আমরা লাইভে English বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২১

হার্ভার্ডে পড়া ছেলে ও করোনায় চলে যাওয়া বাংলাদেশি বাবার গল্প

sihab-mahtab
বাবা মোহাম্মদ জাফরের সঙ্গে মাহতাব সিহাব। পারিবারিক অ্যালবামের ছবি মাহতাব সিহাবের কাছ থেকে পাওয়া

আমেরিকার ব্যস্ত অঙ্গরাজ্য নিউইয়র্কের রাস্তা এখন অনেকটাই ভুতুড়ে। রাস্তার চারপাশে ফুল ফুটে আছে, অথচ তা দেখার কোনো মানুষ নেই। এমনকি মানুষকে দেখার মতো মানুষ নেই আর। সবাই যার যার ঘরে। মানুষের বদলে রাস্তা দখল করে আছে অ্যাম্বুলেন্স ও তার বিষণ্ন সাইরেন। এই অ্যাম্বুলেন্সে যাঁরা হাসপাতালে যাচ্ছেন তাঁদের কেউ কেউ সুস্থ্ হয়ে ফিরেও আসছেন। আবার অনেকেই আর আসতে পারছেন না। যাচ্ছেন শেষ গন্তব্যের দিকে। ভয়ংকর করোনাভাইরাসের কারণেই এই পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে তা নাইন-ইলেভেন হামলায় নিহত মানুষের সংখ্যার চার গুণেরও বেশি। নিউইয়র্ক নগরীতে সারা বছরে যত লোক খুন হয়, গড়ে এক দিনে তত লোকের মৃত্যু ঘটেছে গত কয়েক দিনে। এসব মৃত্যু শুধু সংখ্যা নয়, আছে নির্দিষ্ট নাম-পরিচয়ও। আছে তাদের পরিবারের গল্পও। তেমনই একটি গল্প আছে মোহাম্মদ জাফরেরও (৫৬)।

সেই কাহিনি প্রকাশ করেছে সিএনএন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অভিবাসী মোহাম্মদ জাফর পেশায় একজন ইয়েলো ক্যাব-চালক ছিলেন। তিনি একজন বাবাও। আমেরিকায় সন্তানদের সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে যারপরনাই চেষ্টা করেছেন জাফর। তাঁর স্বপ্ন পূরণে এমন কিছু নেই যে তিনি করেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাগ্য তাঁর সহায় হয়নি। সন্তানদের বড় হওয়া আর দেখতে পারবেন না তিনি। করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। আর সবার মতোই অ্যাম্বুলেন্সে গিয়ে ফিরতে পারেননি। ১ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়। ব্রঙ্কসের গান হিল রোডের পাশে ছোট্ট একটি অ্যাপার্টমেন্টে তিন সন্তানকে এতিম করে দিয়ে শেষ ঠিকানায় পৌঁছে গেছেন জাফর।

জাফরের জীবনের গল্পটা আর সবার গল্প থেকে একটু আলাদা। মোহাম্মদ জাফরের স্বপ্নযাত্রার গল্পটি আজ বেদনার হয়ে উঠেছে। যেসব অভিবাসীর ঘাম আর রক্ত ঝরে আমেরিকা মহান হয়ে ওঠার আওয়াজ ওঠে, তাঁদেরই একজন বাংলাদেশি জাফর। নিউইয়র্কে যাঁরা থাকেন, তাঁদের অনেকেই হয়তো জাফরকে চিনবেন। হলুদ ক্যাব নিয়ে নগরীর পথে পথে ঘোরেন তিনি। দিনের প্রথম ট্রিপ ধরেন সেকেন্ড গ্রেড পড়ুয়া মেয়ে সাবিহাকে নিউইয়র্কের অন্যতম শীর্ষ ট্রিনিটি স্কুলে নামিয়ে দেওয়ার পর। ম্যানহাটনের আপার ওয়েস্ট সাইডে এই স্কুল। স্কুল ছুটির সময় আবারও ট্রিপ নেওয়া বন্ধ করেন। সোজা স্কুলে গিয়ে মেয়েকে নিয়ে বাসায় পৌঁছে দিতেন তিনি। ছেলেমেয়েকে শিক্ষিত করতে এমনই প্রাণান্ত চেষ্টা তিনি করতেন। এই ক্যাব-চালকের ছেলে মাহতাব সিহাব (১৯)। পড়াশোনা করছেন বিশ্ববিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। অর্থনীতি ও ইতিহাস দুই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা তাঁর। মেয়ে সাবিহাও ভাইয়ের পথে হাঁটছে।

