমি ২০২১ সালে আবার আসার পরিকল্পনা করছি। ওই সময় চেষ্টা করব আরো বেশি সময় থাকার জন্য। 

ইন্ডাগিতে বিরল প্রজাতির পাখি দেখার আনন্দই আলাদা। বিশেষ করে অতি বিপন্ন বা বিরল প্রজাতির কিছু পাখি দেখার জন্য এখানেই আসতে হবে।

travel-07-08-220-1-2

annotation-2020-08-07-080653
লাল মাথা সারস