যোগাযোগ করা হয় মাহতাব সিহাবের সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁর বাবা বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ থেকে আমেরিকা এসেছিলেন। গ্রামের নাম উল্লাপাড়া। নিজেও দুই বছর আগে বাবার সঙ্গে দেশে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, বাবাকে দেখেছেন সারা জীবন পরিশ্রম করে একদিকে সংসার দেখেছেন, অন্যদিকে দেশে স্বজন আর বর্ধিত পরিবারকে সাহায্য করেছেন। নিজের জন্য কিছু করেননি তিনি। ভালো কোনো চাকরি করেননি কখনো। ম্যাকডোনাল্ডসে কাজ করেছেন, ডেলিভারিম্যানের কাজ করেছেন। শেষে ক্যাব চালানো শুরু করেন। তিনি মূলত সবার জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, আমেরিকায় আসা প্রায় সব অভিবাসীর জীবনের গল্পটা বেদনার। ঘটনা হয়তো আলাদা, কিন্তু বেদনা সবার একই রকম। তাঁরা এই দেশে আসেন ভাগ্যের উন্নয়নে। হাড়ভাঙা খাটুনি করে সন্তানদের মানুষ করতে চান।

জাফরের জীবনে আমেরিকার গল্প শুরু হয় ১৯৯১ সালে। ওই বছর তিনি বাংলাদেশে থেকে আমেরিকায় এসে নামেন। শুরুতে তিনি জ্যাকসন হাইটস ও কুইন্সের একটি ঘিঞ্জি অ্যাপার্টমেন্টে আর সব অভিবাসীদের সঙ্গে থাকতেন। যা আয় হতো, সেখান থেকে টাকা জমাতেন। সেই টাকা দেশে পাঠিয়ে দিতেন মা-বাবার কাছে। কয়েক বছর পরে টাকা জমিয়ে দেশে ফেরেন, উদ্দেশ্য বিয়ে করা। অতঃপর দেশ মাহমুদা খাতুনকে বিয়ে করেন। সেখানে কিছুদিন সংসারও করেন। পরে নিউইয়র্কে আবার আসার আগে তাঁদের ঘর আলোকিত করে ছেলে সন্তান আসে। তাঁর নাম মাহবুব রবিন। আবার নিউইয়র্কে পাড়ি জমান তিনি। ২০০০ সালে এল্মহার্স্ট হাসপাতালে জন্ম হয় মাহতাব সিহাবের। এই এল্মহার্স্ট হাসপাতাল এখন করোনাভাইরাসের গ্রাউন্ড জিরো হিসেবে পরিচিত।

sihab-mahtab 2
বাবা মোহাম্মদ জাফরের সঙ্গে মাহতাব সিহাব বড় ভাই মায়ের কোলে সাবিহা পারিবারিক অ্যালবামের ছবি মাহতাব সিহাবের কাছ থেকে পাওয়া

মাহতাব সিহাব বলেন, ‘বাবা সব সময় চেয়েছেন, আমরা যতটুকু সুবিধা পাই তার যেন পরিপূর্ণ ব্যবহার করতে পারি। তিনি চেয়েছেন আমরা যেন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারি।’

শুরুতে ব্রঙ্কসের পিএস ৯৫ এ জাফরের সন্তানেরা পড়াশোনা শুরু করে। পরে তিনি জানতে পারেন নিম্ন আয়ের মানুষের সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়াশোনার জন্য প্রিপ ফর প্রিপ নামের একটি সংগঠন সহায়তা করে। অবশেষে সন্তানের জন্য ওই সংগঠনের সহায়তা নেন জাফর। মাহতাব সিহাব সেভেন গ্রেডে ভর্তি হলেন ট্রিনিটি স্কুলে। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহপাঠী ছিলেন উইল ক্র্যামার। দুজনই ডিবেট ক্লাবের তুখোড় তার্কিক। তিনি বলেন, মাহতাব সিহাব খুব ভালো ছেলে। তাঁকে সবাই পছন্দ করত। খুব মজার ও ক্যারিশমাটিক ছেলে তিনি।

এই পরিবারের বেদনার গল্প শুরু হয় জাফরের মৃত্যুরও আগে। ২০১৬ সালে। ওই বছর মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মাহতাব সিহাব ও সাবিহার মা মাহমুদার মৃত্যু হয়। শুরু হয় পরিবারটির কষ্টের দিন। মা হারানো দুই সন্তানকে নিয়ে বিপাকে পড়ে যান জাফর। ধীরে ধীরে সামলে ওঠার চেষ্টা করেন একাই। এর ঠিক এক বছর পর মাহতাব হার্ভার্ডে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যান। ছোট বোন সাবিহা তখনো ট্রিনিটিতে কিন্ডারগার্টেনে। এত বেদনার মাঝেও আনন্দ আসে তাঁদের জীবনে। বাবার চাওয়া অনুযায়ী তাঁদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হওয়ার পথে। এখনো হয়নি, আর তাতেই আবারও হোঁচট আসে পরিবারে। এবারে থমকে গেছেন তাঁরা।

গত মার্চ মাসের শুরুতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার খবরে হার্ভার্ডে ছুটি ঘোষণা করা হয়। মাহতাব সিহাব বাড়ি ফিরে আসেন। এর মধ্যেই তাঁর বাবা জাফর সেলফ কোয়ারেন্টিনে চলে যান। একদিন শুধু অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বাইরে বেরিয়েছিলেন নিজের ইয়েলো ক্যাব চালানোর চাকরিটা আছে নাকি নেই, তা জানতে। এর কয়েক দিন পরই তাঁর হালকা জ্বর আসে। এর মধ্যেই শুরু হয় তীব্র শ্বাসকষ্ট। সন্তানেরা তাঁকে নগরীর মন্টেফিয়োর মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে এক সপ্তাহ ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। তাঁর অবস্থার উন্নতিও হচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সন্তানদের কাছে জাফরের মৃত্যুসংবাদ আসে। সন্তানদের ছেড়ে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে তাঁকে চলে যেতে হলো। নিউইয়র্কে করোনার কবলে প্রাণ হারানো প্রথম দিকের একজন মোহাম্মদ জাফর।

এবারে মা-বাবাহারা সন্তানেরা কী করবেন? কীভাবে চলবেন? কে দেবেন তাঁদের শিক্ষার ব্যয়? সংসারের ব্যয়? এই চিন্তায় পেয়ে বসে মাহতাব ও সাবিহার। বন্ধুরা জেনে যান খবর। এই পরিস্থিতিতেও এগিয়ে আসে অনেকেই। ছোটবেলার বন্ধু উইল ক্র্যামার তাঁদের জন্য তহবিল সংগ্রহে গোফান্ডমি ক্যাম্পেইন চালু করেন। ছোট ও বড় সব অঙ্কের সাহায্য আসা শুরু করে।

এ বিষয়ে মাহতাব সিহাব বলেন, নিজ দেশসহ প্রায় সব কমিউনিটির মানুষ সাহায্য করছেন। বিশেষ করে এগিয়ে এসেছেন প্রিপ ফর প্রিপ, ট্রনিটি স্কুল ও হার্ভার্ডের শিক্ষার্থীরা। তাঁরা সত্যিই ভেবেছেন যে, আমরা চরম অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যে পড়ে গেছি। ইতিমধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের তহবিল সংগ্রহ হয়েছে। করোনার এই সময়ও দূরে থেকে মানুষ মানুষের কত কাছে আসতে পারে, এটাই তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জাফরের সন্তানেরা এখন এতিম। তাঁদের মা-বাবার জায়গায় এখন আর কেউ আসবেন না। তবু এই মহামারির সময়ে তাঁদের পাশে অভিবাসীরা দাঁড়িয়েছেন। এসব অভিবাসীই আমেরিকার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করে আসছে। এটাই মূলত আমেরিকা। আমেরিকান হিসেবে এটাই সবার গর্ব।

মাহতাব সিহাব বলেন, ‘বাবা আমার চেষ্টা ও কাজের ফল দেখে যেতে পারলেন না। এখন আমি ও আমার ভাইকে কিছু একটা করতে হবে। ক্যারিয়ারের চিন্তা করতে হবে। তবে অবশ্যই তা বাবার দেখানো পথে।’

নিউইয়র্ক থেকে লিখেছেন ইব্রাহীম চৌধুরী